নবজন্ম

0

ফাহমিদা খানম:

“তানিশা তোমার আপু কি তোমাদের ওখানে গেছে?”
“কই নাতো, আমাদের এখানে এলে অবশ্যই জানতেন, কেনো কী হয়েছে?”
“আরে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, মোবাইল পর্যন্ত বাসায় রেখে গেছে!”
“দুলাভাই দুজনে ঝগড়া করেছিলেন নাকি ?”
“আরে ধুর আমি কি ঝগড়া করার মানুষ নাকি? একটা কাগজে লিখে গেছে সংসারে ইস্তফা দিয়ে আমি চলে গেলাম”
“ তাহলে তো জানিয়েই গেছে দেখছি”
“আরে কোথায় গেলো, সাথে টাকা –পয়সা কিছু আছে কী নেই কে জানে! বিপদে পড়লে কী হবে বুঝেছো?”
“এই বয়সে কারো সাথে ভেগে যাবার সম্ভবনা আছে নাকি দুলাভাই?”
“ধুর তোমাদের দুই বোনের স্বভাবে একদমই মিল নেই, তোমাকে এতোবড় একটা সিরিয়াস ব্যাপার বলার পরেও তুমি এটা নিয়ে ফান করছো! আজিব মেয়েমানুষ বটে তুমি?”
“আচ্ছা আপুর কাছে হয়তো সংসারের বেঁচে যাওয়া টাকা রয়ে গেছে সেটা নিয়েই বেরিয়েছে, দেখবেন চলে আসবে”
“আরে সংসারের সব টাকা আমার কাছেই থাকে, ও টাকা পাবে কোথায়?”
“বাহ আপনার সংসারে বুয়ার, মালির, ড্রাইভারের বেতন ছিলো আর বউটা বিনা বেতনেই এতোটি বছর কাটিয়ে দিলো?”
“কী আবোলতাবোল বকছো? আমি সব নিজের হাতেই রাখি আর যার যা লাগে আমাকে বলে, আমি কিনে আনি”
“কখনো-সখনো কি বউয়ের হাতে টাকা দিয়ে বলেছেন এ টাকাটা রাখো তুমি তোমার পছন্দমতো খরচ করো?”
“আরে যা লাগে আমি তো কিনে দেই, আলাদা করে আর টাকা দেবার কি আছে?”
“ধরেন ওর ইচ্ছে হলো ভাই-বোনের জন্যে কিছু কিনে দিতে অথবা ওদের বাচ্চাদের, অথবা নিজের পছন্দমতো কিছু কিনতে – সেজন্যে দিয়েছেন কিছু?”
“আরে এসব কথা এখন কেনো উঠছে? ৩৫ বছর সংসার করার পরে এসব কথা কেনো উঠছে বুঝতে পারছি না”
“বিনা বেতনে পুরো সংসারের রাঁধুনি, নার্স সবই ছিলো আপুটা!”
“আমি যা করেছি সংসারের ভালোর জন্যেই করেছি, আমি কি নেশায় টাকা উড়িয়েছি নাকি বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরে নষ্ট করেছি বলো?”
“বিয়ের পর থেকে আপনার বন্ধু-বান্ধব, আড্ডা, গেট- টুগেদার কোনটাই কি কখনো বন্ধ ছিলো দুলাভাই? একবার চিন্তা করেন বিয়ের পর আপু সেই যে সংসারে ঢুকেছে তার আর অন্য কোনো জগত ছিলো না, এক সংসারের ঘানিই টেনে গেছে এতোটি বছর! কয়বার এসেছে বাপের বাড়ি? মায়ের মৃত্যুর পরেও এক সপ্তাহের বেশি থাকতে পারেনি –আপনি সংসারের কথা বলে ওকে নিয়ে গেছেন!”
“বাহ সংসারে তখন মা-বাবা, ভাই-বোন সবাই ছিলো —ও বড়ো বৌ, দায়িত্ব ফেলে বাপের বাড়িতে পড়ে থাকলে চলবে নাকি?”
“যাদের জন্যে এতো করেছে, তারা কি কয়েকটা দিন সংসার সামলাতে পারতো না? আর বিয়ের পর দাদাভাইয়ের সাথে আপনার সামান্য মনোমালিন্য হয়েছে বলে আপনি নিজেও আসতে চাইতেন না, আপুকেও বাঁধা দিতেন, অথচ দাদাভাইয়ের সবচেয়ে আদরের নাতনী ছিলো বড়ো আপু, বুঝেছেন কখনো ওর কষ্ট! সারাজীবন কেবল নিজের ইচ্ছাটাই চাপিয়ে গেছেন!”

