জামাই আদর থেকে বউ আদর আর কতদূর!

0

সালমা লুনা:

জামাই ষষ্ঠী কি চলে গেলো?

অনেক লেখালেখি ফেসবুকে। নানান ছবিতে দেখা যাচ্ছে হরেক পদ নিয়ে জামাই বাবাজীবন বসে আছেন। তাকে ঘিরে কখনো স্ত্রী, নয়তো শাশুড়ি অথবা শাশুড়ি শ্রেণীর আত্মীয়ারা। ঘিরে নিয়ে বসে আছেন, তদারকি চলছে, জামাই বাবাজী খাবেন বলে কথা!

এমন কোন উৎসব কি আছে সমাজে যেখানে বউকে অর্থাৎ ছেলের বউটিকেও এভাবে শতব্যঞ্জনে তুষ্ট করার চেষ্টা করা হয়! পূজিত করা হয়!

আমি নিশ্চিত জানি, নেই।
পুরুষ রূপে জামাতা রূপেও শুধু পুরুষই পায় এতো সম্মান। খাইয়ে, দিয়ে থু’য়ে, পরিবার থেকে শুরু করে সামাজিকতার চূড়ান্ত পর্যায়ে শুধু পুরুষের প্রাপ্য এই সবকিছুই। ঘরের বউটি মেয়ের জামাইয়ের মতো কিছু পায় না।

শুধু হিন্দু ধর্মের ষষ্ঠী পূজো বা জামাই ষষ্ঠী না। মুসলিম সমাজের জামাইরাও যথেষ্ট আদরযত্ন আর মানসম্মান পেয়ে থাকেন। পক্ষান্তরে ছেলের বউটি আদর যত্ন উপহার পাওয়া-টাওয়া তো দূর, ভাগের খাদ্যটুকুও অনেক সময় পায় না।

দূর শহর বা দূরদেশ থেকে মেয়ের জামাই শ্বশুরবাড়ি আসবে বলে যে সাজসাজ র’ব উঠে, তা আমরা সবাই প্রত্যক্ষ করি। কিন্তু পুত্রবধূ বাড়ি আসছে এ খবরটি কাকপক্ষিতেও টের পায় না। কেননা তাঁর জন্য তো বাড়িঘর ধোয়ামোছা, বিশেষ খাবার, শোবার ঘরের আলাদা বন্দোবস্ত- এসব কিছুই হয় না!

এমনকি নতুন ভাই বউকে দেখতে মেয়ে বাপের বাড়ি এলে সাথে যদি জামাই বাবাজীবনও আসে, তবে ওই নতুন বউকেই আট-দশ বছরের পুরনো জামাইয়ের সম্মানার্থে নিজের ঘরটি ছেড়ে অন্যান্য আত্মীয়দের সাথে ঢালাও বিছানায় ঘুমাতে হয়, এমন নজির ভুরিভুরি আছে বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারে। অথচ পাল্টা ঘটনা একটিও পাওয়া যাবে না।

ধর্মীয় আচার না হোক, মুসলিম পরিবারে জামাই খাওয়ানোর আদিখ্যেতাও কিছু কম নেই!
মূলতঃ বিয়ের পরদিন থেকেই এই বৈষম্যের শুরু। ছেলের বউ সকালে ঘুম থেকে উঠে মেয়ের জামাইয়ের মতো টেবিলে সাজানো হরেকরকম নাশতা পায় না শ্বশুরালয়ে।
বরং তাকে নাশতা বানাতে বলা হয়।
এর সাথে যুক্ত থাকে বউকে ধরাশায়ী করার সেই মান্ধাতার অস্ত্র- ‘বৌ আজকে সবাই তোমার হাতের নাশতা খাবে।’ আবার কখনো আদেশ, প্রথমদিনই বউরা বেলা অবধি ঘুমায় না। নাশতার টেবিলে এসো।

আর জামাই শ্বশুরবাড়ি গেলে?
ওগো, সকলে বেড়াল পায়ে হাঁটো, তোমরা আস্তে কথা কও। আহা! ঘুম না ভেঙে যায় জামাইবাবাজীর!

জামাই শ্বশুর বাড়ি এসেছে?
জামাই খেতে পারুক বা না পারুক, পছন্দ করুক বা না করুক পোলাও রোস্টের বাহার থেকে পিঠেপুলির স্তুপ টেবিলে হবেই!
একটা বাঙালি বাড়ির বউ কে কবে এই দৃশ্য কল্পনা করতে পেরেছে, তারই জন্য এতো আয়োজন!

