স্বামীর দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত শরীরের অংশ বেহেশতে যায়!!!

0

লতিফা আকতার:

স্বামীর দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত শরীরের অংশ বেহেশতে যায়!!! – এক সময়ের প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা। যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে আত্মসম্মানে আঘাতের শামিল।

একটা সময় ছিলো গ্রামাঞ্চলে নারী নির্যাতনকে এভাবে এই লাইন দিয়ে ঢেকে রাখা হতো। অথবা নারীর কষ্ট কম করার জন্য অদেখা বেহেশতের লোভ দেখিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেওয়া হতো। এ যেন শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো বিষয় ছিলো। মোল্লা, মৌলভীরা ও তাঁদের ওয়াজ মাহফিলেও এই বিষয়টিকে এভাবে একটা লেবেল দেওয়ার চেষ্টা করতেন। আর ভুক্তভোগী নারী সেই সান্ত্বনাবাণী মনে মনে আউড়ে বা দু’এক সময় প্রকাশ্যে প্রকাশ করে নিজেকে বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করতো।

লেখক: লতিফা আকতার

আর এই সান্ত্বনা দেওয়াতে বা মিথ্যা বোঝানোতে ধর্মকে মাঝখানে টেনে আনা হতো। এখনো হয়। বেশি জনগোষ্ঠীর পালিত- ইসলাম ধর্মের রেফারেন্সটাই আসে। আহা! বেচারা ধর্ম। পুরুষ তাঁর বদ মেজাজের কারণেই অধিকাংশ সময় এ ধরনের কাজ করে থাকে। রান্না পছন্দ হয়নি, সময়মতো খাবার পায়নি, চাইলেই স্ত্রী’র শরীর যখন তখন পাওয়া যায় না, শ্বশুরবাড়ির লোকজনের মন ভরাতে ব্যর্থ নারী বিভিন্ন সময়ে এই ধরনের মারধোরের শিকার হয়েছে, হয়। কিন্তু এই বিষয়টি জায়েজ করে তুলতে, প্রতিষ্ঠা করতে মানুষ ধর্মকে টেনে আনে। অথচ ইসলাম ধর্মে স্ত্রীকে মারধর করার এতো সহজ অধিকার দেওয়া হয়নি। সৃষ্টিকর্তার কাছ হতে আদেশিত ফরজ মানতে চরমভাবে গাফিলতি করলে স্ত্রী’কে মৃদু প্রহার করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

সেই মৃদু আজ নারী জীবনে সজোরে বজ্রপাতের রূপ ধারণ করেছে। এর জন্য দায়ী পুরুষের পাশাপাশি নারীর নিজের পরিবারও। পুরুষ গায়ে হাত তুলে অন্যায় করে। আর নারীর পরিবার কন্যাটির দায়িত্ব নতুনভাবে যাতে নিতে না হয় তার জন্য “সয়ে থাকো, সয়ে থাকো”- মালা জপে। আর এই মালা জপের শব্দ পুরুষটিকে উৎসাহিত করে।

সত্যিকার অর্থে এর শুরু শৈশব হতে। নারী যখন নারী হয়ে ওঠে না। শুনতে ভালো না লাগলেও একটি কন্যা শিশু তাঁর পরিবারে হতেই বৈষম্যের শিকার। আর এই মারধোর ও অনেক সময় পরিবারে কন্যা শিশুটিকে সহ্য করতে হয়। সেটা নানান কারণে হতে পারে। মায়ের কাজে সাহায্য করতে না চাইলে, চলাফেরায় পরিবারের তৈরি নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটালে। আরো অনেক কারণে। সবচাইতে বড় কারণ হতে পারে পিতৃকূলের অমতে কাউকে ভালোবেসে ফেললে। এবং ভালোবাসার মানুষটিকে ছাড়তে না চাইলে। এসব ক্ষেত্রে পিতা, বড় ভাই, ক্ষেত্রবিশেষে ছোট ভাইও অনেক সময় গায়ে হাত তুলে। কিন্তু একইদিকে বাড়ির ছেলেটি যদি রাত করে বাড়ি ফেরে, কিংবা সমাজের পাঁচটা নিয়মকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে চলে, হুট করে বিয়ে করে বউ নিয়ে হাজির হলেও পরিবার হতে সেভাবে কোনো গণ্ডগোল সৃষ্টি হয় না। গায়ে হাত তোলাও হয় কদাচিত।

