অহম, আত্ম অহংকার সম্পর্ক বিনষ্টের এক ঘূণপোকা

0

লতিফা আকতার:

অহম মানুষের এক সহজাত বিষয়। জন্ম নেওয়ার পর হতে বড় হওয়ার প্রক্রিয়ায় মানুষ শতো সহস্র জিনিস আয়ত্ত্ব করে। অহম তার মধ্যে অন্যতম। সেটা হতে পারে জন্মসূত্রে প্রাপ্ত কিংবা নিজ অর্জনে। আর এই প্রাপ্য বা অর্জনে গড়ে ওঠা অহমের প্রভাব পরে জীবনের অনেক ক্ষেত্রে। ব্যক্তি চেতন এবং অবচেতন মনে একে ধারণ করে।

সমাজের নানান পারিপারশ্বিক বিষয়, ব্যক্তিকে সুপিরিয়র ভাবতে শিখায়। এই ভাবনা ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব গঠনে বিশাল প্রভাব ফেলে। পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে উঠতে, তার শিকড় অনেক সময় ব্যক্তির অজান্তে অনেক গভীরে প্রোথিত হয়ে যায়। যা থেকে কেউ কেউ সারাজীবনেও বের হতে পারে না।

এই না পারার ব্যর্থতার ছাপ পড়ে তার ব্যক্তি জীবনের নানান সম্পর্কে। যদিও বা এর শুরু হয় জন্মলগ্ন হতে প্রাপ্ত মানুষগুলোর কাছ হতেই।

একটি শিশু জন্মের পর হতে তাঁর শারিরীক গঠনের বিশ্লেষণ দিয়ে এর শুরু। জন্মের পর পরই এই জাজমেন্টাল সমাজ শিশুর হাত, পা, চুল, ফর্সা, লম্বা নিয়ে বৈঠকে বসে যায়। একটি ফর্সা শিশু- সুন্দর। এই মনোভাব ঢুকিয়ে দেওয়া হয় জন্মের পর পর। না বুঝে একটি শিশু এই ভেবে মানুষ হয়ে ওঠে যে – সুন্দর মানেই ফর্সা। লম্বা না হওয়ার কারণে একটি বাচ্চা যতোটা ইনফিরিয়র হয়ে যায় ততোখানি অহংকার নিয়ে বড় হয় লম্বা শিশুটি। ধনী পরিবার হতে আসা শিশু’র ব্যক্তি হয়ে ওঠা ক্ষেত্র বিশেষে অন্যরকম। চুলের ঘনত্ব আর কম ঘনত্বের হিসাব করতে করতে হারিয়ে যায় ব্যক্তির অনেক কিছু।

এই অনেক কিছু’র প্রভাব পরে তার পরিণত বয়সে। সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে। একজন আত্ম অহংকারী মানুষের সবচাইতে বড় সমস্যা- সে অন্যকে কখনই নিজের সমান ভাবতে পারে না, সম্মান করতে পারে না। ব্যক্তি’র অহম তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে বিভিন্ন সময় ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে।

জন্মসূত্রে প্রাপ্ত অনেক কিছু ই ব্যক্তি কে অহংকারী করে তোলে। এটা আসলে ব্যক্তির পরিবেশ তাঁকে করতে বাধ্য করে। শিক্ষিত, ধনী, বংশ মর্যাদা, আমদানি খানদানি বিভিন্ন উপাদান। এই প্রকারভেদ একেকজনকে একেক রকম করে ভাবতে শিখায়। এই ভাবনা তাঁকে মানুষ হয়ে গড়ে ওঠায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করলেও, ভেতরে সুপ্ত হয়ে থাকা অহমবোধ মাঝে মাঝে উঁকি দেয়। কেউ কেউ এই বোধে রীতিমতো অন্ধ হয়ে যায়। আর তা পরবর্তীতে বিপর্যয়ে ফেলে পারস্পরিক সম্পর্ককে। সে সম্পর্ক হতে পারে বন্ধুত্ব, হতে পারে দাপ্তরিক সম্পর্ক। সবচাইতে বেশি সমস্যায় ফেলে জীবনসঙ্গীর ক্ষেত্রে।

