“স্বয়ম্বরা”- নারী জীবনের এক অমোচনীয় কলঙ্ক

0

লতিফা আকতার:

জীবনসঙ্গী নির্বাচনে নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া মানুষগুলোকে কীভাবে নেয় এ সমাজ? আর সে নেওয়ায় নারী- পুরুষের ক্ষেত্রে বিপরীত চিত্র সমাজের এক নিত্যরুপ।

বিয়ে দুইজন নারী পুরুষের যৌথভাবে বসবাস শুরু করার এক প্রক্রিয়া। যে প্রক্রিয়ায় উভয় উভয়ের সাথে অনেক কিছু ভাগাভাগি করে। যা সাধারণত আর পাঁচটা সম্পর্কে করতে হয় না। একান্ত নিবিড় একটি সম্পর্কের, প্রতিশ্রুতির- পরিণত দিক হচ্ছে বিয়ে।

লতিফা আকতার

অতি প্রাচীনকাল থেকে পরিবার নামক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সর্বস্বীকৃত একটি প্রক্রিয়া। প্রাচ্য হতে পাশ্চাত্যের সব জায়গায় সমানভাবে তার গ্রহণযোগ্যতা। আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রক্রিয়ায় না গিয়ে নারী পুরুষের একসাথে বসবাস বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন নামে ভূষিত করা হলেও সর্বজন স্বীকৃতি পায়নি। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী দুইজন মানুষের যৌথ জীবন যাপন শুরু করার ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। হোক সে সেলিব্রিটি কিংবা সাধারণ কেউ। কোন এক ধর্মের আলোকে তাঁকে বিয়েতে আবদ্ধ হতেই হয়।

বিয়ে যদিও বা দুজন ব্যক্তির সম্পর্ক গঠনের প্রক্রিয়া। কিন্তু তা সেই ব্যক্তির জীবনসঙ্গী নির্বাচনে ঐ ব্যক্তির নিজের মতের চেয়ে অন্যের মতামত বেশি গুরুত্ব পায়। অধিকাংশ সময়ই পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ লোকজন এই বিষয়ে পাত্র/পাত্রী নির্বাচনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। যদিও যুগে যুগে এর ব্যতিক্রম ছিলো, আছে। আর ব্যতিক্রম একটি নাম – স্বয়ম্বর/স্বয়ম্বরা।

ব্যতিক্রম সবকিছুতেই এ সমাজের অ্যালার্জি। এক্ষেত্রে আরও বেশি। আর সেটা বেশি ভোগ করতে হয় স্বয়ম্বরা নারীকে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কারণে হোক কিংবা সোনার চামচ হিসাবে বিবেচিত হওয়ার কারণে হোক, অধিকাংশ সময়ই পুরুষটি পার পেয়ে যায়। তাছাড়া লাশের খাট বহন করা অথবা মুখাগ্নি তো ছেলে সন্তান ছাড়া হয় না। মৃত্যু পরবর্তী জীবনে নরকের ভয় কাজ করার কারণে পুত্রটির জীবন আর যাইহোক ধরাধামে নরক হয়ে উঠে না।

মৃত্যু পরবর্তী জীবনে নরকের ভয় থাকলেও অন্যের জীবন নরক করে তোলার সময় মানুষ আবার নিজের মতামত, নিজের অহমকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। ধর্মকে নয়। বিভিন্ন ধর্মে বিভিন্ন মতামত। তবে জীবনযাপন পদ্ধতির সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম বিষয় উঠে এসেছে ইসলাম ধর্মে। এই ধর্মে জীবন যাপনের প্রতিটি ধাপ বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বিয়ে নামক বিষয়ে নারী-পুরুষের পছন্দ অপছন্দকে প্রচণ্ডভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- উভয় উভয়কে পছন্দ না করলে সেখানে বিয়ে দেয়া যাবে না। এমনকি যে নারী উত্তম পর্দা করে, কারো সামনে মুখ প্রদর্শন করে না তাঁরও পাত্র দেখার ক্ষেত্রে পর্দার শিথিলতার কথা বলা হয়েছে। জোরজবরদস্তি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এই শিথিলতার মানে অধিকাংশ মানুষ বোঝে না। ধর্ম বোঝে, মানে, কিন্তু এই একটা ক্ষেত্রে প্রয়োগে নিজস্ব মতামত আর অহমকে বেশি পাত্তা দেয়। আর এই পাত্তা না-পাত্তার ঝামেলায় নারী জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে।