আসলে পুরুষ নারী’র গায়ে যে হাত তোলে, এর প্র্যাকটিস তাঁর নিজ পরিবার হতে শুরু। বোনের গায়ে হাত তুলে, কাজের মেয়ে, কাজের ছেলেকে মেরে। মানুষ অভ্যাসের দাস। আর দাস চরিত্র প্রকাশ পায় যৌথ জীবনে। অধিকাংশ পুরুষই বুঝতে পারে না স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার বিষয়টি খুবই নিকৃষ্ট একটি বিষয়। এবং এটা রীতিমতো অপরাধ। এখানেও তার পুরুষতন্ত্রের আমিত্ব তাকে সুপিরিয়র ভাবতে শেখায় এবং স্ত্রীকে শাসনে রাখা পৌরুষত্বের অংশ হিসেবে মনে করে। আর এই শাসন করতে গিয়ে মারধোর করা জায়েজ। আর এটি আরো জায়েজ হয়ে যায় যখন নারীর পরিবার শক্তভাবে এর প্রতিবাদ করে না।

শুনতে অনেক খারাপ শোনালেও মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া কন্যা শিশুটি অনেক দুর্ভাগা। অধিকাংশ পিতার বাড়িতে কন্যাকে পড়ালেখা করিয়ে বড় করা হয় ভালো বিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। আর এই মহৎ উদ্দেশ্যে সম্পন্ন করার পর পিতৃকুলের সবাই অনেকটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। সেখানে স্বামীর হাতে মার খাওয়া তো খুব বেশি কষ্ট, অপমানের কী আছে!! যে ভরণপোষণ দেয় সে তো একটু আধটু শাসন করতেই পারে। যেমনটা তাঁরা করেছে। এখানেও ধর্ম একটা বিষয়। কেননা ইসলাম ধর্মে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে- ডিভোর্স প্রাপ্ত কন্যা সন্তানকে সেভাবে খেয়াল রাখতে হবে, যেভাবে অবিবাহিত কন্যার রাখা হয়। এক কন্যার ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার দায়িত্ব নিতে কম বাবা মাই চায়। তার উপর নিজেদের মেকি সম্মানবোধ তো রয়েছেই। তাই নারী’র স্বামীর হাতে মার খাওয়া আরো সমর্থিত হয়ে যেতে থাকে।

তবে আজকাল অবশ্য পরিবেশ বদলেছে। অনেক পিতামাতা কন্যার গায়ে হাত তোলার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ করে। পাশে দাঁড়ায়। পরিবেশ এমনও হয় যে, কোনো কোনো নারীও পুরুষটির গায়ে হাত তোলে। সংখ্যায় কম। তবে হয় না যে তা একেবারেই নয়।

সংখ্যা কম বা বেশি যাইহোক না কেন- একজন সঙ্গী অপর সঙ্গী’র গায়ে হাত তুলছে এটা খুবই বিশ্রী বিষয়। এটা ব্যক্তি’র কুশিক্ষার বহিঃপ্রকাশ। একজন সুশিক্ষিত মানুষ কখনোই অন্যজনকে আঘাত করতে পারে না। আর এই আপনি যখন আঘাত করেন তখন আপনার মনুষ্যত্বের অপমৃত্যু ঘটে। আপনি তখন পশু মানুষে পরিণত হোন। একজন ব্যক্তি’র গায়ে আঘাত করা মানে ঐ ব্যক্তিকে চরম অসম্মান করা। মানে সম্পর্কের গলা টিপে হত্যা করা।

তাই শুধু একাডেমিক শিক্ষায় নয়, সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠুন। আর এসব বদ অভ্যাস ত্যাগ করুন। কেননা কারো গায়ে হাত তোলায় বীরত্ব নাই- এটা স্রেফ একটা বদ অভ্যাস। যা পরিত্যাজ্য। আর ধর্মের কোথাও নাই যে স্বামীর হাতে মার খাওয়া নারীর শরীরের অংশ বেহেশতে যাবে। এসব কুপ্রচার হতেও বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়।

শেয়ার করুন:
  • 7.6K
  •  
  •  
  •  
  •  
    7.6K
    Shares

লেখাটি ৫,৯৭৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.