পরিণত বয়সের দুজন মানুষ যখন একসাথে জীবন শুরু করে তখন তাঁদের মননের চাহিদায় দুজনকে সম ভাবার আকাংখা জাগায়। আর আকাংখায় যখন অহম মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে যায়, তখন স্বাভাবিক সুর কেটে কেটে যায়।

এই কেটে যাওয়া সুরের মূর্ছনা নারীকে বেশি শুনতে হয়। নারী যতোই এগিয়ে যাক না কেন, তাঁকে পুরুষের সমান্তরাল ভাবার মানসিকতা এখনও পুরষতন্ত্র গড়ে তুলতে পারেনি। বিবাহ নামক সম্পর্কে প্রথমেই নারীকে অসম ভাবার মানসিকতা- পুরুষের অহম। আর এই মানসিকতার কারণে প্রতিদিনকার জীবনে নানান রকমের ধাক্কা খেতে হয় নারীকে। শিক্ষা, চাকুরি, মননে নারী কখনোই পুরুষের সম হতে পারে না। আর হলেও তার স্বীকৃতি পায় না। সম হতে পারে না নারী তাঁর ঘরে, বাইরে, এমনকি কর্মস্থলে।

নারী কম বুঝবে, পুরুষকে মানবে- এটা এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চাহিদা। চাহিদা নয়- সমাজের অন্ধ অহম। আর এই চাহিদা পূরণে ব্যর্থ নারী বা এই তত্ত্বে বিশ্বাসী নয় এমন নারী, অনেক সময় হারিয়ে ফেলে জীবনের ছন্দ। অহম ব্যক্তিত্বের অংশ হলেও, অহংকার ব্যক্তিত্বের নেতিবাচক দিক। এই নেতিবাচক দিক প্রতিদিনকার জীবনে রাগে, দুঃখে, ভালোবাসায়, ঘৃণায় উপস্থিত হয়। যা অন্যকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে প্রেরণা যোগায়। এবং যৌথ জীবনে পুরুষের মধ্যেই এর উপস্থিতি বেশি।

শুধু পুরুষ কেন?? পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও কম ধারণ করে না। নিজেকে রাজার আসনে বসিয়ে ভাবতে শেখা মানুষগুলো বিভিন্ন সময় সেবা প্রাপ্তির চাহিদায় বাড়াবাড়ি করে ফেলে। তাই আজও নারী এগিয়ে গিয়েও পদে পদে পিছিয়ে পড়ে।

এখনও বিয়েতে উপহার নামে যৌতুক চলে, এখনও জামাই ষষ্ঠী’র দিন দশ ব্যঞ্জন, জৈষ্ঠিয়া নামে তত্ব, কোরবানির সময় বউয়ের বাড়ির খাসির ওজনের উপর বউয়ের প্রতি ভালোবাসার তীব্রতা নির্ভর করে। এখনো রমজানের ইফতার কম বেশি হওয়ার কারণে নারী নির্যাতনের শিকার হয়। এখনো কর্মজীবী নারী তাঁর আয়ের টাকা অসহায় পিতৃকুলে দিতে সংকোচে মরে যেতে বাধ্য হয়।

এখনো বউকে ভালবাসলে, বউয়ের কথাকে গুরুত্ব দিলে পুরুষকে ব্যক্তিত্বহীন মনে করা হয়। আর বউকে অবহেলা করে পুরুষ হয়ে ওঠা- অহমবোধের আদি এবং সর্ব স্বীকৃতি নেতিবাচক দিক। আর এই নেতিবাচক দিক পুরুষ যতোদিন ত্যাগ করতে না পারবে, ততোদিন সম্পর্কের ছন্দ কেটে কেটে যেতে থাকবে।

জীবনসঙ্গীকে মননে সমান্তরাল ভাবতে শিখুন। নারী সহকর্মী কে তার মেধা দিয়ে বিচার করতে শিখুন। মানুষ হয়ে আত্মসম্মানে বেঁচে থাকার অধিকার সকলের। আর অধিকার প্রদান করে জীবনকে স্বাভাবিক ছন্দে বাঁচার পথ করে দিন।

শেয়ার করুন:
  • 1.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.3K
    Shares

লেখাটি ১,৭৭৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.