‘স্তন’ নিয়ে দূর হোক শুচিবাই

0

শামীম আজাদ:

হায়রে, আমার এক জোড়া প্রত্যঙ্গ নিয়ে ঘানা বংশোদভূত শান্ত দর্শন নার্সটির কী যে একটা হাতাহাতি! মানুষের দেহাংশ আর যন্ত্রের দেহাংশের মধ্যে একটা সমঝোতা এনে ছবি তোলার জন্য তার এ কুস্তি বুঝি!
বুঝি এমনটা হবে ভেবেই সংকোচে অনেকে বুক দেখাতে যান না। এতো আর টা টা করা হাত বা নৃত্য পরায়ণ পা নয় যে আলাদা করে ছবি তোলা যাবে। এ হচ্ছে আমার স্তন যুগল। যৌবনে যা নারীর সৌন্দর্য সুষমা, প্রেমশয্যায় কুসুম ও সন্তান জন্মের পর তার অন্নজল। বুকে বসা এক অত্যাশ্চর্য লেডিবার্ড। কিন্তু যদি তাতে কর্কট- কামড় পড়ে তখন আমরা ধমাধম মরি।
এখন তো তা এক মহামারি। প্রায় প্রতি দশ জনে একজনের স্তন ক্যান্সার হচ্ছে। আপনিও অন্তত তিন থেকে পাঁচজন আক্রান্তের কথা বলতে পারবেন। আজ আমি এসেছি বার্ট হাসপাতালে। আমার এক বন্ধু সাথে এসেছে। ক’দিন আগেই পায়ে বড় অস্ত্রোপচার হয়েছে। শরীর অশক্ত, মনটা নরম।

মনে পড়ছে সুইডেনে বসবাসরত চৈতীর কথা। বিদেশ বিভূঁইয়ে দুই অপ্রাপ্ত বয়সী কন্যা মেধা ও জোনাককে নিয়ে তার যুদ্ধটার কথা। মেধার বাবা থেকেও নেই। জন্মযোদ্ধা সাংবাদিক ও লেখক এ চৈতী বাধ্য হয়ে দেশ ত্যাগ করে এখন বিদেশে ঐ কন্যাদ্বয়ের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে বাঁচার। ওদের আর কেউ নেই। ওর অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে। সে আরোগ্যের পথে। কিন্তু যার কষ্ট সেই জানে।

লেখক শামীম আজাদ

ব্রিটেনে বিনামূল্যে ভ্রাম্যমান ব্যবস্থাদি্র মাধ্যমেও মেয়েদের স্তন পরীক্ষা করা হয়। বুকে, বগলে যেখানেই মাংসের গুটলি হবে তাকে ফোঁড়া না ভেবে তক্ষুনি জিপির কাছে যেতে হবে। জিপি কিন্তু এ ব্যাপারে সমস্ত নিয়ম উপেক্ষা করে দ্রুত ম্যামোগ্রাম করতে পাঠান। সে ফুসকুড়ি নিরাপরাধ বা বিনাইন হতে পারে। আবার তা রাগী উন্মুখ বা ম্যালিগন্যান্টও হতে পারে, হতে পারে ক্যান্সারাস। এবং তা হলে দেহ পেতে দিতে হয় ফালি করার জন্য! তাতে আয়ুঘাট পেরুলেও বড় বড় অস্ত্রোপচারে দেহ হয়ে যায় একেবারে ভিন্ন। কিছুদিনের জন্য চোখ জোড়া থাকে সন্ধ্যার মতো ঘোলা। জীবন সীমিত হয়ে আসে বাথ্রুম আর বিছানায়। আমার পরম স্নেহের স্বল্পভাষিণী শিক্ষক দীপাকে দেখে তাই মনে হয়েছিলো। প্যাট্রিসিয়া ও দীপা আমারই সঙ্গে এ দেশে শিক্ষকতা করতে এসেছিলো। আজ তারা কেউ নেই!

তবে সময়মত ধরা পড়াটাই কথা। লক্ষ্মণ না দেখা গেলেও নিয়মিত বক্ষ পরীক্ষার জন্য এ আব্রু খোলা- এই অজানা অচেনা নারীর কাছে দেহখানি তুলে ধরা। এ নিয়ে লজ্জার কিছু নেই। পাগলের বিষ নেই, রোগীর নেই পর্দা আর মৃতের নেই কোন মতামত। আমি এটা জানি, তাই মনে মনে বিরক্ত হয়ে গান ধরি, ও আমার কৃষ্ণ বরণ কইন্যারে, এই দুই খণ্ড মেদ নিয়া কর তোমার মনে যাহা লয়। আর দ্রুত ছুটি দাও।

