কমলাদের যৌন জীবনের খবর রাখে কে!

0

শাহিনা হাফিজ:

(ঘটনাটি এই সমাজের ঘটে যাওয়া এক সত্য ঘটনা শুধু নামগুলো কাল্পনিক।)

কমলার বয়স আঠারো, ওর বিয়ে হয় চৌদ্দ বছর বয়সে। কমলা গার্মেন্টসের কাজ ছেড়ে দিয়ে বিয়ে করে কারণ ওর শশুড়বাড়ির লোকজন বলেছিল গার্মেন্টস কর্মীদের চরিত্র খারাপ হয়, বিয়ে করতে চাইলে ওই চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিয়ে করতে হবে।

কমলা তাই মেনে নিয়ে বিয়ে করে। বিয়ের এক বছরের মাথায় একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেয় কমলা। ছেলে সন্তানের বয়স যখন দেড় বছর, সে সময় ওর শাশুড়ি ওকে বাধ্য করে আবার কাজ শুরু করতে। কিন্তু সে কাজ অবশ্য গার্মেন্ট কর্মী হিসেবে নয়, গৃহকর্মি হিসেবে। কমলা প্রতিবেশির সহায়তায় খুব তাড়াতাড়ি বাসাবাড়িতে কাজ পেয়ে যায়। ঘরের তিনটি বড় কাজ ঘর মোছা, কাপড় ধোয়া আর বাসন মাজা। তিনটি কাজে পাঁচ হাজার টাকা করে মাসিক আয়। টাকার হিসাব আর সময়ের হিসেবে, টাকার লোভে শাশুড়ির জিহ্বা যেন লক লক করতে লাগলো। বউকে সে বললো, আরও দু’তিনটা বাড়ির কাজ খুঁজে নিতে, ওর দেড় বছরের বাচ্চা সামলে নেবার দায়িত্বও সে নিল।

শাহিনা হাফিজ

এরপর শুরু হলো কমলার কর্মময় জীবন। সকাল সাতটা থেকে বিকেল পাঁচটা। পাঁচ বাড়ির কাজ, মাসে আয় এখন বিশ হাজার। কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা, তারপর ঘরে রাতের রান্না, গোসল, খাওয়া, সন্তানকে সময় দেয়া এসব করতে করতে ক্লান্ত শরীর বিছানায় দেবার সাথে সাথে মুহূর্তের মধ্যে কখন যে গভীর নিদ্রায় ডুবে যায় কমলা নিজেও জানে না। এভাবেই দিন যায়, মাস যায়। কমলার শাশুড়ির একই প্রলাপ, বউ তুই পাঁচটা বছর এমন করে খাটলেই আমাদের আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না। দুইটা টিনের ঘর, ধানি জমি আর গরু এই সম্পদগুলো হয়ে গেলেই দেশগেরামে ফিরে যাবো, তখন তুই রাজরানী।”

কমলাও মনে মনে স্বপ্ন দেখে, ঠিকই তো, এখন তার কাজ করবার মতো শরীরে অঢেল শক্তি, এখনই খাটার বয়স। এভাবেই চলছিল দিনের পর দিন। এরই মধ্যে খবর এলো কমলার শাশুড়ি পোয়াতি। কমলা লজ্জায় শাশুড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতেও পারছিল না, শেষমেষ শাশুড়িই লজ্জা ভেঙে বললো, “তুই থাকিস না বাড়িতে তোর শ্বশুর আর আমি সারাদিন কি শুধু নাতিই পালবো? আমাদেরও একটু শখ আহ্লাদ আছে।”

কমলা ভাবে, তারও ভবিষ্যতে এমন সুখের দিন আসবে, স্বামীর আর কষ্ট করে ঢাকা শহরে রিকশা চালানো লাগবে না। গ্রামের বাড়িতে রাজরানীর মতো জীবন পাবে, এখনই তো তাদের খাটবার বয়স, তারপর সুখ।

এদিকে কমলা রোজ জন্মনিরোধক বড়ি খেয়েই যায়, স্বামীকে সুখ দেওয়াও তারই দায়িত্ব। স্বামী ভোররাতে কখনো কখনো কমলাকে ভোগ করে। স্বামীর ভোগেই কমলার তৃপ্তি। এভাবে দিন বয়েই চলেছে, এতোদিনে কমলার ছোট্ট সোনা যখন মুখে আধো আধো বোলে কথা বলতে শিখেছে সেই সময়ের কোনো একটা দিনের ঘটনা, কমলা তার ছোট্টসোনাকে আদর করে বলছে, “আব্বু কাজে যাই, দাদির সাথে ভালোমতো থেকো”।
উত্তরে ছোট্টসোনা বলে উঠলো, “দাদি তো থাকে না, আব্বু থাকে, আন্টি থাকে।” কমলার বুকের মধ্যে তখনই কী একটা বজ্রপাতের মতো হলো। তারপরও ও চুপচাপ কাজে চলে গেলো। সাতটা থেকে নয়টা পর্যন্ত প্রথম বাড়ির কাজ শেষ করে, এরপর থেকে ও আর কাজ করতে পারে না, হঠাৎ করে মনস্থির করে ফেলে তখনই বাড়ি ফেরার। অবশেষে বাড়ি ফেরে এবং দরজায় দাঁড়িয়েই শুনতে পায় ঘরে হিন্দিগানের সাথে সাথে ভেতরে নারী ও পুরুষকন্ঠ। পুরুষকন্ঠ তার পরিচিত স্বামীকণ্ঠ, কিন্তু নারী কণ্ঠটি অচেনা। কমলা প্রথমেই ভাবে ওর সন্তানের কথা। কোথায় ওর ছেলে, শাশুড়িই বা কোথায়?

