আমরা আসলে কী বুঝলাম!

0

লিপিকা তাপসী:

১. একটি দৃশ্যে একজন দা নিয়ে আরেকজনকে কোপাচ্ছে, মাঝখানে একটি মেয়ে তা প্রাণপন ঠেকানোর চেষ্টা করছে। মেয়েটি একজনকে ঠেকাচ্ছে, আরেকজন অন্যদিক থেকে এসে কোপাচ্ছে। পাশে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষ সেই দৃশ্য দেখছে। কেউবা পাশ থেকে ভিডিও করছে। এই দৃশ্য ফেসবুকে ঘুরছে, মিডিয়াতে ঘুরছে। এই দৃশ্য দেখে অনেকেই বলছেন মনে হচ্ছে সিনেমা দেখছি।

সত্যিই এরকম দৃশ্য সিনেমায় দেখা যায়। কিন্ত সিনেমায় নায়কটি আটজনকে কুপোকাত করে দেয়, ইটের দেওয়াল হাত দিয়ে ভেঙেচুরে, জিপের সাথে দৌড়ে, একা একাই দা বটি, বন্দুকের, বোমার সাথে যুদ্ধ করে জিতে যায়, বেঁচে থাকে। কিন্ত বাস্তবের ছেলেটি বাঁচেনি। সিনেমায় নায়কের মধ্যে হিরো হিরো ভাব না থাকলে ঠিক জমে না। নায়ক মানেই নায়িকার জন্যে একাই দশজনের সাথে মারামারি করে জিতে যেতে পারবে। আবার পাবলিক প্লেসে নায়িকার জন্যে নায়ক এবং ভিলেনের মধ্যে
প্রেম, মারামারি বা হিরোগিরির দৃশ্য তো সিনেমায় বছরের বছরের পর দেখিয়ে আসছে। মাঝে মাঝে এটা ফল দেয়, বাস্তবে এরকম দৃশ্য ঘটে যায়!

২. গ্রামের এক আত্মীয় একদিন গল্পে গল্পে বলছিল, তার ছেলে সজল কতজনকে পিটিয়েছে। তার ছেলের সাথে আরেকদিন একজন ঝগড়া করতে আসছিল লাঠির এক বাড়িতে তার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলো। সেই আত্মীয় এসব কথা বেশ গর্বের সুরেই বলছিল, আরও জানিয়েছিল যে, গ্রামের লোক তার ছেলেকে ভয় পায়, ‘ডরায়’। গ্রামের লোক এজন্যে ঘৃণার চোখে দেখে না তাকে, তার জন্যে তার বঞ্চনাও হয় না। আরেকদিন গ্রামের মাথা ফেটে যাওয়া লোকের সাথে প্রতিবেশির ঝগড়া লাগলে প্রতিবেশি তাকে বলেছিল, ‘সজলের হাতে ঠাঙানি খেয়ে লজ্জা হয়নি, আবার ঠাঙানি লাগবে’। আরেক আত্মীয়কে দুর্বৃত্তরা জমি বিরোধ সংক্রান্ত বিষয়ে মেরেছিল। তিনি যতটা তার আঘাত নিয়ে চিন্তিত ছিলেন, আর চেয়ে তার সম্মান নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। তার মানে যে মার খায় লজ্জাটা তার।

৩. রাজনীতিতে মার দেওয়া লোকের কদর বেশি। এইটা একটা গুণ। যে বেশি ঠ্যাঙানি, বিরোধী পক্ষরে কিংবা তার দলের মধ্যে প্রতিপক্ষরে দমন করে রাখতে পারবে, তার রাজনীতিতে ভবিষ্যত তত উজ্জল। তার জায়গা কেউ আর নিতে পারে না।

৪. দেশে প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন, ধর্ষণ করে মেরে ফেলা, পুড়িয়ে মারা, গাড়ি দিয়ে মানুষ মারা, চলন্ত বাস থেকে ফেলে মেরে ফেলার পরও আসামী গ্রেফতার হতে অনন্তকাল ধরে চলতে থাকে ৪৮ ঘন্টার আলটিমেটাম, আর আসামী গ্রেফতার হইলেও ক্ষমতার চিপাচুপা দিয়ে বের হয়ে আসতে পারে। বিষয়টা রাজনৈতিক হলে তো রাষ্ট্রপতির ক্ষমাও মিলে যায়, রাজনৈতিক না হলেও রাজনৈতিক রূপ দিতেও সময় লাগে না।

অন্যদিকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা পাবলিক, আর ঈদের পরের আন্দোলনের আলটিমেটাম দেওয়া, সেমিনার, মানববন্ধন করা রাজনৈতিকগুলোর ব্যাপক চাপযুক্ত অবস্থা দেখে খুনিরা কেন ভেবে নেবে না টাকা, ক্ষমতা থাকলে এরকম ‘দু’একটারে ফেলে’ দিলে কিছ্ছুই হয় না। দেশের আইনি ব্যবস্থার বেহাল দশা হইলে প্রকাশ্যে এভাবে মারার চিন্তা মানুষই করতে পারে।

এইসব সংস্কৃতি পুষে রাখলে এরকম দৃশ্য মাঝে মাঝেই দেখা লাগবে। আমরা হলাম ডিমনেশিয়ার রোগীর জাতি। ভিডিও না থাকলে এগুলো মনে থাকে না। এবং যেসব নৃশংসার ভিডিও নেই, আমরা সেইসব উল্টেও দেখি না। বরং রক্তমাখা ছুরির ছবি সঙ্গে নিয়েও আমরা দুর্দান্তগতিতে সব ভুলে অন্য ইস্যুতে চলে যেতে পারি, অথবা ভাত-ডাল খেতে ভাতঘুমও দিয়ে দিতে পারি। এসবই দেখিয়ে দেয় আমরা কীভাবে সমাজের পরতে পরতে কতটা হিংস্র খুনি হওয়ার বীজ বপন করে রেখেছি। এইগুলো দূর করা দরকার। আর এইসব খুনিগুলোর একটা দৃষ্টান্তমূলক, চরম দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার, যাতে দীর্ঘদিন পর্যন্ত এই জাতি মনে রাখে এই শাস্তির কথা! সেইসাথে রাজনৈতিক ছায়া-প্রচ্ছায়াও দূর করা দরকার এসব অপরাধীর ওপর থেকে।

শেয়ার করুন:
  • 66
  •  
  •  
  •  
  •  
    66
    Shares

লেখাটি ২৯৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.