‘বাবা’ তো শুধুই একটি সম্পর্কের নাম নয়!

0

রিমি রুম্মান:

“পৃথিবীতে খারাপ মানুষ থাকতে পারে, কিন্তু খারাপ বাবা একটিও নেই” এমন কথা বেশিরভাগ সন্তানের মুখে মুখে ফেরে, জানি। কিন্তু আমায় অবাক করে দিয়ে আমারই এক সময়ের কলিগ একদিন আমায় জানায় ভিন্ন কথা।
বলেন,’এই যে বাবাকে নিয়ে এতো এতো মধুর স্মৃতির কথা, শৈশবের কথা আবেগ ঢেলে লিখতে পারছো, তুমি বেশ ভাগ্যবান। এদিক থেকে আমার দুর্ভাগ্যই বলা চলে। আমার এমন মধুর কোনো স্মৃতি নেই বাবার সাথে’।

বাবার কথা বলতে গিয়ে তিনি অঝোরে কেঁদেছেন, আর তীব্র আক্ষেপ নিয়ে বলেছেন, বাবা মানেই তার কাছে এক খণ্ড ঘৃণার নাম। কেননা খুব ছোটবেলায় তাদের দুই ভাইবোন আর মাকে একা ফেলে রেখে চলে যান অন্যত্র। রূপবতী এক নারীকে বিয়ে করেন। নতুন সংসার গড়েন। বছর ঘুরে বাবা দিবস এলে সে বাবাকে নিয়ে ‘আমার বাবা পৃথিবীর সেরা বাবা’ কিংবা ‘আমার বাবা বিশাল এক মহীরুহ’ এমনটি লিখতে পারে না ঠিকই, কিন্তু তাই বলে ‘আমার বাবা ভালো বাবা নন’ এমনটিও লিখেন না। বাবার প্রতি অভিমান, ক্ষোভ যতই থাকুক, বাইরের কেউ তার বাবাকে খারাপ জানুক, এমনটিও চান না তিনি।

আবার নিউইয়র্কের পাশের অঙ্গরাজ্যে বসবাস করেন আমার এমন খুব কাছের এক বন্ধুর কথাই বলি। আমার বন্ধুটি সাংসারিক নানাবিধ কাজে যখনই ঘরের বাইরে যায়, তার দশ বছর বয়েসি ছোট্ট মেয়েটি ভয়ে আতংকে মা’কে বাহিরে যেতে দিতে চায় না। কখনো বা নিজেও মায়ের সাথে বাইরে যেতে বায়না ধরে। কন্যাটিকে বাবার কাছে রেখে গেলে সে বারংবার ফোনে কান্নাকাটি করে জানতে চায়, মা কখন বাসায় ফিরবে। এহেন পরিস্থিতিতে মা পড়ে যায় বিপাকে। ভয়ে আতংকে কুঁকড়ে থাকা কন্যাকে আদর দিয়ে, ধমক দিয়ে, সবভাবেই জানতে চাওয়া হয়েছিল কী তার সমস্যা। বাবা তো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আশ্রয়স্থল। দীর্ঘদিন পর কন্যাটি মুখ খোলে। জানা যায়, মাস খানেক আগে বাবা নামের মানুষটি মায়ের সাথে চরম বিবাদে লিপ্ত হয়েছিল, এবং সে রাতে নেশা করে রাতভর চিৎকার, চেঁচামেচি করেছিল। সেই ঘটনাটি ছোট্ট মেয়েটির শিশু মনে তীব্র প্রভাব ফেলেছিল। বাবাকে সেই থেকে তার ভয়, আতংক।

আবার এই শিশুটিকেই একদিন মা যখন শিখিয়ে দিলেন, ‘এরপর তোমার বাবা যদি আমার গায়ে হাত তোলে, তুমি কিন্তু লুকিয়ে ৯১১ করবে, পুলিশকে জানাবে’, কিন্তু সে কিছুতেই তা করতে রাজি নয়। তার ভাষ্য, আমি তোমাদের দু’জনকেই ভালোবাসি, আমি তোমাদের দু’জনের সাথে একসাথে একই বাড়িতে বসবাস করতে চাই। অর্থাৎ পুলিশ এসে তার বাবাকে ধরে নিয়ে যাক এমনটি চায় না। বাবা যতোই খারাপ, ভীতিকরই হোক না কেন, তবুও সে তার বাবাকে ভালোবাসে পাহাড়সম।
আমার বন্ধুটি জানায়, কন্যার বাবা রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না যদিও, কিন্তু সন্তানদের ভালোবাসতে কার্পণ্য করে না। সব রকম আবদার মেটানো, সুন্দর সুন্দর জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, পছন্দের খাবারটি খেতে নিয়ে যাওয়া, এসব কিছুরই কমতি করেন না।

