হোয়াট ইজ বিউটি? (পর্ব-২)

0

বিকাশ ভৌমিক:

আমার গ্রামের বাড়ি বরেন্দ্র অঞ্চলে। বরেন্দ্র অঞ্চলের একটু বর্ণনা দিই। বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূমিরূপ সিঁড়ির মতো থাক থাক করে সাজানো এবং তীব্র খরা প্রবণ শক্ত মাটি। আপনি যদি বিস্তৃত বরেন্দ্রভূমির দিকে তাকিয়ে দেখেন, তবে মনে হবে যেনো বিশাল সবুজের ঢেউ খেলানো সোপান।
আমাদের গ্রামে হিন্দু মুসলিম সাঁওতাল ধাঙড়দের ছিল একত্র বসবাস। সাঁওতাল, ধাঙড়রা প্রচণ্ড সরল এবং নির্লোভ জীবনযাপন করে অভ্যস্ত। জীবনকে কীভাবে উপভোগ করা যায় তা ওদের কাছে দেখেছি।

একদম প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে থাকা যাকে বলে। ওদের পোশাকে চালচলনে ছিল অমায়িক সাধারণত্ব। পুরুষদের এক টুকরো ধুতি যা হাঁটুর উপরে উঠে থাকতো আর নারীদের ক্ষেত্রে শুধু ছোট একটি পুরানো পাতলা ফিনফিনে শাড়ি। শরীরের কোন অংশ বেরিয়ে আছে তা নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা ছিলো না। বরং মাথা ব্যথা ছিলো কাজ নিয়ে, পানি, খাদ্য যোগাড় নিয়ে। সকালে পান্তা ভাত কাঁচা মরিচ আর পিঁয়াজ দিয়ে খেয়ে সবাই বেরিয়ে পড়তো মাঠে। নারীপুরুষ একসাথে মাঠে কাজ করেছে।

পুকুরপাড়ে স্নান শেষে নিশ্চিন্তে খোলা আকাশের নিচে কাপড় বদল করেছে, কেউ বিরক্ত করার ছিলো না। সাবানের বদলে কী যেনো একটা মাটি গায়ে ডলে ময়লা তুলতো, চুলে শ্যাম্পুর বদলে ছিলো আলাদা আরেক প্রকার মাটি, কাপড় কাঁচা বলতে শুধু পানি দিয়েই ধোয়া। অর্থাৎ তারা পরিবেশ দূষণ করতো খুব কম। দিনের শেষে ভাটিখানায় যে যার মতো মহুয়া পান করে ঘুমিয়ে পড়তো। ওদের উৎসবগুলো ছিলো দেখার মতো, ঘরদোর সুন্দর করে মাটি দিয়ে ডিজাইন করে লেপা হতো। নারীরা একে অপরের ঘাড়ে হাত দিয়ে ধরে সারিবদ্ধ হয়ে গানের তালে তালে নাচতো। সে এক অপূর্ব দৃশ্য!

সাঁওতাল নারীদের দেখেছি আবলুষের মতো কালো, কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমার কাছে ওদেরকে লেগেছে ত্রিমাত্রিক সুন্দর। একজন পুরুষ যা পারে, সাঁওতাল নারীরা তার থেকেও বেশি পারে। তারা সুন্দর গায়ের রঙ দিয়ে নয়, তারা সুন্দর তাদের কাজে, তারা সুন্দর তাদের সরলতায়, তারা সুন্দর তাদের স্বকীয়তায়।

এই সংস্কৃতিই ছিলো আদি বাঙালি সংস্কৃতি। এখনকার ভাষায় যারা অসভ্য। আচ্ছা, সভ্য হয়ে আমরা কী পেয়েছি বলতে পারেন? প্রকৃতির সবকিছুই যে সুন্দর তা আপনি দেখেননি, বরং এই সভ্য সমাজ আপনাকে শিখিয়েছে আরো আরো সুন্দর মাংসপিণ্ড কীভাবে পেতে হবে।

হ্যাঁ সভ্যতা আমাদের এগিয়ে দিয়েছে অনেকখানি, জীবনকে করেছে সুখের, কিন্তু সভ্যতা বিষও ঢুকিয়ে দিয়েছে। সভ্যতার বিষবাষ্প আপনাকে শিখিয়েছে অতৃপ্তি নিয়ে বেঁচে থাকা। সভ্যতার বিষবাষ্প আপনাকে শিখিয়েছে নারী একটি মাংসপিণ্ড, তাকে শোকেসে সাজিয়ে, প্রিজারভেটিভ দিয়ে রেখে অল্প অল্প করে খেতে হবে, যার নাম পুরুষতান্ত্রিক সংসার। আবার এই মাংসপিণ্ডকে একসাথে মিলে ভুরিভোজও করা যাবে যার নাম গণধর্ষণ।

(চলবে)

শেয়ার করুন:
  • 86
  •  
  •  
  •  
  •  
    86
    Shares

লেখাটি ৩৯১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.