কী খাবেন, আর কী খাবেন না!

0

শিল্পী জলি:

এক নারী এসেছেন ডাক্তার দেখাতে, ডায়াবেটিস হয়েছে কিনা চেক করে দেখতে চান। ব্লাড সুগার চেক করে দেখা গেল ৪৭৪ mg/dl (milligrams/deciliter)। ১৮ দিয়ে ভাগ দিলে তার বাংলাদেশী নাম্বারটি হবে ২৬.৩ mmol/L (millimoles/liter), ডায়াবেটিসের জন্যে ভয়ঙ্কর একটি নাম্বার।

গত বছরই তিনি ডায়াবেটিস মুক্ত ছিলেন। অথচ এবার ডায়াবেটিসের উপর দিয়ে হাঁটছেন। কত বড় শক এটা তার জীবনে যার না ঘটবে তার উপলব্ধিতে আসবে না এই ধাক্কা। অথচ ডায়াবেটিস মানেই কিডনি, হার্ট, চোখ, পা, নার্ভ, লিভার ইত্যাদি সকল অঙ্গ ক্ষতির মুখোমুখি, মৃত্যুর পরোয়ানাও। সেখানে নাম্বার যদি ৪৭৪mg/dl হয়, মন কেমন কেমন করে তখন!

ডায়াবেটিসে রক্তের ব্লাড সুগার (গ্লুকোজ) কত সেটা টেস্ট করা হয়। ফাস্টিং মানে আট থেকে বার/চৌদ্দ ঘন্টা না খাওয়া ব্লাড সুগার ১০০mg/dl এর নিচে থাকা, আর খাবারের আগে ৭০-৯৯ mg/dl, এবং খাবারের দুই ঘন্টা পর ১৪০mg/dl হলো নরমাল।

আরেকটি হিসেব বা টেস্ট আছে ডায়বেটিস পরিমাপের, সেটা হলো হিমোগ্লোবিন A1c (HBA1c) যেটা দুই-তিন মাসের গড় গ্লুকোজ পরিমাপ করে, রেড ব্লাড সেলের হিমোগ্লোবিনের সাথে কী পরিমাণ গ্লুকোজ যুক্ত হয়ে আছে সেই হিসেব। নরমাল হলো ৫.৭% এর নিচে। এর উপরে হলে সেটা প্রি-ডায়াবেটিক (৫.৭% -৬.৪%)। আর সংখ্যাটি যদি ৬.৫% এর উপরে চলে যায় তাহলে আমেরিকাতে ডায়াবেটিক পেশেন্ট হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয় তাকে।

শরীরে ঘাড়, হাতের নিচ বা এখানে ওখানে কালো কালো কালো ছোপ পড়া প্রিডায়াবেটিসের লক্ষণ। যদিও সাধারণের চেয়ে তাদের শরীরে ইন্সুলিনের মাত্রা সাত আটগুন বেশি থাকে, কিন্তু সেটা তেমন কার্যকরি থাকে না। সকালে চাপা পেট নিয়ে ঘুম থেকে উঠে দিন বাড়ার সাথে পেট ফুলে ফুলে উঠে গোলগাল হয়ে যাওয়াও প্রিডায়াবেটিকের লক্ষণ। খাওয়ার পর তাদের রক্তের সুগার কমে না, আবার ইন্সুলিনও নামে না। আর রক্তে গ্লুকোজ লেভেল নরমালের চেয়ে হাই থাকলেই সেটা ইনফ্লেমেশন ঘটায় নার্ভ এবং রক্তনালীর, শুরু হয় নানাবিধ জটিলতা।

নরমাল মানুষ খেলে যখনই রক্তে গ্লুকোজ লেভেল হাই হয়, তখনই তাদের বেটা সেল ইনসুলিন রিলিজ করে, যেটা কোষে কোষে গ্লুকোজ পৌঁছে দিয়ে অতিরিক্ত গ্লুকোজ গ্লাইকোজেন রূপে জমা করে নিজে মিলিয়ে যায়। কিন্তু যারা প্রিডায়াবেটিক বা টাইপ টু ডায়াবেটিস, তাদের হয় ইন্সুলিন পর্যাপ্ত পরিমাণ উৎপাদন হয় না, নয়তো সেলগুলো ইন্সুলিন রেজিস্ট্যান্স হয়ে যায়, অর্থাৎ রেসপন্স করে না বা কার্যকর থাকে না, রক্তের গ্লুকোজ হাই থাকে।