আরেকজন বাবা অন্তঃপ্রাণ নাইনথ গ্রেড পড়ুয়া ছেলের কথা বলি।

হাই স্কুলে অনেক টিনএজার ছেলেমেয়ে সঙ্গদোষে ড্রাগ এডিক্টেড হয়ে উঠে বলে শুনেছি। উঠতি বয়েসি ছেলেমেয়েরা কেমন করে এবং কেন এ পথে যায়, এমন এক আলোচনায় প্রিন্সিপ্যাল আমার পরিচিত সেই অভিভাবককে বেশ কিছু কারণ এবং উদাহরণ ব্যাখ্যা করেছিলেন। তার স্কুলের প্রচণ্ড মেধাবী এক ছাত্রের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে জানান, কেমন করে ছেলেটি নেশাগ্রস্ত হয়ে উঠেছিলো। বাবার সাথে ছেলেটির বন্ধুত্ব ছিল সীমাহীন। সকল চাওয়া-পাওয়া, আবদার-আহ্লাদ, যে কোনো বিষয় শেয়ার করা, সবই ছিল বাবার সাথে। বাবাহীন পৃথিবী ছিল ছেলেটির কাছে কল্পনাতীত। ঠিক এমনই এক সময়ে আচমকা একদিন হার্ট অ্যাটাকে বাবার মৃত্যু হয়। ছেলেটি দিনের পর দিন হাউমাউ করে কাঁদে, মনখারাপ করে থাকে। হতাশায় নিমজ্জিত হয়। রেজাল্ট খারাপ করতে শুরু করে। বন্ধুরা তাকে তীব্র মানসিক যন্ত্রণা, দুঃখ ভুলে থাকবার জন্যে নেশা জাতীয় ওষুধের যোগান দেয়। একদিন, দু’দিন, তিনদিন…। একসময় ছেলেটি এডিক্টেড হয়ে উঠে। বর্তমানে সে রিহ্যাবে অবস্থান করছে। চিকিৎসাধীন আছে।
বাস্তব এই ঘটনাটি আমার পরিচিত সেই অভিভাবকের কাছ থেকে শোনা।

উপরের ঘটনাগুলো থেকে ঘুরেফিরে একটি সত্যই বেরিয়ে আসে, সন্তানের কাছে বাবা বড় বেশি মায়াবী এক প্রকাশ। হোক সে ভালো কিংবা মন্দ।

‘বাবা’ শুধুই একটি সম্পর্কের নাম নয়। বাবারা বিশাল বটবৃক্ষের মতো। যে কেবলই তুমুল ঝড়, ধুম বৃষ্টি, তীব্র খরা থেকে সন্তানকে আগলে রাখেন। গহিন অন্ধকারে পথ দেখান। সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দেন।

এখনকার অনেক বাবার মতো আমার বাবার সামর্থ্য ছিল না আমাদের বিদেশ ঘুরতে নিয়ে যাবার। কিন্তু সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দেশের ভেতরেই কাপ্তাই, রাঙামাটি, কক্সবাজারসহ অনেক জায়গায় ঘুরিয়েছেন। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে কখনোবা নিদেনপক্ষে দাদাবাড়ি, নানাবাড়ি বেড়াতে নিয়ে গিয়েছেন। শুক্রবার এলেও প্রায়ই আমরা সপরিবারে গ্রামের বাড়ি যেতাম। শহর থেকে খুব বেশিদূর নয়। ভোরের ট্রেনে গিয়ে সারাদিন থেকে সন্ধ্যায় ফিরে আসতাম। ছুটিছাটায় আনন্দময় একটি দিন কাটানো। বাবার সান্নিধ্যে এই গ্রামে যাওয়াটাই আমাদের কাছে বিদেশ ঘোরার মতো ছিল।