ভালো অসুখ বলে কোন কথা নেই। তবু এই স্তন-কর্কট রোগের ভালো দিক এই যে- প্রথম অবস্থায় ধরা পড়লে মানুষ বেঁচে যায়। আমার প্রিয়জনদের দু’তিন জন ছাড়া কেউই প্রথম অবস্থায় টের পায় নাই। স্তন ক্যান্সারে প্যাট্রিসিয়া, দীপা ও দুর্দান্ত সাহসী সুন্দরী বহুগুণে গুণান্বিতা শেলীকে ঐ দুষ্ট ব্যাধির জন্য চলে যেতে হয়েছে। ওদের হারিয়ে এমন ভয় পেয়েছি যে সমন পেলেই পুতুর পুতুর করে দৌড় দি পরীক্ষা করাতে।

বাঁচতে হলে এ পরীক্ষা অপরিহার্য। তাই লজ্জা লুকিয়ে নিজেকে নার্সের সঙ্গে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় নিজের বেকুব চেহারায় চালাক ভাব আনার চেষ্টা করি। মেশিন কি আর মন বোঝে? তার ওপরে যা ঠেসে ধরা হবে তার ভেতরে জোনাক জ্বেলে ছবি তুলবে। কিন্তু জোরে আকর্ষণ করলেই কী, তা তো আর দেহের দরোজার বাইরে যেতে পারে না। বরং স্তনে টান পড়লে পুরো বুক বাহু এমনকি দেহও সঙ্গে রওয়ানা দেয়।

কিন্তু মমতাময়ী নার্স এর কৌশল জানে। স্ক্যান করার জন্য কীভাবে এ শীতল ও শক্ত ক্রেন মার্কা যন্ত্রে হেলে পড়তে হয়, হাত তুলে সারেন্ডারের ভঙ্গিতে দাঁড়াতে হয় সব সময়। মেটালের ওপর আমার মেদখণ্ড বসিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করিয়ে পালা করে আমার ঐ অংগ দুটোকে রঞ্জনরশ্মির জন্য একটা একটা করে ফিট করে ছবি নিতে থাকলো। আমি শুধুমাত্র নিম্নাঙ্গের পোশাক পরা অবস্থায় গা থেকে স্তন খুলে দেবার চেষ্টা করতে থাকলাম। তার কথায় একবার হাত পিছাই তো আরেক বার ঘাড়। এক সময় সে ধাতব অন্ধকার ফুঁড়ে নারীকন্ঠ বলে, ওয়েল ডান মিসেস আজাদ, ইউ মে ড্রেস আপ নাউ।

পর্দার এ পাশে এসে কতকিছু মনে পড়ে। পোশাক পরতে পরতে মনে পড়ে ক’বছর আগে একবার আমি একটি ভ্রাম্যমান পরীক্ষা কেন্দ্রে এসেছিলাম। তখন ক্যানাডা থেকে কবি ফেরদৌস নাহার লন্ডনে এসেছিলো তার এক বান্ধবীর কাছে। ওর সঙ্গে দেখা হবে মনে আনন্দ।

তখন পুরো বসন্ত। বাইরে বেরিয়ে দেখি তাজ্জবি কাণ্ড! চেরি ব্লসমের নিচে রেখেছিলাম আমার গাড়ি। তাতে স্ট্রবেরি আইসক্রিম রঙা পাঁপড়িতে ঢেকে গেছে আমার রূপালী রাজহাঁস। মহা আনন্দে গাড়িতে বসে চাবি ঘোরাতেই রেডিও এফএম এ জনি ক্যাশ তার গলায় বাজাতে থাকেন দুনিয়ার গয়না। আহা আহা! আর এদিকে এতো পাঁপড়ি পড়েছে রাস্তায় যে তার উপর দিয়ে চলতে নিজেকে রানী রানী লাগছে। আজ আমি ফুলের ওপর দিয়ে ভাসবো। কিন্তু তার আগে ফেরদৌস ফেইসবুকে আমাকে যে একটা মোবাইল নম্বর দিয়েছিল তাতে ফোন করা দরকার।

কবি, কোথায়? কিন্তু উত্তর দিল ভিন্ন এক রিনরিনে কন্ঠস্বর। আমি বলি, কী নাম তোমার কন্যা, কোথায় তোমার ঘর, এতো সুন্দর তোমার স্বর। মন ভালো থাকলে আমি অমন রঙ্গ করি। অন্যপ্রান্তে হেসে সে মেয়ে আমার আকাশে হৈ হৈ এনে দেয়।

