আমি মোমেনা খাতুন হেনা

0

দিলু দিলারা:

আমি আমার ভাইবোন সবার বাচ্চা পালি, মানে লালন-পালন করি। আমি মোমেনা খাতুন হেনা। আমার বয়স এখন ৪১। ভাইবোন সবার হেনা বু। আমি আমার বুড়া মায়েরও দেখাশোনা করি। আমার বাবা নেই। ভাইদের সংসারেই থাকি।

আমি ছয় ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। বড় বু জামালপুরে থাকে। দেখতে দেখতে সব ভাইবোনদের বিয়ে হয়ে গেল। আমার কী এক অজ্ঞাত কারণে হলো না। কেন হলো না নিজেই জানি না। চেহারা চলনসই ছিল। আমি মেট্রিক পাশ করে আর পড়িনি। আমার বয়স বেড়ে যাচ্ছে, কিন্তু বিয়ে হচ্ছে না দেখে ছোট বোন আর ভাইয়েরা আর আমার জন্যে অপেক্ষা করলো না, পাছে যদি আবার তাঁদের বউ আর বর খুঁজে না পাওয়া যায় সেই ভয়ে!!

প্রতিদিন সেই কাকডাকা ভোরে আমি উঠে এক পালা রুটি বানাতে বসি। কাজের একটা পিচ্চি আছে আমাকে সাহায্য করে, আমি মাঝে মাঝে ইচ্ছা করেই ওকে ঘুম থেকে ডাকি না, বাচ্চা মানুষ একটু ঘুমাক।

দিলু দিলারা

আমার দুই ভাইয়ের মধ্যে এক ভাই আমাদের সাথে মানে আম্মার সাথে এই বাড়িতেই থাকে। ভাই, ভাইয়ের বউ দুজনেই ব্যাংকে চাকুরী করে। ওদের একটা চার বছরের ছেলে আছে নাম বিল্টূ।

আমার কাছে রেখেই সারাদিনের জন্যে কাজে বেরিয়ে যায়। বৌটা লাট বাহাদুর, ধুমধাম ঘুম থেকে উঠেই টেবিলে নাস্তা চাই। সে অতি চালাক, আমাকে খুশি করার জন্যে আবার এও বলে, ‘আহারে হেনা বু, আপনার সারাদিন অনেক কষ্ট হয়, তাই না? কী করবো বলেন বু! অফিসে এত্তো প্রেশার। বিল্টূ আপনাকে অনেক জ্বালায় তাই না? ছেলের দিকে তাকিয়ে বলবে, বিল্টূ, একদম মেজো ফুপিকে জ্বালাবে না, কেমন? ফুপিকে আদর করে দাও। বলেই ছেলেকে আমার কাছে এনে চুমু দিতে বলবে। সেদিন চুমু দিতে এসে আমার গালে এমন কামড় দিল যে চিৎকার দিয়ে আমি পাঁচ হাত পিছিয়ে গেলাম।

এইটা এতো দুষ্টু, সামনে যাকে পাবে তার গায়ে প্রস্রাব করে দেবে। সেদিন তরকারি কাটছিলাম, এই ছেলে আমার মাথায় চিনির কৌটা উপুড় করে ঢেলে দিয়েই দৌড়ে ওর দাদীর কোলে গিয়ে লুকালো।

আরেক ভাই এই ফ্ল্যাটেরই উপরে থাকে। উনারাও দুইজনেই চাকুরিজীবী। অফিস যাওয়ার সময় কাজের মেয়েসহ দুই বছরের বাচ্চাটা এই বাসায় রেখে যায়। সারাদিন আমাকেই এই বাচ্চার দিকে নজর রাখতে হয় খাওয়া থেকে শুরু করে গোসল।

তারপরও আমি এদের জন্যে কী এক মায়ায় জড়িয়ে থাকি।

আর হ্যাঁ, এই গলিতেই আমার দুই বোন শিলু আর বিলু থাকে। কেউ শ্বশুর বাড়িতে থাকে না। বাপের বাড়ির কাছেই তাঁদের সুবিধা। সেই অনুযায়ী বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। শিলু আবার বাসাতেই কোচিং সেন্টার খুলেছে। ছেলেটা ক্লাস ফাইভে পড়ে, ভ্যানওয়ালা প্রতিদিন ছুটির পর স্কুল থেকে এই বাসায় নামিয়ে দিয়ে যায়। এখানেই বিকেল পর্যন্ত থাকে। ওদের জন্যে প্রায় প্রতিদিনই ভাত তরকারি রান্না করে পাঠাতে হয়, উনি নাকি রান্নার সময় পান না।

এই টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি খাবার আমাকেই রেডি রাখতে হয়। প্রতিদিন ওর বর এসে নিয়ে যায়। একেবারে বউয়ের ভেড়ুয়া!