স্বয়ম্বরা নারীর জীবন শাঁখের করাতের মতো। উভয়দিকে কাটে। কেউ কেউ তো পিতৃকুল হতে পরিত্যক্ত হয়। আর শ্বশুরবাড়ি নামক জায়গায়ও তাকে স্বাগতম জানানো হয় না। সবসময়ই নিচু হিসেবে দেখা হয়। কেননা লজ্জাহীন নারীই নিজের বর নিজে খুঁজতে পারে। বিয়ের বাজারে অচল নারী তাদের পরিবারের ছেলেটিকে ফাঁসিয়েছে বলে ভাবে অনেকে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে যতো রকম অপমান করা যায়, মানসিকভাবে সব সময়ই হালকা চাপে রাখার চেষ্টা থাকে সবার। আর শিক্ষিতের লেবাসে আবৃত পরিবারের সদস্যরা সরাসরি অপমান না করলেও প্রেম করে বিয়ে করা বউকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে।

আর বাকি জীবনে এই দৃষ্টিভঙ্গি’র খুব একটা পরিবর্তন হয় না। সেটা অপরিবর্তিত থাকে শ্বশুরকুলে ভালোবাসা প্রাপ্তিতে। পিতৃকুলের ভালোবাসা, সম্পত্তি বন্টনে, আদর আপ্যায়নে। যা পরবর্তীতে সন্তানের নতুন জীবন যাপন শুরু পর্যন্তও বহাল থাকে। ক্ষেত্র বিশেষে আমৃত্যু। যদিও কন্যার সুখের কারণে মেয়ের পরিবার যতো সহজে ভুলে, ছেলের পরিবার ততো সহজে নয়। আর সুযোগ পেলেই সমাজের বিভিন্ন সম্পর্কে সম্পর্কিত ব্যক্তিরাও তাঁকে মনে করিয়ে দেয় যে সে স্বয়ম্বরা। এটা তাঁর কলঙ্ক।

উপমহাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজের শিক্ষিত লোকজন সবদিকে হাত পা ছড়িয়ে রাখে। ধর্মের লাইনে খানিকটা। খানিকটা ভালোবাসা নামক দিকে। আর খানিকটা আমিত্বে। ভালোবাসা নিয়ে গর্ব করা এসব মানুষগুলোর সত্যিকারের রূপ চোখে পড়ে সন্তানের সঙ্গী নির্বাচনের সময়। কঠিন হলেও সত্য যে প্রচুর টাকা পয়সা খরচ করে যাকে বড় করা হয়- তাঁর এহেন কর্ম বেশিরভাগ মানুষই মেনে নিতে পারে না।

মেনে নিতে পারা আর না পারা ব্যক্তির নিজস্ব বিষয়। হতেই পারে। কিন্তু জীবনসঙ্গী নির্বাচনও ব্যক্তির একান্তই নিজস্ব। জোর জবরদস্তি করে, বস্তুগত জিনিসের দাঁড়িপাল্লায় পরিমাপ করে, মেকি মান সম্মানের অজুহাত দিয়ে ব্যক্তির এই নিজস্বতা কেড়ে নেওয়া আপনার ধর্মও সমর্থন করে না। ভালোবাসায় আবদ্ধ থাকার সময়ে তাঁদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে। সে বিষয়ে আপনার মতামত থাকতে পারে। কিন্তু ভালোবাসাকে গলা টিপে হত্যা করে দুইজন মানুষকে জীবন্মৃত করে রাখার অধিকার আপনার নাই।

ধর্ম মানলে বিষয়টি না বোঝার কিছু নাই। ভিন্নধর্মের লোককে যতো উচ্চস্বরে গালি দেয়া হয় ততো উচ্চস্বরে ভালোবাসার কথা বললে আপনার খুব একটা ক্ষতি হয় না। এই পৃথিবীও বিষাক্ত হয়ে ওঠে না। হয় মানবতার আলোকে বাঁচতে শিখুন, অথবা ধর্মের আলোকে। দিনশেষে কথা একই। কেননা কোনও ধর্মই তার সৃষ্টির সেরা জীবনকে বিষিয়ে তোলার মতো কোনো কথা বলেনি। আর না পারলে চুপ থাকুন। কেননা অযথা বলাবলিতে প্রচুর টাকা পয়সার অপচয়।

শেয়ার করুন:
  • 149
  •  
  •  
  •  
  •  
    149
    Shares

লেখাটি ৬৪৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.