অবশেষে কাছেই বাজারের একটা চায়ের দোকানের সামনে খুঁজে পায় তাদের। কমলা কোনো কথা না বলে শাশুড়ির হাত ধরে টেনে তোলে, এদিকে শাশুড়ি অকস্মাৎ তার বউকে দেখে প্রথমে ভূত দেখবার মতো লাফিয়ে ওঠে, তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলতে থাকে, “ও বউ, তোর মতো বুঝদার মেয়ে এই দুনিয়ায় কয়টা আছে? তুই বিয়ের শুরু থেকেই আমার সব কথা শুনছিস। তুই বছর ধরে কাম কাজ নিয়েই আছিস, কিন্তু ওরা তো পুরুষ মানুষ, তোর শ্বশুরের চাওয়া তো আমি মেটাতে পারি, কিন্তু তুই তো তোর স্বামীর কথা একবারও ভাবিস না। তোর টাকায় আমরা চলি, তাইতো তোকে কিছু বলতে সাহসও পাই না। এতো কষ্ট করে ছেলের বিয়ে দিয়ে বউ আনলাম, অথচ ছেলেটা কী পেলো? ছেলের শরীরের কষ্ট আমি মা হয়ে কত দেখবো?”

কমলার বুকের মাঝে এতোক্ষণ বয়ে যাওয়া ঝড় যেন ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়, ও একভাবে চিৎকার করে বলতে থাকে, “শুয়োরের বাচ্চা, তোর ছেলের শরীরের চাওয়া আছে, আমার শরীরের নাই? আমার শরীর কি সুখ চায় না? আমি কি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত আমার শরীরের কবর খুদি নাই, আমাকে কেন ঠকালি, আমাকে কেন ঠকালি?”

এরপর আরও কিছুদিন যায়, কমলার স্বামী বা শাশুড়ির দিকে কেউই আঙ্গুল তুলে বলে না, যে ওরা দোষী বা বিশ্বাসঘাতক, শুধু কমলার কিছু সঙ্গী জুটে যায়, যারা সুখে-দু:খে কমলাকে সহমর্মিতা জানায়। ইতিমধ্যে কাজে গাফিলতির কারণে সাতসকালের কাজটা হাতছাড়া হয়ে যায় কমলার। ও তার পরিবর্তে কাজ নেয় একটা দোকান ঘর মোছবার। কাজটা সহজ, একটামাত্র দোকান, ঘরের সাফসাফাই সময়ও বাড়তি রয়ে যায়।

দোকানের দেখাশোনা করবার দায়িত্বে যে নিয়োজিত সেই চব্বিশ বছর বয়সী বিবাহিত বশির একদিন হাত দেয় কমলার শরীরের আনাচে-কানাচে। এরপর থেকে শরীরে অভুক্ত থাকা অসুস্থ অসুখী কমলা হঠাৎ করে যেন সুখের সন্ধান পায়। ধীরে ধীরে ও সুস্থ হয়ে ওঠে। রাতের ঘুম ফিরে আসে, কাজে শক্তি ফিরে পায়। কমলার এই সুখ আর সুস্থ শরীর শাশুড়ি আর স্বামীর চোখে সন্দেহের নজরে আসে এবং অবশেষে সন্দেহ সত্যি হয়ে ধরা পড়ে মা-ছেলের চোখে। শাস্তিস্বরূপ ওর ভাগ্যে জোটে তালাক এবং সেইসাথে কমলার চরিত্র খারাপ বলে চারদিকে ঢিঢি পড়ে যায়। চরিত্রহীনা কাজের মেয়েকে কোন ঘরের স্ত্রীরাও বিশ্বাস করে আর কাজে রাখতে চায় না। বশিরের দোকানের মালিকও ওকে কাজ থেকে বের করে দেয়। বর্তমানে কমলা ওর পরিচিত আবাসস্থল ছেড়ে অন্য এলাকায় বাসা নিয়ে কাজও জুটিয়ে নিয়েছে তিনটা। ছেলেটাকে একটা স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। ওর জীবনে এখন একটাই স্বপ্ন, শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে কাজ করে ছেলেটাকে মানুষ করার। কমলার শরীরের এই শক্তি আসে ওর চার বছরের ছোট্টসোনাকে নিয়ে বেঁচে থাকবার স্বপ্ন থেকে।

চৌদ্দ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল যে কমলার, তার বয়স এখন ঊনিশ। সামনে এখনও ওর জন্য পড়ে আছে একটা দীর্ঘজীবন যে জীবনে ও শরীরকেও অস্বীকার করতে পারবে না। কিন্তু এই সমাজ থেকে তার এমনই এক অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতা হয়েছে যেখান থেকে সে সহজে বেরিয়ে আসতেও পারবে না।

পাঠক, এতো শুধু একজন কমলার গল্প, সমাজের বিভিন্ন স্তরে এমনই লাখো কমলার গল্প লুকিয়ে রয়েছে, তবে নারীর যৌন জীবন এর চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ।

শেয়ার করুন:
  • 270
  •  
  •  
  •  
  •  
    270
    Shares

লেখাটি ২,২৬৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.