সে তো নিত্যই শ্বশুর শ্বাশুড়ি দেবর ননদদের খাইয়ে অবশেষে তলানির ভাত, ইলিশের মাথাবিহীন পুঁইয়ের দুটো ডাঁটাপাতা, নয়তো পড়ে থাকা করলা ভাজির বিচিটুকু, অতবড় মাছটার ভাঙা পিঠের টুকরোর খণ্ডিতাংশ, নয়তো শুধুই মাছের ঝোল, নয়তো মুরগির গলাকাঁটা এইসকল যা কিছু অবশিষ্ট থাকে তাই দিয়ে, তারই মতো একটি কী দুটি জা নামক হতভাগীকে সঙ্গে নিয়ে কোনরকম নাকেমুখে গুঁজতে বসে।
সেই সাথে সোনালী স্মৃতি রোমন্থন করে, মা কেমন করে তার জন্য তার পছন্দের মাছটি কিংবা খাবারটি পাতে তুলে দিতো কিংবা বারবার ঘুরে ঘুরে এটা ওটা নিতে বলতো।

ঈদ পূজা পার্বণে আবার এই বৈষম্য মাত্রা ছাড়া! বাড়ির জামাইটির জন্য খামে ভরা মোটা বাজেট। ধূতি পাঞ্জাবী পাজামা বা ব্র্যান্ডের শার্ট তো আছেই, মেয়েপক্ষ বেশি নরমসরম হলে ঘনঘন মেয়ের সাথে বোঝাপড়া চলে, বাবাজীবন এই ঈদ বা পূজায় কী চান?
ওদিকে বাড়ির বউটির শুকনো মুখ, সে তো জানেই তার জন্য বাজেট তো দূর, সে পাচ্ছে না কিছুই।
কারণ, সে তো বউ। সে যে পরিবারেরই লোক। পরিবারের লোকদের কিছু দিতে হয় না।

এ এক আচ্ছা বাহানাই বটে, ‘পরিবারের লোক’!

পরিবারের এই লোকটিকেই কিন্তু আবার পারিবারিক আলোচনায়, জমিজমা, ভাগবাটোয়ারা হিসেব এসব থেকে দূরে রাখা হয়। কেননা সে বাড়ির বউ! তার এসবে মাথা ঘামানোর কোন দরকার নাই।

জামাই যে ধর্মেরই হোক, পেতে পেতে অভ্যেস তাদেরও কারো কারো এমন হয়েছে যে এই ‘জামাই আদরে’র এতোটুকু ব্যাত্যয় হলে তার জামাই ‘ইগো’ আঘাতপ্রাপ্ত হয়। তিনি তখন পাল্টা আঘাতে উদ্যত হন। স্ত্রী, শ্যালক শ্যালিকা তো কোন ছার, শ্বশুর শাশুড়িও বাদ যায় না ‘বঞ্চিত’ জামাইয়ের খড়্গ জিহ্বা থেকে।

অভিযোগ আর অভিমান!
কবে খাওয়ায়নি চিতলের মুইঠা, দেশি কইয়ের ভাজা, কবুতরের দোপেঁয়াজা। নদীর পাঙ্গাস আর বিলের চিতলের পেটি মোবারকের শ্বশুর ঠিকই যোগাড় করে মোবারককে খাইয়েছে, কিন্তু কবে শীতে এসেও শ্বশুড়ির হাঁপানির টান উঠায় বাদ ছিলো দুধচিতই খাওয়া, সেটি সন তারিখসহ মনের কুলুঙ্গিতে সযতনে রাখা।
বিবিখানা পিঠা বলে যে পিঠাটি লোকজন জামাইকে খাওয়ায়, তা আপিসের বরকত না বললে তো জানাই হতো না ওইটা জামাইদের জন্যই স্পেশালি বানানো হয়। এও কী কম দুঃখের কাহিনী?
আর এই যে রোজায় ইফতার পাঠাতে হয় এটা কেন শুধু সিলেটের নিয়ম হবে! সিলেট কি দেশের বাইরে? আমার ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে ইফতার আসলে আমারও তো ইচ্ছা করে তোমার বাপের বাড়ি থেকেও আসুক। আমার কি মানসম্মান বলে কিছু নাই?

সব কথার আড়ালে আসলে তো ওই জামাই আদরটুকুর জন্যই তার জীবন! ওটুকু পায়নি বলেই তার সাধের মানবজন্ম বৃথা যেতে বসেছে! ওইটিই প্রাণে ধরে বলতে পারছে না।
এদিকে বাড়ির বউটি নিজের পায়ের নিচের নড়বড়ে মাটি নিয়ে ক্রমাগত যুদ্ধ করে যাচ্ছে! আদর তো তার জন্য বহু দূরের চিন্তা।
সবাই মেনেই নিয়েছে, এটি খুব স্বাভাবিক চিত্র।
মানবেই বা না কেন?
জামাইটি যে পুরুষ!

আর ওই বউদেরও বলি, এই যে ঝ্যাঁটা লাথি খাচ্ছো, তবুও মা-বাবাকে জোর করা কেন বাপু, জামাইকে কিন্তু এবারে আড়ং থেকে পাঞ্জাবী দিও না। আজকাল আড়ং বড় ঝ্যালঝ্যালে কাপড় দেয়, আর এক ধোয়াতেই সব শেষ! মান্যবর বা জারা ফ্যাশন থেকে দিও – বলে হেঁদিয়ে পড়া কেন বাপু বুঝি না।
নিজেদেরও একটু ভাববার দরকার আছে।
জানিই তো এই সমাজ শুধুই পুরুষের জন্য!

তবে দিনও তো কিছু বদলেছে। ষষ্ঠী না হোক, দেয়াথোয়া, এসব নাইই বা হলো! শুধু সম্মানটুকু ওই আদরটুকু কি পেতে পারে না ঘরের বউটি?

ঠিক মেয়ের জামাইটি যেমন পায়।

শেয়ার করুন:
  • 1.4K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.4K
    Shares

লেখাটি ১,৬৯৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.