দুলাভাই খুট করে ফোন কেটে দিলেন — সত্যি কথা খুব তিতা হয় তাই সহ্য হয়নি হয়তো।
ছুটি নিয়ে পরদিন চিটাগাং থেকে ঢাকায় এলাম আপুর বাসায় – সত্যি কি আপুর বাসা? যতবার আগে বেড়াতে এসেছি আপুকে নিয়ে সবার অভিযোগের পাহাড় শুনে শুনে আমরা আসতেই ভয় পেতাম। সবসময় মনে হতো নিজের বাসায় ও পরবাসী ছিলো!

“খালামনি তোমার কী মনে হয় আম্মু কোথায় যেতে পারে?”
“আমি জানি না আপু কোথায় গেছে, আমাকে বলে যাবার মতো ভুল ও করবে নাহ”
“পুলিশে জানানো দরকার রাইয়ান, কিন্তু তাতে আবার মান-সম্মানের ব্যাপার জড়িত, উফ কী ঝামেলায় যে পড়েছি? এই বয়সে তোমার বোনের কারণে লজ্জায় মাথা হেঁট হচ্ছে আমাদের”
“আপনি নিজের সম্মানের কথাটাই ভাবছেন শুধু, আপুর জন্যে টেনশন করছেন কি?”
“আরে মান-সম্মানের তুমি কী বুঝবে? প্রেম করে বিয়ে করে পাঁচ বছরও সংসার করতে পারলে না!”