তবে টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস যাদের, তাদের কেস ভিন্ন। তাদের ইন্সুলিনই উৎপাদন হয় না ফলে বাইরে থেকে ইন্সুলিন ইনজেক্ট করতে হয়। লিভারেও বাড়তি ফ্যাট জমা নেই তাদের। কিন্তু প্রিডায়াবেটিক বা টাইপ-টু ডায়াবেটিস তাদের থেকে ভিন্ন, তাই এগুলোকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। এদের ইনস্যুলিন উৎপাদন আছে, কিন্তু ইন্সুলিন রেজিসটেন্স হয়ে গিয়েছে বডি। পর্যাপ্ত ফ্যাটও আছে জমা, অজায়গায় (লিভার, যকৃৎ)– অতিরিক্ত ভুল খাদ্য গ্রহণ, অতিরিক্ত খাওয়া, এবং বার বার খাওয়া জনিত কারণে।

ডা. জেসন ফাং নতুনভাবে যে ব্যাখ্যাটি সামনে এনেছেন সংক্ষেপে তাহলো, মানুষের অতিরিক্ত কার্ব (ভাত, রুটি, আলু, পাস্তা) এবং সুগার খাওয়া (চিনি, গুড়, মিষ্টি, মিষ্টি ফল), বার বার খাওয়া, পরিমাণে বেশি খাওয়া ইত্যাদি কোষকে এমনই গ্লুকোজে ভরে রাখে যে তার পক্ষে আর গ্লুকোজ নেয়া সম্ভব নয়। তথাপি টাইপ টু ডায়াবেটিকদের বাইরে থেকে আরও ইন্সুলিন ইনজেক্ট করা হয়, যা কিনা কোষকে ফোর্স করে আরও গ্লুকোজ গ্রহণ করতে, অনেকটা ভরা বাসে ঠেলে লোক ওঠানোর মতো। তখন কোষ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি লিভারেও ফ্যাট জমতে জমতে ফ্যাটি লিভারে পরিণত হয়, পানক্রিয়াসেও ফ্যাট জমতে থাকে। অথচ ফ্যাট বার্নের সুযোগ নেই যতক্ষণ রক্তে গ্লুকোজ ও ইনসুলিন থাকে। কেননা শরীর প্রথমে গ্লুকোজ ব্যবহার করে তারপর জমাকৃত গ্লুকোজে (গ্লাইকোজেন) হাত দেয়, তারপরও যদি এনার্জির দরকার হয় তখন ফ্যাট ভাঙে এনার্জি পেতে। ফ্যাট তাদের সেভিংস একাউন্ট, যতক্ষণ চেকিং একাউন্ট সমৃদ্ধ থাকবে, ততক্ষণ সেভিংস বা ফ্যাটে হাত পড়বে না।

ডা. ফাং ইন্সুলিন দিয়ে রক্তের গ্লুকোজকে কমিয়ে রাখাকে কোন কার্যকর পদক্ষেপ মনে করেন না। তার মতে, এটা আসল সমস্যা দূর না করে ভুলদিকে চিকিৎসা করানো। তিনি বলেন, টাইপ টু ডায়াবেটিস যেহেতু খাওয়াজনিত অসুখ–অতিরিক্ত খাওয়া, ভুল খাদ্য খাওয়া, বার বার খাওয়া, তাই খাওয়া ঠিক করেই রোগ ঠিক করতে হবে।

তার মতে, হাই ফ্যাট (হেলদি ফ্যাট), মধ্যম মানের প্রোটিন, এবং লো কার্ব ডায়েট খেতে হবে। অর্থাৎ কিটো ডায়েট যেটা শরীরের ফ্যাটকে ভেঙে এনার্জি যোগায়, যেই খাবারে থাকে ৭৫% ফ্যাট, ২০% প্রোটিন, এবং ৫% কার্ব। ঐ ৫% কার্বও প্রোটিন এবং সবজি-টবজি থেকেই আসে। তাই আলাদা করে আর ভাত-রুটি বা আলুর সংযুক্তির পথ নেই।

মানুষ যখন কার্ব বা সুগার খাবে না তখন রক্তের গ্লুকোজও হাই হবে না, ফলে ইন্সুলিনের রিলিজ ঘটবে না। ইন্সুলিনের অনুপস্হিতিতে বাধ্য হয়ে শরীর ফ্যাট বার্ন করবে এনার্জির জন্যে।
এতে রক্তের গ্লুকোজ যেমন কমবে, তেমনি লিভারের ফ্যাট গলবে, তেমনি প্যানক্রিয়াসের ফ্যাটও। ফ্যাটমুক্ত হয়ে অঙ্গপ্রতঙ্গগুলো আবার কার্যকর হবে।

এর জন্যে দরকার ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংও — বার বার না খেয়ে, দীর্ঘ গ্যাপে মানে ১২-২০ ঘন্টা না খেয়ে থেকে দিনে মাত্র একবার বা দুবার খাওয়া। তবে সারাদিনই পানি খাওয়া চলবে। আর মাথা ঘুরলে একটু লবন পানিও। সেইসাথে জীবনকে চিন্তামুক্ত এবং ব্যায়ামযুক্ত করতে পারলে জীবন হবে অতীব সুন্দর।

এসব গল্প শুনে ভাইয়ের বউ বলে ভাত না খেলে মাছ খাবো কী দিয়ে? শুধু শুধু কী মাছ খাওয়া যায়?

