ছেলেদের ক্ষেত্রে ‘ঘর’ই সব হয় না

0

ফারজানা নীলা:

জীবনে তুমি যদি নিজের সম্মান নিয়ে সচেতন হও, তবে এমন কিছু সময় আসে যখন মনে হয় তোমার মেয়ে হওয়া বড্ড তুচ্ছ। চোখ দিয়ে হয়তো কখনও পানিও গড়াতে পারে মেয়ে হওয়ার অপমানে। তখন খুব ইচ্ছে করে এই কামনা করতে যে পরজন্ম বলে কিছু যদি থেকে থাকে, যেন ছেলে হয়ে জন্মাই।

মেয়ে হওয়া গর্বের? কীসের গর্ব? জন্ম দিতে পারলেই গর্ব? জন্ম তো সকল স্ত্রীলিঙ্গই দেয়। বিড়ালও দেয়, হাতিও দেয়, বাঘও দেয়, বানরও দেয়। তো, তারা কি মহান কিছু হয়ে গেছে? ও না, তারা তো মানুষ না। একমাত্র মানুষ জাতিতে মহান, অ-মহান তুচ্ছ, বড়, কনিষ্ঠ, বৃহৎ অঙ্গ অর্ধাঙ্গের ব্যাপার আছে। এবং এই সব মহান অ-মহান উচ্চপদ নিম্নপদ আবিষ্কারকও এই পুরুষ। তারা ঠিক করে দিয়েছে নারী জন্ম দিতে পারে বলে মহান।

আর নারীও এই মহান হওয়ার ট্যাগ পেয়ে খুশিতে গদগদ। উফ আমি মায়ের জাত। আমি মহান জাত। আমি যা পারি তা পারে না পুরুষ জাত!

আফরোজা নীলা

এই ট্যাগনামা দিয়ে বিনিময়ে তোমার থেকে কি কি নিয়ে গেলো সেই খবর কিন্তু রাখে না মহান নারী জাত, বা জেনেও না জানার ভান করে।

মহান জাতিকে বাসায় থাকতে হবে। সবার যত্ন নিতে হবে। সবার ইচ্ছে রুচি হুকুম অনুযায়ী চলতে হবে। বাসার সব মানুষের খাওয়া দাওয়া হতে শুরু করে ঘরের যত্নআত্তি সব এই মহান নারী জাতিকেই করতে হবে। কেননা নারীই তো পারে সব যত্ন সহকারে করতে! নারীই তো পারে সবাইকে আগলে রাখতে। মমতা তো শুধু নারীদেরই আছে! এ তো নারীর গুণ! এবং অতি অবশ্যই শুধু নারীদেরই গুণ। এই গুণ ছেলেদের থাকতে নেই। থাকলে সে হ্যাঙলা মেয়েলি! ওহ হ্যাঁ, মেয়েলি হওয়া কিন্তু গালির সমতুল্য আবার!

তো এই গুণ ছেলেদের থাকতে নেই কেন? কারণ ছেলেরা তো পারে না! ছেলেরা কি রাঁধতে পারবে? ঐ একটু ডিমভাজা আর আলু ভর্তাই যথেষ্ট। অথবা ছেলে অনেক রান্না করতে পারে, বিরিয়ানি চাইনিজও পারে। তবে সেটা মাঝে মাঝে শখের বশে রান্না। ডেইলি কাজের মধ্যে পড়ে না। অথবা ছেলে কি পারে বুয়াকে কাজ কর্ম দেখিয়ে দিতে?

সকালে উঠে সব রেডি করে দিয়ে বাচ্চাকেও রেডি করে অফিসে যেতে পারবে নাকি ছেলেরা? ও-বাবা, বাচ্চার স্কুল মিস হবে, নয় নিজেও অফিস যেতে পারবে না!

আচ্ছা যদি মায়েরও অফিস থাকে? থাকলে থাকবে। চাকরি করলে কি ঘরের দায়িত্ব অবহেলা করতে পারবে?

অথচ অবহেলা কেউ করে না। হয়ত শরীর না মানুক, ক্লান্তি ঝেঁকে ধরুক তবুও এই কাজ মেয়েরা না করলে হয় না এই নীতিতে তারা করে যায়।

আবার এই ঘরের কাজই কিন্তু বিজ্ঞ ছেলেদের কাছে “আরে এগুলো কোনো কাজ নাকি”, সারাদিন ঘরে বসে থাকা”। অথচ তাদের যদি এই সোজা কাজ করতে দেওয়া হয় তবে তারা মূর্ছা যায়। তুচ্ছ কাজ করা পুরুষদের মানায় নাকি না। তাদের জন্ম হয়েছে কঠিন কাজ করার জন্য। তারা এই সব ঘরের কাজ কেন করবে?

সত্য হলো তারা পারে না। এই না পারা তারা স্বীকার করতে চায় না। এবং তারা পারতে চায়ও না। কেন করবে তারা? জন্ম থেকে দেখে আসছে এই সব তুচ্ছ কাজ নারীরাই করে।অথচ এই তুচ্ছ কাজ যদি নারী এক দিন না করে তবে তাদের কঠিন কাজও যে থামতে বসে সে খেয়াল নেই। তবু স্বীকার করবে না নারীদের ঘরের কাজ তুচ্ছ নয়। বরং বাইরের কাজ করার শক্তি পাওয়া যায় যদি ঘরের কাজ ঠিক মত হয়।

আর যদি নারী বাইরেও কাজ করে তবে “সংসার তো তাঁর, সে যদি না সামলে রাখে কে রাখবে”। মোদ্দা কথা, ঘরের কাজ মেয়েদেরই করতে হবে কোনোভাবে এ ছেলেদের কাজ নয়! এবার মেয়ে বাইরে কাজ করুক বা না করুক।

ঘর বাহির যে সামলে যায় তাদের যে মাঝে মাঝে একটু যত্নের প্রয়োজন হয় সে কথা কোনোদিন কারো মনে হয় না। সবার তো প্রতিদিন যত্নের দরকার হয়।তাঁর কি যত্ন লাগে না?

যে নারীরা রাত দিন খেটে যায় আপনাদের যত্নের এবং সুবিধার খাতিরে তাদের কখনো একটু খবর নিয়েছেন ? হ্যাঁ খবর নেন, তারা যদি কোথায় গিয়ে কয় দিন থেকে আসে তবে খবর নেন কখন আসবে, কখন আপনাদের খানা খাদ্যের সঠিক যোগান হবে।

বলি নারীরাও কম যায় না কিন্তু। মর মর হয়ে ফিরে আসে ‘ওরে আমার সংসার ভেসে যাচ্ছে”। তারা নিজেরাও চান না তাদের কর্তারা কষ্ট করুক। মমতাময়ী যে!

অথচ ঘরে তো শুধু নারী থাকে না, পুরুষও থাকে। খায় কি শুধু নারী একা? পুরুষও তো খায়। কিন্তু সামলানোর দায়িত্ব শুধু নারীর একা! মেয়ে বাইরে কাজ করলেও ঘর তো আগে সামলাতে হবে। ঘরই তো মেয়েদের সব! শুধু ছেলেদের ‘ঘর’ই সব হয় না।

তাই ইচ্ছে আছে যদি আরো একবার জন্মাবার সুযোগ পাই, তাহলে যেন ছেলে হয়ে জন্ম নেই। মহান তো অনেক হলাম, এবার অমহান হয়ে একটু আরাম করি।

শেয়ার করুন:
  • 1.4K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.4K
    Shares

লেখাটি ৪,৭৪৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.