নিজেদের ‘এঁটো’ ভাবার চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে মেয়েদের

0

শীলা চক্রবর্তী:

প্রেমে প্রতারিত হয়ে বা স্বামীর কাছে প্রতারিত হয়ে আইনি প্রতিকার চাইতে আসা প্রায় মেয়েদের‌ই একটা কমন ডায়লগ আছে দেখেছি: “দিদি ও আগে আমি ছাড়া কিছু জানতোই না, জানেন? আর এখন চা খাওয়া হয়ে গেছে – ভাঁড় ফেলে দিয়েছে, বুঝলেন তো কী বললাম? আর ফিরেও দেখে না”!

আমার পা থেকে মাথা অবধি দপ্ করে আগুন ধরে যায়। ইচ্ছে করে ঠাটিয়ে একটি চড় কষাই, মেয়েটি ছিটকে পড়ুক নিচে! দাঁত কিড়মিড় করে বলি – হ্যাঁ রে গর্দভ, বুঝেছি সব‌ই!

এগুলোর কোনোটাই করা হয়না তবে মেয়েটিকে থামিয়ে অতি অবশ্যই দিই। বলি – ওহে মেয়ে আগে তুমি নিজের মূল্য বুঝতে শেখো। নিজেকে অসম্মান করাটা বন্ধ করো! নিজেকে চায়ের ভাঁড়ের চেয়ে একটু উৎকৃষ্ট কিছু ভাবতে শেখো!

সস্তার থার্ডক্লাস সব বাংলা সিনেমায় বা ব‌ইপত্রে স্বামী বা প্রেমিকের সাথে শারীরিক সম্পর্ক হয়ে যাবার পর মেয়েদের চায়ের ভাঁড় / এঁটো শালপাতা ইত্যাদির সঙ্গে তুলনার প্রচুর প্রচুর উদাহরণ রয়েছে। ধর্ষিতা মেয়েটির ক্ষেত্রে তো বটেই!

সেই পোসেনজিতের কোন এক ছবিতে যেন ছিলো না, এঁটো ফুল না বাসিফুল কীয়েক্টা যেন …. দেবতার পুজোয় লাগেনা !! তো সেইসব দেখে দেখে বেড়ে ওঠা, ব্রেন‌ওয়াশড মেয়েগুলোর মনে এর বেশি আর কী ফিলিংস থাকবে? এরা নিজেদেরকে ব্যবহৃত, এঁটো, ডিসপোজেবল ছাড়া আর কিছু ভাবতেও শেখেনা অগত্যা! কী পরিকল্পিত মগজধোলাই – জনমভরের অসম্মান আর আত্মগ্লানি বয়ে নিয়ে বেড়ানোর জন্য!

যারা বিক্রি হয়ে যান, প্রতারিত হোন, অপছন্দের লোকের গলায় মালা দিতে রাজী হোন বাধ্য হয়ে, তাঁদের ভেতরের গ্লানি আমি বুঝি। কিন্তু তাই বলে নিজেকে একটা মাটির ভাঁড় বা এঁটো শালপাতা ভাবতে হবে কেনো? এতো তুচ্ছাতিতুচ্ছ ভাবতে হবে কেনো? ব্যবহৃত ভাবতে হবে কেনো? সেলফ এস্টিমেশান চূড়ান্ত তলানির পর্যায়ে না পৌঁছলে এইসব ধারণা আসতে পারে? আর আত্মবিশ্বাস ভেতর থেকে আসে, ওটা না থাকলে লড়াইটা কিসের ভিত্তিতে হবে?

হয় কিন্তু, ক্রমাগত ভোকাল টনিকে অনেকের‌ই খানিকটা আত্মবিশ্বাস ফেরে। ভাবতে থাকে তারা। আমার খুব প্রিয় মানুষ, বিখ্যাত মনোবিদ অনুত্তমা বন্দ্যােপাধ্যায়ের কয়েকটি লাইন মনে পড়ে, আমার‌ও খুব প্রিয় লাইনগুলো, আমিও ভাবি প্রতিটি মেয়ের মানসিকতা যেন এই ধাঁচেই গড়া হয়, নিজেদের যেন আগে চায়ের ভাঁড়ের বদলে গোটা মানুষ ভাবতে শেখে মেয়েরা …।

“গোপনে ছুঁয়েছো বলে আমার গোপনতম স্থান
তোমার অধিকৃত – এ তোমার ভুল অনুমান।
যতদূর চোখ যায়, স্পর্শ গেছে ঠিক ততোখানি,
করায়ত্ত নয় কারো, বাকিটা আমার রাজধানী”।

লেখকঃ আইনজীবী

শেয়ার করুন:
  • 1.9K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.9K
    Shares

লেখাটি ৩,৩৭৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.