অপমান গায়ে মাখলাম না কারণ কথা সত্যি, পুরো দুনিয়াই যখন আংগুল তুলে আমার দিকে –ভগ্নিপতি আর বাদ যাবে কেনো?
“দুলাভাই আপু কি রেগুলার মেডিসিন খেতো? ডাক্তারের টাচে ছিলো? যতটুকু জানি তার অনেক সমস্যাই ছিলো”
“ইয়ে মানে আমি তো ব্যস্ত থাকি, আমি আসলে সঠিক জানি না, এক বছরের বেশিই হবে ডাক্তারের কাছে যাওয়া হয়নি, আর এতো সমস্যা ছিলো ওর, বিপি, ডায়াবেটিস, মানসিক সমস্যা সবই ছিলো”
“তাতে কি সংসারের কোনো কাজে ব্যাঘাত পড়েছিলো দুলাভাই? আপনাদের খাবার দাবার কয়বেলা বন্ধ ছিলো তাতে?”
“আরে মানসিক রোগ কি কোনো রোগ নাকি? আজাইরা অবসর থাকলে এসব হয়, রাতে ঘুম হয় না, অস্থির লাগে, একা থাকলে বিভিন্ন শব্দ শুনতে পায় – এসব কি কোনো রোগ নাকি?”
“রাইয়ান, তুমি আর বউমাও কি সময় পাওনি মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে?
“না মানে ছুটির দিনে এদিক সেদিক বের হই তো, আর সময় হয়ে উঠে না”
“তোমরা দুজনেই স্টুডেন্ট অবস্থায় যখন পালিয়ে বিয়ে করলে কেউই তোমাদের মেনে নেয়নি – মনে পড়ে? তোমার মা বাসায় আশ্রয় দিয়েছিলো বলে অনেক কথাই তাকে হজম করতে হয়েছে উঠতে বসতে। আজ যার জন্য দুজনেই প্রতিষ্ঠিত হলে তার অবদানকেই ভুলে গেলে? তোমাদের বাচ্চাটা পর্যন্ত আপু বড়ো করেছে!”
“আমরা কেউ সেটা অস্কীকার করি না, আমি সবসময়ই বলি আমার শ্বাশুড়ির জন্যেই আমি এতোদূর পর্যন্ত এসেছি”
“কিছু মনে করো না বউমা, সবাইকে ঢোল পিটিয়ে বলার মাঝে কী আছে? তুমি তো একজন মেয়েমানুষ – মেনোপজ পরবর্তী সমস্যাগুলো কিছুটা হলেও কি তোমার বোঝা উচিত ছিলো না? দুই ছেলে বড়ো হয়ে গেছে – সে খুব একা বোধ করতো – সারাদিনে কতোটুকু সময় তোমরা তাকে দিতে? প্রত্যেকেই নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছো অথচ সে যখন সিক সেটাকেই উপেক্ষা করে গেছো! আজ কীসের জন্যে এই মায়াকান্না বলতে পারো?”
“মাকে কি আমরা ভালবাসতাম না খালামনি?”
“ভালবাসার অর্থ কি বিশেষ দিনে শাড়ি কিনে দেওয়া? কখনো মায়ের কাছে বসে জানতে চেয়েছো সে কী চায়? তার কোনো অপূর্ণ ইচ্ছে আছে নাকি? দুইজন ছুটিছাটায় বাচ্চাকে তার কাছে রেখে ঘুরতে বেরিয়েছো, একবারও মনে হয়নি মায়ের ইচ্ছে হয় কিনা জিজ্ঞেস করি? মা মানেই কি শুধু নিজেকে সবটুকু উজাড় করেই দেওয়া? শেষ কবে তোমাদের মা ঘুরতে বা নিজের পছন্দে কোথাও গিয়েছে মনে করে বলতে পারবে?”
“মা নিজ থেকে তো কিছুই বলতো না, তবে অনেকদিন হয়েছে মা খুব চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন, সবসময় বিষন্ন থাকতো”
“তবুও তোমরা সেটাকেও স্বাভাবিক ধরে নিয়েছো, তাই না? একটু যদি খেয়াল করতে তাহলে হয়তো এইদিন আসতো না”
“এসব ফালতু কথা বাদ থাকুক, আগে বলো কী করলে তোমার বোনকে খুঁজে পাওয়া যাবে? পরিবারের মান-সম্মানের ব্যাপার! তোমাদের সব রিলেটিভদের বাড়িতে খবর নাও প্লিজ!”
“বিয়ের পর আপুর নিজের বলতে কেউই ছিলো না, বিয়ের পর রেওয়াজের ভুল ধরে ওকে আপনারা কখনো কারও বাসায় আসতে দেননি, ভুলে গেছেন হয়তো!”
“তুমি ইচ্ছে করেই পুরানো কাঁসুন্দি বারবার কেনো টেনে নিয়ে আসছো? আমি সবাইকে চিনি না, তুমি তো খবর নিতে পারো অন্তত”
“যে নিজ থেকে ইচ্ছে করে হারিয়ে যায় তাকে খুঁজে কী লাভ? দোয়া করি সে যেখানেই থাকুক –ভালো থাকুক”
“কীসব বলছো? পরিবারের মান –সম্মানের কথা কেনো ভাবছো না? ছোট ছেলেটার এনগেজমেন্ট হইছে, বিয়ের বাকি এখনও, কীভাবে মুখ দেখাবো?”
“আপু সংসারের সব দায়িত্ব সেরেই বেরিয়েছে, বিয়ের পর আমার শ্বশুরবাড়ি যখন আমার বেতনের পুরো টাকা নিতে চাইতো আর আমার স্বামীও তাদের পক্ষেই ছিলো, চিন্তা করেন যে মা-বাবা আমাকে এতো বড়ো করেছে তাদের নাকি আমি হেল্প করতে পারবো না — যে স্বামী তার স্ত্রীর পাশে দাঁড়ায় না সেই সাজানো সংসার ভেংগে আমি চলে এসেছি, আর আমার আপুটা ৩৫ বছর নরক যন্ত্রণা ভোগ করে সংসার করে গেছে”
“মাকে কি আমরা ভালোবাসিনি খালামনি?”
“হ্যাঁ বেসেছো, মা বলে যতটুকু না করলেই নয় সেটুকু, ব্যক্তি মাকে বোঝার চেষ্টা করেছো কি? ঈদে শাড়ি কিনে দিলেই তাকে ভালবাসা বলে না? তোমার বিয়ের পর আপু তার সমস্ত গহনা খুলে বউ বরণ করেছিলো — তাকে কখনো শখ করে কিছু বানিয়ে দিয়েছো? গত কয়েক বছর ধরেই বলেই যাচ্ছো, সে কেমন যেনো হয়ে যাচ্ছে, অথচ মেনোপোজ পরবর্তী সময়ে তোমাদের সামান্য সহযোগিতা তাকে ভালো রাখতে পারতো, সে কঠিন ডিপ্রেশনে ছিলো তবুও ডাক্তারের রেগুলার টাচে রাখার কথা কারোই মনে হয়নি, একবার ভাবো কতোটা অভিমান তাকে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে?”

