ভার্জিনিয়াও যেখানে হার মেনে যায়…

0

শামীম রুনা:

“The hours” ২০০২ সালের সিনেমা। একই নামের উপন্যাসের উপর বেইজ করে বানানো। ভার্জিনিয়া উলফের ‘মিসেস ডালাওয়ে’ লেখার সময় এবং পরবর্তী জেনারেশনের উপর মিসেস ডালাওয়ে’র প্রভাব এই উপন্যাসের মূল বিষয়। পৃথক তিনটি সময় – ১৯২৩ সাল- সাসেক্স, ১৯৫১ সাল- লস এঞ্জেলস আর ২০০১ সাল – নিউইয়র্ক। ভিন্ন ভিন্ন তিন নারীকে নিয়ে কাহিনী।

এই নারীদের আপাতদৃষ্টিতে সবকিছু থেকেও যেন তাদের কিছুই ছিলো না, তারা জীবনের আরও মনিংফুল অর্থ খুঁজছিলো। এই তিন নারী হলো, লেখক ভার্জিনিয়া উলফ, তার বইয়ের রিডার লরা আর ক্লারিসা, যাকে বন্ধু ডাকে উলফের সৃষ্ট উপন্যাস মিসেস ডালাওয়ের নামে। সে বন্ধু বা প্রাক্তন স্বামীর পুরস্কার প্রাপ্তি উপলক্ষে একটি পার্টির আয়োজনে সেদিন সকাল থেকে ব্যস্ত। ১৯২৩ থেকে ২০০১ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে তিনটি সময়, তিন নারী, তিনটি স্থান, তিনটি আত্মহত্যা প্রচেষ্টা দুইটি সফল-একটি বই’য়ের মাধ্যমে তাদের মধ্যে অলিখিত যোগাযোগ।

কয়েকবার দেখা সিনেমাটি নতুন করে যত আবার দেখি বারবার একজন নারী হিসাবে চাওয়া-পাওয়া-আশাগুলোর অপূর্ণতা আর একবার অন্তরচোখে খোঁচা দিয়ে যায়। চাইলেই নারী নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী কোথাও বাস করতে পারে না। চাইলে নারী যাকে পছন্দ ভালোবাসতে পারে না। নিজের এই চাওয়ার পূরণ করতে হলে তাকে খুব বেশি মূল্য দিতে হয়।

ভার্জিনিয়া উলফ মিসেস ডালাওয়ের মতো স্বাধীনচেতা নারী চরিত্র সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু ব্যক্তি ভার্জিনিয়ার কেনো স্বাধীনতা নেই। সে সংসারের কর্ত্রী হয়েও অনাহূত অতিথির মতোন। তার স্বামী স্ত্রীর প্রতি কেয়ারিং এবং দু’জনার ভালোবাসার সম্পর্ক। মিসেস উলফের পছন্দ লন্ডন, সাসেক্স নয়, তারপরও তাকে স্বামীর সঙ্গে থাকতে হয় সেখানে। সাসেক্স থেকে পালাতে চেয়েও ব্যর্থ ভার্জিনিয়া শেষে কয়েকবারের চেষ্টায় একদিন জীবন থেকে চলে যায়।

১৯৫১ সাল লস এঞ্জেলস, লরা, মিসেস ডালাওয়ে’র পাঠক। কেয়ারিং হাজব্যান্ড, ছোট একটি ছেলে, আর পেটের অনাগত সন্তান জন্মদানের অপেক্ষা নিয়ে আপাতত তার সুখের সংসার। কিন্তু চাইলে তো সুখী হওয়া যায় না, সব সুখের ভেতর একটা অসুখ ঘাপটি মেরে বসে থাকে। লরা সে অসুখ থেকে মুক্তি চেয়ে আত্মহত্যা করতে যায়, কিন্তু তার নিজের ভেতর বাড়তে থাকা সন্তানের কারণে আত্মহত্যা না করে সংসারের মঞ্চে আবার অভিনয়ে ফেরত এলেও সে সারা জীবন এই সে অভিনয় চালিয়ে যেতে চায় না। পরবর্তীতে একটি কন্যা সন্তান জন্ম দিয়ে লরা সংসার থেকে অব্যহতি নেয়, সবকিছু পেছনে ফেলে সে নিজের মুক্তি বা স্বাধীনতার জন্য, নিজের মতো করে বাঁচার জন্য চলে যায়।

লরার এই চলে যাওয়ার জন্য সবাই তাকেই দায়ী করে। তার সন্তান সারা জীবন মায়ের চলে যাওয়াকে অবহেলা আর অবজ্ঞা ভেবে মানুসিক যন্ত্রণা ভোগ করেছে। ক্লারিসার কন্যা তাকে “ডাইনী” ইংগিত করে। তারপরও লরা দৃঢ় কণ্ঠে যখন বলে, আমি অনুতপ্ত নই, তখন একজন নারীর ভেতরের মুক্তির আকাঙ্খার তীব্রতা অনুধাবন করা যায়। সাজানো গোছানো সংসার থেকে এই যে হুট করে চলে যাওয়া, চিরকালীন গেঁথে দেয়া ধারণা, সবকিছুর উপরে সন্তানের জন্য মায়ের মায়া, এসব পেছনে থুয়ে রেখে চলে যাওয়া- এটা স্বাধীনতা নাকি সংসারের প্রতি বৈরাগ্য? হয়তোবা একটামাত্র জীবন শুধু সংসার করবার জন্য সবাই জন্মায় না।

শামীম রুনা

২০০১ সাল, ক্লারিসা বাস করে নিউইয়র্কে। সে একজন পাবলিশার। সে এক সময় ডেট করেছিলো রিচার্ডের সঙ্গে, রিচার্ড কবি এবং তার বইয়ের পুরষ্কার প্রাপ্তি উপলক্ষ্যে ক্লারিসা একটি পার্টির আয়োজন করছে। এক সময়ের প্রেমিক এখন একজন ভালো বন্ধু, সে এখনও রিচার্ডকে ভালোবাস। তবে ক্লারিসার বর্তমানে অন্য এজন পার্টনার রয়েছে, যে একজন নারী। বর্তমানে এসে নারী নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছার মূল্য দিতে পারছে। সে নিজের পার্টনার নিজে পছন্দ করছে।

ভার্জিনিয়া উলফ মিসেস ডালাওয়ের মতো চরিত্র সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু নিজের জন্য কোনো সিদ্ধান্ত সে নিতে পারে না। আবার লরা সাহসী হয়ে নিজের পথ নিজে এক সময় বেছে নিয়েছে আর ক্লারিসা নিজের সিদ্ধান্তে অনেক বেশি স্বাধীন।

শেয়ার করুন:
  • 94
  •  
  •  
  •  
  •  
    94
    Shares

লেখাটি ৩১৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.