শিশু ধর্ষণের মহামারী, দায় কি একা সরকারের?

0

নওরীন পল্লবী:

আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, এদেশে কি আদৌ কোন সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধবিজ্ঞানী কিংবা মনোবিদ আছে? বিগত পাঁচ বছরে ‘শিশু ধর্ষণের’ নিউজ পড়তে পড়তে ইদানিং মানসিকভাবে অসুস্থবোধ করি। আহত হই, স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি কিছুক্ষণ, তারপর ভুলে যাওয়ার জন্য অন্য কাজে মন দিই।

এছাড়া করারই বা কী আছে আমাদের? পারতপক্ষে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। তবু চোখে আটকে যায় মাঝে মধ্যেই। দুই মাসের শিশু থেকে ৯৫ বছরের বৃদ্ধা, কেউই বাদ যায় না! এই দেশ, এই স্বাধীনতাই কি আমরা চেয়েছিলাম? নিজেকে প্রশ্ন করি, উত্তর খুঁজে পাই না।

দেশে আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নাই, এ আমাদের শিশুরাও জানে। সাধারণ মানুষ মনে করে, কঠোর আইনই একমাত্র পারে এধরণের ঘটনা কমিয়ে আনতে। কিন্তু আমরা যারা একটু স্টাডি করি বিষয়গুলো, তারা জানি কঠোর শাস্তি কোন সমস্যার সমাধান না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এসবের পেছনের কারণ অনুসন্ধান। এই বিষয়গুলো নিয়ে আদৌ কোন রিসার্চ হয় কি দেশে? জানামতে নেই। সামান্য কিছু থাকলেও, ভালো জার্নালে প্রকাশ পাওয়া আন্তর্জাতিক মানের কোন রিসার্চপেপার আমি অন্তত খুঁজে পাইনি।

এভাবে চলতে থাকলে মানুষ শীঘ্রই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে শুরু করবে। আইনের ধার ধারবে না, জীবনের পরোয়া করবে না। ইতোমধ্যে আমরা নিউজের শিরোনামে দেখতে পাই, ‘ধর্ষণের শিকার মেয়ের বাবা, ধর্ষককে কুপিয়ে হত্যা করেছে’। এই শিরোনামের নিচের মন্তব্যগুলো সময় করে পড়ে দেখবেন একবার, সাধারণ মানুষ কতটা উল্লাসিত হয়, তৃপ্তি প্রকাশ করে, সেই বাবাকে বীর ঘোষণা দেয়!
বাবাটি কিন্তু জানে, এতে তার মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে। তবু করছে! এর দায় রাষ্ট্রকে যতটা নিতে হবে, আমাদের সমাজবিদ, মনোবিদ কিংবা অপরাধ বিজ্ঞানীকেও নিতে হবে।

লাগাতার এধরনের মর্মান্তিক শিশু ধর্ষণের ঘটনা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে গবেষণার দাবি রাখে। এই ধর্ষকরা কি শিশুকামী? শিশুকামীরা তো আদিকাল থেকে আমাদের চারপাশে বাস করছে, শিশুদের নিপীড়ন করে আসছে, সেটার প্রতিকারই আজ অবধি আমরা করে উঠতে পারিনাই। কিন্তু হঠাত এদের এমন কি হল যে এরা শিশুদের ধর্ষণ করতে শুরু করলো? এমনকি প্রমাণ লোপাটে খুন পর্যন্ত করতে দ্বিধা করছে না! এই ৫ বছরে ঠিক কি কি পরিবর্তন এসেছে সমাজে কিংবা কোন বিষয়গুলো শিশুকামীদের এতো সহিংস করে তুললো? এসবের উত্তর বের করতে না পারলে, কখনোই এর সমাধান সম্ভব হবে না।

একই সাথে আরেকটি অপরাধ চরমমাত্রায় বেড়েছে, সেটি হচ্ছে মাদ্রাসার হুজুরদের দ্বারা ছেলেশিশু ধর্ষণ। বিষয়টি গবেষণার দাবি রাখে, কেনো এমন হচ্ছে? এই হুজুররা কি সমকামী? সমকামী তো হতেই পারে মানুষ, সেটা যার যার যৌনরুচি। কিন্তু শিশু ধর্ষণ তো এটাকে জাস্টিফাই করতে পারে না। একইসাথে মনে রাখতে হবে, এদের প্রধান শিকার ‘শিশুরা’। তবে কি এরা শিশুকামীও? মানে সমকামী আর শিশুকামী দুটোই? নাকি কোনটাই নয়?

দু’একটি গবেষণাপত্র পড়ে যা জেনেছি ‘বদ্ধ পরিবেশে’ বেড়ে ওঠা মানুষদের মধ্যে এধরনের আচরণ দেখা দেয় অনেক সময়। এটা পরিবেশগত কারণ। যেমন- ক্যাডেট কলেজ, আনসার ক্যাম্প, ডিফেন্স, চার্চ, হাফেজিয়া মাদ্রাসা। চার্চের পাদ্রিরা যে ঘটনাটি ঘটিয়ে আসছিল দীর্ঘদিন, তা ধর্মীয় সেন্টিমেন্টে আঘাত হানবে জেনেও পশ্চিমা মিডিয়াগুলো প্রকাশ করতে দ্বিধা করেনি। এ নিয়ে বিস্তর গবেষণাও হয়েছে। আমার প্রশ্নটি হচ্ছে, বাংলাদেশে এরকম একটা সাহসী পদক্ষেপের জন্য আমাদের আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে? আর কত শিশু ধর্ষণের শিকার হলে সরকার সেন্টিমেন্টের তোয়াক্কা না করে শিশুদের নিরাপদে শৈশব নিশ্চিত করাকে প্রাধান্য দিবে?

মানলাম সরকারকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে এই বিশেষ গোষ্ঠীর সাথে আপোস করে চলতে হয়। যে সরকারের কাছে টিকে থাকা যতটা মুখ্য, সে সরকার ততটা আপোষ করে। কিন্তু কষ্ট হয় তখন, যখন দেখি আমাদের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষকদের মোটেও এসবে মন নেই! আর এতো সময়ইবা কই তাদের গবেষণার? তাদের তো পদ-পদবী নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়!

প্রমোশন যদি রাজনীতি করেই পাওয়া যায়, গবেষণা করবে কেন তারা? তেলমর্দন আর বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করা কি এক হলো? সহজ পথ ধরা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, আমাদের শিক্ষকরা কি মানুষ না? তারা কি এলিয়েন?

শেয়ার করুন:
  • 181
  •  
  •  
  •  
  •  
    181
    Shares

লেখাটি ৩২৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.