শুধু শুধুই অথবা সালাদ বা সবজি দিয়ে মাছ খেতে হবে। মাংস, তরকারি, ডালও শুধু শুধু বা একসাথে মিশিয়ে খেতে হবে। খাবারে ভাতরুটি, মিষ্টি, মিষ্টি ফল, চিনি-গুড় সবই বাদ দিয়ে যা থাকবে তাই খেতে হবে। শক্তি পেতে হেলদি ফ্যাট খেতে হবে যেমন নারকেল তেল, অলিভ ওয়েল, বাটার, ঘি, এ্যাভাক্যাডো, সব রকমের বাদাম, সানফ্লাওয়ারের বিচিসহ অন্যান্য বিচি। সব সবুজ সবজিসহ শশা, পালং, কপি, বেগুন, লাউ, চালকুমড়া, শ্রীচন্দন, শাক, ডাল, মাংস, হালিম, তৈলাক্ত এবং অন্যান্য মাছ। ডিমও খাওয়া যাবে।

ডালের ভেতর সবজি দিয়ে বা এটার ভেতর ওটা দিয়ে খাওয়ার ব্যাপারে সৃষ্টিশীলতা বাড়াতে হবে। তবে স্বাদ বাড়াতে যারা খাবারের ভেতর দুধচিনি গুলে দেন, স্বাদে ভরপুর ঐ খাবার বিষসম। ওমন বাবুর্চির খাবার অবশ্যই বুঝেশুনে গ্রহণ বা বর্জন করা উওম।

আবার খেতে গিয়েও একগাদা খাওয়া চলবে না, পোরশোনটি ঠিক রাখতে হবে। না খেয়ে থাকতে থাকতে বেশি দুর্বল লাগলে একটু ফ্যাট চেটে নিলে শরীর এনার্জি পাবে। খাবার শুরুটিও ফ্যাট দিয়ে করা ভালো এতে মন হালুমহুলুম করে কম খেতে চায়। পেট ভরেছে সিগনাল পেতে ব্রেনের বিশ মিনিটের মতো সময় লাগে, অতএব ধীরে ধীরে খাওয়া বাঞ্ছনীয়।

পুরুষের কোমর যদি ৪০ ইঞ্চির বেশি আর নারীর যদি ৩৫ এর বেশি হয় তাহলে তাদের ঝুঁকি আছে। এশিয়ান মেয়েদের আরও কম পেট– কোমর-নিতম্বের ভাগফল দশমিক আটের উপরে হলে পেট কমাতে হবে। ব্যায়াম করেও পেট যদি না কমে তবে ফাস্টিং করে এবং কিটোডায়েটের মাধ্যমে ইন্সুলিন এবং ব্লাড গ্লুকোজের মাত্রা কমাতে হবে যেন শরীরে ফ্যাট বার্নের পরিবেশ তৈরি হয়।

বয়স, ওজন, কোমর, ফ্যামলি হিস্ট্রি, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, ঘুমের সমস্যা, পলিসিসটিক ওভারি, অলস জীবন, দুঃশ্চিন্তা, এবং অস্বাস্হ্যকর খাদ্যাভ্যাস ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। আর ডায়াবেটিসের জটিলতায় হাইব্লাডপ্রেসার, স্ট্রোক, অন্ধত্ব, কিডনি ফেইলর, হার্ট এ্যাটাক, অঙ্গহানি বা এম্পুটেশনের ঝুঁকি বাড়ে।

উপায় হলো এ্যাকটিভ জীবন, ওজন কন্ট্রোল, হাইফ্যাট লো-কার্ব ডায়েট ভক্ষণ, ইন্টারমিটেন্ট ফ্যাস্টিং– দীর্ঘ গ্যাপ দিয়ে খাওয়া।
সেইসাথে খাওয়ার আগে ও পরে নিয়মিত ব্লাড চেক করে গ্লুকোজের উত্থান-পতন পর্যবেক্ষণে রাখা।

শেয়ার করুন:
  • 86
  •  
  •  
  •  
  •  
    86
    Shares

লেখাটি ৬৫৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.