বাঙালি মায়ের পুত্রপ্রীতি

0

অনন্য আজাদ:

বাঙালি মায়েদের ন্যাকামি আমার খুবই বিরক্ত লাগে। বিশেষ করে তারা পুত্র সন্তানদের যেভাবে আঁচলের ভিতর বন্দি রাখার চেষ্টা করে থাকে, তা শুধু বিরক্তিকরই নয়, বরং মাঝে মাঝে খুবই যন্ত্রণাদায়কও।
পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র-পৃথিবী-সংস্কৃতি-পরিবেশ-ভূগোল-অর্থনীতি-রাজনীতি সবকিছু পরিবর্তন হয়ে যায়, কিন্তু মায়েদের চোখে পুত্র সন্তানেরা কখনোই বড় হয় না। সমবয়সী কন্যা বড় হয়ে যায়, কিন্তু পুত্র ছোট থেকেই যায়। পুত্রকে বড় হতে দেওয়া হয় না। এই মানসিক রোগের নাম পুরুষতন্ত্র।

এটা পুত্রের প্রতি মায়ের ভালোবাসার প্রকাশ নয়, বরং মা যে পুরুষতান্ত্রিকতার ধ্যানধারণায় নিজেকে লেপ্টে রেখেছে, তার-ই বহিঃপ্রকাশ। এই কুৎসিত সমাজব্যবস্থা খুব নিখুঁতভাবে কন্যার থেকে পুত্রকে প্রাধান্য দেওয়াকে গুরুত্বের সাথে মানদণ্ড হিশেবে উপস্থাপন করে রেখেছে। এবং মায়েরা সচেতন কিংবা অচেতন বশত পুরুষতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আপ্রাণ যুদ্ধ করে যাচ্ছে।

বাঙালি মায়েরা কন্যার শতাধিক ভুল খুঁজে পেলেও কোনো এক উদ্ভট কারণে পুত্রের দোষত্রুটি চোখে পড়ে না। যেন পুত্রের শত খুন মাফ। পুত্র স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যায়, কিন্তু মায়ের কাছে পুত্রকে তখনও শিশুর মতনই লাগে। এমন হাস্যকর ন্যাকামি বাঙলা চলচ্চিত্রকেও হার মানতে বাধ্য করে। কিন্তু কন্যার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

অনন্য আজাদ

কারণ কন্যার ছোট বড় হওয়া নির্ভর করে শরীরের ওপর। যে শরীরের বয়স যতো কম, সে শরীরের চাহিদা ততো বেশি। যে শরীরের বয়স যতো বেশি, সে শরীরের চাহিদাও ততো কম। এটি শুধু এশিয়া বা আরবের সমস্যা নয়, গোটা পৃথিবীর একই চিত্র। কন্যার ছোট বড় নির্ধারণ হয় শরীর দিয়ে, আর পুত্রের বড় হওয়া তার আর্থিক ক্ষমতার উপর নির্ভর করে থাকলেও মায়েদের চোখে তারা আজীবনই শিশু থাকে। পুত্র পাঁচ ছয়টা প্রেমের কাহিনী শেষ করে দুই তিনটা চাকুরীর অভিজ্ঞতা অর্জনের পরে একটা ফুটফুটে কচি মেয়েকে বিয়ে করার পরেও শুনতে হয় ‘আমার ছেলে তো ছোট’।

এমন হাস্যকর, অযৌক্তিক, কুৎসিত পুরুষতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখে নারীরা।

পুত্রের প্রতি মায়ের অতিরিক্ত, জোরপূর্বক দুর্বলতা বা ন্যাকামি কি ভালোবাসা? আজীবন পুত্রকে ছোট ভাবনা কীভাবে ভালোবাসা হতে পারে? যদি তা ভালোবাসাই হয়ে থাকে, তাহলে কন্যার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় কেনো? নাকি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য পুত্রকে ছোট করে রাখা?

প্রশ্ন উঠতেই পারে- মায়ের চোখে পুত্র আজীবন ছোট থাকলে কন্যা কেনো ছোট থাকে না? পুত্র বড় হয়ে যা করে তা কন্যাও করে থাকে। তাহলে এখানে বৈষম্য কেনো? সাম্য ও বৈষম্যের পার্থক্যটুকু কি মায়েরা বুঝতে পারে না?

বুঝতে পারে না কারণ এই পুরুষতন্ত্র ছোটকাল থেকে তাকে শিখিয়েছে ও দেখিয়েছে যে, কন্যা একদিন ঘর ছেড়ে চলে গেলেও পুত্র কখনো ফেলে যাবে না। পুত্রই কি শুধুমাত্র পিতামাতাকে দেখে রাখে? কন্যা কি দেখে রাখে না? দায়িত্বশীল শব্দটি কি শুধুমাত্র পুরুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য? পিতামাতার প্রতি দায়িত্ব পুত্রকন্যা নির্বিশেষেই করে থাকে। কিন্তু প্রশংসাপত্রে শুধুমাত্র পুত্রের নাম বরাদ্দ রাখা এ-কেমন যৌক্তিকতা? এ-কি স্বার্থের খেলা?

যারা একবিংশ শতাব্দীতে নারী পুরুষের পার্থক্য করে থাকে, তারা তীব্র নারীবিদ্বেষী কট্টর প্রগতিবিরোধী। একসময় মানুষজনের মধ্যে অশিক্ষা, কুশিক্ষা, সচেতনার ব্যাপক অভাব ছিল, কিন্তু এখন আর মানুষ সেই মধ্যযুগীয় কুসংস্কারে নেই যে অন্ধকারের ভীতি দেখিয়ে নারী পুরুষের সহবস্থানকে অস্বীকার করে কুপমণ্ডুকতার বীজ বপন করে বীরদর্পে শাসন করে যাবে।

শেয়ার করুন:
  • 2.8K
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.8K
    Shares

লেখাটি ৮,২২৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.