– ফেরদৌস আপা এখন একটু বাইরে। অহ। শামীম আপা আপনি ভারি অহংকারি। ফেইসবুকে আপনাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলাম- আপনি একসেপ্ট করেননি। অ। সে হাসে সেই কাপ পিরিচের, মেঘের হৈ চৈ এর হাসি। এমন মেয়েকে আমি কষ্ট দিলাম? এতো সহজিয়া নারী! তারপর গাড়ি থামিয়েছিলাম। আমার ওর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছিল।

– দেখো, ঠিক চলে আসবো একদিন।
– আপা, আসতে হবে না। আমি ব্রেস্ট ক্যান্সারের পেশেন্ট। শেষ পর্যায়ে ট্রিটমেন্ট এ গেছি বলে আমার আশা নেই। এ শুনে স্তব্ধতার পরে আর যদি কিছু থাকে সে স্তরে ঢুকে আর বেরুতে পারি না।

আপা, আপনি খালি দোয়া করবেন আমার একটি ছয় বছরের ছেলে। ওর বাবা থেকেও নেই। আমরা দুজন ফাইট করছি একসাথে। ফেরদৌস আপা এজন্যই আমাকে দেখতে এসেছে…

তারপর প্রায় আধ ঘন্টা ওর সঙ্গে কথার শেষে গাড়িতে চাবি ঘোরাই। চোখের সামনের সব রং নাই হয়ে গেছে, উড়তে থাকা সব পাঁপড়ি রঙহীন। এক কৌণিক পৃথিবী নেমে এসে আমাকে খেজুর কাঁটার মতো কেচাতে থাকে। কান্না আসে। মনের শূন্যস্থানে না দেখা এই তরুণী মায়ের চেহারা দেখি।

মনে পড়ে আমার সে চাচীর কথা, কন্যার পরীক্ষাটা পার করে তবে ডাক্তার দেখাতে গিয়ে শোনেন তার স্তন ক্যান্সার চতুর্থ পর্বে এসে পড়েছে। মনে পড়ে অসাধারণ মানবিক গুণে অধিকারিনী ও শিক্ষক বন্ধু প্যাট্রিসিয়ার হস্পিসের শেষ দিনগুলোর কথা। কিছুই যখন মুখে রোচে না, আমি ওর কথা মতো মাখা মাখা করে কাঁচকি মাছ আর রশুনের ফোঁড়নে লাল শাক ও আতপ চালের ভাত রান্না করে নিয়ে গেছি। আমি ওর মুখে নলা তুলে দিচ্ছি তখনই দেখি বাড়ি থেকে ওর কিশোর পুত্র আকাশ এসেছে। মাকে দেখে স্কুলের কী একটা কার্যক্রমে যাবে।

প্যাট্রিসিয়া আমাকে থামিয়ে বলে, আপা ওরে দেন, খাক, অনেক আনছেন তো। বাবা, খাবি একটু? শামীম আপা, আমি তো নাই, ছেলে দুইটা কী খায় না খায়! স্যামুয়েল কি আর পারে?

আহারে মায়ের জান! মনে পড়ে যায় হ্যান্স ক্রিস্টিয়ান এ্যান্ডারসনের সেই বিখ্যাত গল্প। ছেলেটি প্রেমিকার জন্য মাকে হত্যা করে তার কথামতো মায়ের হৃদয় হাতে নিয়ে ছুটে যাবার সময় উষ্ঠা খেয়ে পড়ে গেলে মা’র রক্তাক্ত হৃদয় বলে, বাবা ব্যথা পাসনি তো?

প্রতি অংগে, এমনকি আঙ্গুলেও জীবন আটকে রাখার যন্ত্রপাতি প্যাট্রিসিয়ার, সে যেকোনো মুহূর্তে চলে যাবে- আর কিনা ভাবছে তার ছেলে খেয়েছে কিনা! সেদিন আমি বাড়ির পথ ধরে জারে জার হয়ে কাঁদতে থাকি। হা ঈশ্বর, মা জাতির এতো প্রয়োজনীয় অঙ্গে তুমি এতো বিষ কী করে দাও- কেন দাও!

বাইরে বন্ধুটি অপেক্ষায় ছিল, আমাকে ম্লান মুখে বেরিয়ে আসতে দেখে উঠে এসে হাত বাড়িয়ে দেয়। মন খারাপ কেন শামীম? কিছু বলেছে ওরা? নাহ্‌।

এক সপ্তাহের মধ্যেই যথারীতি মেমোগ্রামের ভাল ফল পেয়ে স্বস্তি হলো।

পরিচয়: কবি ও কলামিস্ট
[email protected]

২১ জুন ২০১৯

শেয়ার করুন:
  • 634
  •  
  •  
  •  
  •  
    634
    Shares

লেখাটি ৩,৯৬০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.