বাবার ভালোবাসা থাকলে অঢেল অর্থ না থাকার মাঝেও সুখ থাকে। অনেক না পাওয়ার মাঝেও তৃপ্তি থাকে। ছোটবেলায় বাবাকে রাশভারী, দূরের মানুষ মনে হতো। বাবা যখন আমাদের তিন ভাইবোনকে ঘড়ির সময় ধরে পড়া, খাওয়া, ঘুম শেখাতেন, কঠোর অনুশাসনের মাঝে বেড়ে উঠার পথ দেখাতেন, তখন যাপরনাই বিরক্তবোধ হতো। অথচ আজ আমার সুশৃঙ্খল জীবন, আমার সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার শিক্ষার শেকড় কিন্তু মূলত আমার বাবার শিখিয়ে দেয়া সেই মূলমন্ত্র। কথায় বলে না, ‘ঘুমিয়ে থাকে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে’।

বড় হতে হতে চিরকালের গম্ভীর আর কঠোর মনভাবাপন্ন বাবা কেমন করে যেন আমাদের বন্ধু হয়ে উঠলেন। পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের মানুষটি হয়ে উঠলেন। মনের দিক থেকে হয়ে গেলেন একেবারে শিশুর মতো কোমল। এই বিদেশের বাড়িতে বসে আমার প্রায়ই টুকরো টুকরো কিছু সুন্দর দিনের স্মৃতি মনে পড়ে।

সেদিন ছিল শীতের সকাল। ঢাকা শহর কুয়াশার চাদরে ঢাকা। দিনের ব্যস্ততা তখনো শুরু হয়নি। আমি ঘুমিয়ে ছিলাম আমার নতুন হলের ষোল নাম্বার রুমের শক্ত বিছানায়। রুমমেট সিনিয়র আপু ডেকে তুললেন ‘রিমি, তোমার আব্বু এসেছে’ বলে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আমার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হলো। সত্যিই আব্বার কণ্ঠস্বর কানে এলো। রিইইমিইই … রিমিইইই। এতো ভোরে! আমি লাফিয়ে উঠলাম। চোখ কচলাতে কচলাতে জানালার পাশে এসে দাঁড়ালাম। নিচে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখি আব্বা দাঁড়িয়ে। আমি আলুথালু বেশে সিঁড়ি ভেঙ্গে ক্যাঙ্গারুর মতো লাফিয়ে নিচে নেমে এলাম। বললাম, ‘আব্বা, এতো ভোরে ক্যমনে আসলেন? ক্যান আসলেন?’ মনের ভেতরে রাজ্যের জিজ্ঞাসা! আব্বার চোখে মুখে প্রশান্তির হাসি। বললেন, ‘তোরে দেখতে মন চাইছে, তাই রাতের লঞ্চে চইল্যা আসলাম। চল আজ আমরা ঢাকা শহর ঘুরবো’। আমরা বাপ-বেটি সেদিন রিকশায় ঘুরেছিলাম দিনভর।

আমার বিয়ের দিন কন্যা বিদায়ের সময় বাবা আমার হাত বরের হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘বাবা, আমার কিচ্ছু চাওয়ার নাই তোমার কাছে। শুধু আমার মেয়েটিকে যত্নে রাইখ্যো’। আমার ভেতরটা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল যেন সেদিন। কী সরল, নিঃস্বার্থ আর পবিত্র চাওয়া!

বাবার হাতটি ছেড়ে তারপর তো হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে উড়ে এলাম এই বিদেশ বিভূঁইয়ে। মাঝে সময় গড়িয়েছে ঢের। বাবাও চিরতরে আমাদের ছেড়ে গেছেন নয় বছর হলো। আজও এই ভিনদেশে হাজারও ব্যস্ততার মাঝেও পাঞ্জাবি, টুপি পরা কোন বৃদ্ধের হেঁটে যাওয়া দেখলে থমকে দাঁড়াই। এক মুহূর্তের জন্যে চমকে উঠি। ভাবি, কে যায়! বাবা নয়তো! আবার কোন পিতার হাত ধরে ছোট্ট মেয়েকে হেঁটে যেতে দেখলেও বাবাকে মনে পড়ে। কানে বেজে উঠে,

“আয় রে আমার কাছে আয় মামনি,
এ হাতটা ভালো করে ধর এখনি …”

রিমি রুম্মান
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

শেয়ার করুন:
  • 85
  •  
  •  
  •  
  •  
    85
    Shares

লেখাটি ৩৯৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.