আর বিলুর কথা কী বলবো! সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়ায়, বিয়ের পরও এতো বান্ধবী কোথা থেকে আসে আল্লায় জানেন। বরকে নিয়ে প্রায়ই এই বাড়িতে খায়। বরটা কিছুই বলে না। ওর শাশুড়ি গ্রামে থাকে।

আমাকে আম্মার দেখাশোনা করতে হয়। আম্মার বয়স হয়ে গেছে। ছেলেমেয়েরা যা বলে তাই শোনে।প্রতিবাদ করার ক্ষমতা নাই। আম্মার জন্যে কষ্ট হয়।

আমার নিজের কোনো জগত নেই। আমার কোন চাওয়া পাওয়া নেই।

ঈদে ভাইয়ের বউরা শাড়ি কিনে এনে বলবে, ‘বুবু দেখেন, আপনার জন্যে লেটেস্ট ডিজাইনের শাড়ি কিনে এনেছি’। আমি খুশি হয়ে এই শাড়ি পরি, আহা ভাইয়ের বউরা আমাকে কিছুটা হলেও ভালবাসে!

আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই, আমার চোখের দু কুল ছাপিয়ে জল উপচে পড়ে, যখন দেখি ছুটা বুয়া এই একই শাড়ি পরে এই বাসায় কাজে এসেছে।

আমাকে সবাই কাজের মানুষের আসনে বসিয়ে রেখেছে। আত্মীয়ের বিয়ে শাদি বা কোন অনুষ্ঠানে গেলেও আমাকে দূরে চেয়ারে একা বসে থাকতে হয়, বাচ্চাদের পাহারা দিতে হয়। আমার অস্তিত্ব বলে কিছুই নেই।

মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে সবাইকে না বলে একদিন দূরের কোন ট্রেনে উঠে পড়বো, অচেনা ষ্টেশনে নেমে পড়বো। ইদানিং চুপিচুপি পেপারে খুঁজি কোন চাকুরির বিজ্ঞাপন আছে কিনা! আজ পেপারের এক কোনার দিকে ছোট করে একটা বিজ্ঞাপন দেখলাম। নেত্রকোনার সেই বিরিশিরি এলাকার দিকে। একটা এনজিও’র মেয়েদের স্কুলের আয়ার কাজ। হোক আয়া। তারপরও নিজের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু কীভাবে যোগাযোগ করবো! আর এই বয়সে আমাকে নেবে কিনা তাও জানি না। ঠিকানা দিয়েছে হেড অফিসের, মানে ঢাকার।

আমি মোবাইলে চুপিচুপি হেড অফিসে যোগাযোগ করি। এক ম্যাডাম আমাকে অফিসে দেখা করতে বলেন।

আজ আমি আমার মাকে কাঁচা বাজারে যাওয়ার কথা বলে সেই অফিসে চলে যাই। আমার কথা শুনে আমার ইন্টার্ভিউ নিয়ে অফিসের হেড ম্যাডাম আমাকেই কয়েক জনার মধ্যে থেকে সিলেক্ট করলেন। আমি ওনাকে আমার গোপনীয়তা রক্ষার জন্যে অনুরোধ করি।

বাড়ি ফিরে আমার কী এক খারাপ লাগা কাজ করতে থাকে, বিশেষ করে এই বাচ্চাদের জন্যে। কিন্তু আমি এই ভাবে আর জীবন চালাতে চাই না। নিজেকে শক্ত করি।

আমি আজ রাতেই সবার মুখোমুখি হই। তিন তলা থেকে ভাই আর তার বউ, আর শিলু-বিলুকে তাঁদের বরসহ আসতে বলি।

আমার মায়ের ঘরে সবাই উপস্থিত হই। আমি প্রাণপন আমাকে স্থির রাখি। আমি আমার সিদ্ধান্ত সবাইকে জানাই। আমি দেখলাম ঘরে পিনপতন নিস্তব্ধতা।

ভাই, ভাইয়ের বৌ, বোনদের মুখ কালো হয়ে ঝুলে পড়লো। তারা যেন অথৈ সমুদ্রে পড়লো। আমাকে তারা বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলো। বার বার অনুরোধ করতে লাগলো। আমি খুব বুঝতে পারছি, আমাকে ভালবেসে ওরা থাকতে বলছে না, আসলে আমি চলে গেলে ওদের এই আরাম আয়েশ আর বাচ্চা দেখার কী হবে সেই জন্যেই এই অনুরোধ।
শুধু আম্মাকে দেখলাম তার ঠোঁটের কোনায় হাসি ফুটে উঠতে। আমি সত্যি দেখলাম তো!

বিল্টূ কী বুঝল কে জানে! আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, ‘হেনা মনি, তুমি কই যাবা? তুমি থাকো’।

বুঝতে পারছি এদের ভালবাসার যন্ত্রণা আমাকে যেতে দিবে না। আমি চোখ ভর্তি পানি নিয়ে বলি, ‘বিল্টূ বাবা, তুমি বড় হলে হেনা মনিকে নিয়ে এসো কেমন’! বিল্টূ মাথা হেলিয়ে বলে, ‘আচ্ছা’।

আমি খুব ভোরে কেউ ওঠার আগেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি।

রিক্সায় ওঠার আগে পিছন ফিরে বাড়িটাকে দেখে নেই। আমি বাড়ির মানুষদের কাছে কোনো ঠিকানা রেখে আসি না …।

শেয়ার করুন:
  • 3.5K
  •  
  •  
  •  
  •  
    3.5K
    Shares

লেখাটি ৯,৪৮৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.