“তানিশা এভাবে ভাবলে কেউই সংসার করতে পারবে না, সব সংসারে এমন একটু আধটু হয়ই, মানিয়ে চলাই জীবন”
“জ্বী, আপনি এখন থেকে মানিয়ে চলবেন সবকিছু, যৌবনে পরিবারের কথা শুনে স্ত্রীর পাশে কখনো দাঁড়ানো দূরে থাক, সংসারের সুরে তাল মিলিয়ে নিজের বউকে বুঝেননি, ছোটখাটো ভুলগুলোকে বড়ো করে দেখে তাকে সবকিছুতে গন্ডিতে বেঁধে দিয়েছেন। এক তরফা কিছু হলে মানুষের মন এক সময় বিষিয়ে উঠে সে পালিয়ে বাঁচতে চায়, বিকল্প পথ খুঁজে নেয় নিজের স্বার্থেই মনে রাখবেন!”

“খালামনি আপনি চলে যাবেন? এতোদূর থেকে এসেছেন, একদিন অন্তত থাকেন”
“কীসের অধিকারে থাকবো? বিয়ের পর থেকে যতবার এসেছি আপুর গুণাগুণ শুনেছি, মা হয়েছে, শ্বাশুড়ি হয়েছে, তবুও তার দোষের কমতি ছিলো না এ সংসারে — তখনই আপন মনে হয়নি আর আজ সে ইস্তফা দিয়েই চলে গেছে!”
“বৃদ্ধাশ্রমে খুঁজলে কেমন হয় তানিশা?”
“দুলাভাই, কেনো ওকে খুঁজবেন? আপনি চাকুরী শেষে অবসর জীবন কাটাচ্ছেন, আপু যে সেই সংসার করতে ঢুকেছিল সে কি আর ছুটি পাইছে, না অবসর পাইছে? এখন যদি নিজের মতো করে কোথাও একাকি মাথা উঁচু করে বাকি জীবন কাটায় —সমস্যা কী? জোর করে তো আর আপনারা পাঠিয়ে দেননি তাই না? অভিমানী বাকি জীবনটা যেখানেই থাকুক, ভালো থাকুক – এই দোয়াই করেন”
“বাচ্চাসুলভ চিন্তা বাদ দাও, তানিশা”
“আপুর নবজন্মকে আমি স্যালুট দেই, সংসারে কম দামী স্ত্রী আর মা হয়ে এতোকাল কাটিয়ে দিলো –এবার যে কয়দিন বাঁচবে – নিজের জন্যেই না হয় বাঁচুক! ”

১৪/৬/১৯

শেয়ার করুন:
  • 353
  •  
  •  
  •  
  •  
    353
    Shares

লেখাটি ১,২৭০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.