শব্দ পুনরুদ্ধারকরণ ও স্লাটওয়াক আন্দোলনের ইতিহাস

0

সুমিত রায়:

যুক্তিবাদী সত্যান্বেষী বাস্তবিক গ্রুপে পাশ্চাত্যে নারীবাদীদের “স্লাট” (“বেশ্যা”) শব্দটির পুনরুদ্ধারকরণ আন্দোলন ও স্লাটওয়াক সম্পর্কে বলছিলেন। ভাবলাম তৃতীয় তরঙ্গ নারীবাদের এই আন্দোলনের ইতিহাস ও তাৎপর্য নিয়ে লেখালিখি ও আলোচনার প্রয়োজন আছে।

ইংরেজিভাষীগণ স্পিনস্টার (spinster), বিচ (bitch), হোর (whore) এবং কান্ট (cunt) শব্দগুলোকে নারীদেরকে অপমানজনক বা মর্যাদাহানিকর সম্বোধনে ব্যবহার করেন। লেখক ইনগা মুসিও ( Inga Muscio) লেখেন, “আমি ঘোষণা করছি যে, এখন আমরা সেই সব শব্দকে পুনরুদ্ধার করব যা আমাদের থেকে অতীতে কেড়ে নেয়া হয়েছিল, যার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষ নারীদেরকে তাদের স্বাধীনতা, সন্তান, ঐতিহ্য, গৌরব ও সম্পত্তির মাধ্যমে মূল্য দিতে হয়েছিল”।

(চিত্র: ৩রা এপ্রিল, ২০১১-তে কানাডার টরন্টোতে প্রথম স্লাটওয়াক আন্দোলন)

বিচ (bitch) শব্দটিকে পুনরুদ্ধার করার আন্দোলনটি বেগ পায় ১৯৯৪ সালের অল-উইমেন ব্যান্ড ফিফথ কলামের গান “অল উইমেন আর বিচেস” ও এরপর ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত এলিজাবেথ উর্জেল (Elizabeth Wurtzel) এর বই “বিচ: ইন প্রেইজ অব ডিফিকাল্ট উইমেন” এর মধ্য দিয়ে।

উর্জেল তার দর্শনকে এভাবে ব্যক্ত করেন, “আমি চিৎকার করতে চাই, ইঞ্জিন চালু করতে চাই, যখন আমার ইচ্ছা হয়, ব্লুমিংডেলসে আমার দুর্বার ক্রোধ নিক্ষেপ করতে চাই যদি আমার ইচ্ছা হয়, আমার ইচ্ছা হলে একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তিকে বলতে চাই আমার জীবনের খুটিনাটিগুলো। আমি তাই করতে চাই যা আমার ইচ্ছা হয়, তাই হতে চাই যা আমার ইচ্ছা হয়, আর কেবল নিজের কাছেই দিতে চাই সব কৈফিয়ত। আর এটাই সোজাসাপ্টা বিচ ফিলোসফি।”

যাই হোক, পরবর্তীতে এই দর্শনেরই বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায় স্লাটওয়াক এর মাধ্যমে। স্লাটওয়াক (SlutWalk) এর সূচনার মধ্য দিয়ে ২০১১ সাল থেকে, তৃতীয় তরঙ্গ নারীবাদীদের বা থার্ড ওয়েভ ফেমিনিস্টদের কাছে পুনরুদ্ধার কৌশলের কার্যকারিতা একটি হট টপিকে পরিণত হয়।

লেখক: সুমিত রায়

প্রথম স্লাটওয়াক শুরু হয় টরন্টোতে ২০১১ সালের ৩ এপ্রিলে টরন্টোর একজন পুলিস কনস্টেবল মাইকেল সানগুইনেত্তির (Michael Sanguinetti) বিবৃতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে। তার বিবৃতি ছিল, “পুরুষের শিকার হওয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য নারীদেরকে স্লাটদের (বেশ্যাদের) মত পোশাক পরা থেকে বিরত থাকা উচিৎ।”

এরপরই স্লাটওয়াক আন্দোলন খুব দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন দেশে নারীরা এই “স্লাট” শব্দটিকে পুনরুদ্ধার করার জন্য স্লাটওয়াক আন্দোলনের অংশ হিসেবে কুচকাওয়াজ করেন। এক্ষেত্রে তাদের অবস্থান ছিল এরকম – যদি ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীরা স্লাট হয়, তাহলে সকল নারীই স্লাট, কারণ যেকোন নারী যেকোন পোশাক পরিহিত অবস্থাতেই ধর্ষণের শিকার হতে পারে।

“স্লাট” ব্যানার নিয়ে কুচকাওয়াজের মাধ্যমে আন্দোলনকারীগণ নারীর শরীর সম্পর্কে সামাজিক ভাবমূর্তির পরিবর্তন এবং নারীর নিজেদের যৌনতার সম্ভাবনাময়তাকে নিয়ে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য এই শব্দটির ক্ষেত্রে এরূপ অবস্থান গ্রহণ করেন। এই আন্দোলনটি নারীদেরকে নিজেদের যৌনতার অধিকার অর্জনের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন করতে চায়। এখানে বলা হয়, যদি আপনি “স্লাট” হতে চান, তাহলে “স্লাট” হন। আর একই সাথে ভিক্টিম ব্লেইমিং বা ভুক্তভোগীর উপরেই দোষ চাপানোর জন্য এই আন্দোলনে সেই পুলিস কনস্টেবল সানগুইনেত্তির তীব্র সমালোচনা করা হয়।

আন্তর্জাতিকভাবে ৬০টি শহরে স্লাটওয়াক কার্যক্রম চলে, যার মধ্যে নিউইয়র্ক সিটি, বারলিন, সিয়াটল, ওয়েস্ট হলিউড এবং লন্ডন উল্লেখযোগ্য। স্লাটওয়াকের এই “স্লাট” শব্দটির পুনরুদ্ধার আন্দোলনকে তৃতীয় তরঙ্গ নারীবাদী ব্লগারদের অনেকে প্রশংসা করেন, আবার অনেকে সমালোচনা করেন। সমালোচনার কারণ ছিল, “স্লাট” শব্দটি কিছু সাংস্কৃতিক দলের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।

যাই হোক, পাশ্চাত্যে তৃতীয় তরঙ্গ নারীবাদের এই ওয়ার্ড রিক্লেমেশনের আন্দোলনকে আপনারা আমাদের সমাজে কতটা কার্যকরি বলে মনে করেন তা নিয়ে আলোচনা হোক…।

শেয়ার করুন:
  • 83
  •  
  •  
  •  
  •  
    83
    Shares

লেখাটি ১৯১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.