পুরুষের ‘প্রিয়’ হয়ে উঠা নারী, তুমি নিজে কোথায়?

0

সাজু বিশ্বাস:

কিছুদিন ধরেই দুটি থিওরি ঘুরতে ফিরতে দেখছি বিভিন্ন পোর্টালে।

১. যে নারী পুরুষের প্রিয় হতে পারে না, সেই নারীবাদী হয়।

২. যেসব নারী বিবাহ করে না, তারাই সবচেয়ে সুখী জীবনযাপন করে এবং দীর্ঘায়ু হয়।

যে নারী পুরুষের প্রিয় হয়ে উঠতে পারে না, সেই নারীবাদী হয়ে ওঠে,…একজন বা দুই একজন অতি নিম্ন মস্তিষ্কের মহিলা এই ভেষজ উৎপাদন থিওরিটি ক্রমাগত পুনঃ প্রসব করে চলেছেন। এটি নতুন কিছু নয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এটি মোটেই নতুন কিছু নয়।
আগে পুরুষেরা নারীবাদীদের এই কথা বলে গালি দিতো। … কোনও পুরুষ নজর দিতেছে না, তাইলে তুমি নারীবাদী…, এর সাথে নারীর চরিত্র নিয়ে টানাটানি সম্পর্কিত গালাগালিগুলি ফ্রি।

লেখক: সাজু বিশ্বাস

আর চরিত্র তো কেবল নারীরই হয়! এবং সেই চরিত্র ঠিক সমাজ যেই যেই রকম বলবে তেমন তেমনই হবে। এর বাইরে গেলেই সে ব্যতিক্রম, এবং গালি হিসেবে নারীবাদী। তা এই থিওরির মোর্দা কথাটা কী তাহলে? ‘পুরুষের প্রিয় হয়ে ওঠাই নারী জীবনের একমাত্র এবং সর্বশেষ লক্ষ্য’!

প্রিয় মেয়েটি, আপনি নিজে কি আপনার এই থিওরির সাথে একমত? পুরুষ ভাই হয়, বন্ধু হয়, বাবা হয়, প্রেমিক হয়, সন্তান হয়… আপনার জীবনের সর্বাবস্থায় পুরুষ প্রিয় হয়ে ওঠাই আপনার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। তাইলে আপনি কোথায়! আপনি যে পৃথিবীতে একটা মূল্যবান জীবন কাটিয়ে গেলেন, … সেই জীবনের উদ্দেশ্য কী!

ভূধর হইতে ভূধরে ছুটিবো,
শিখর হইতে শিখরে লুটিবো,
হেসে খলখল, গেয়ে কলকল, তালে তালে দিব তালি

এইসব অনাসৃষ্টির কবিতা আপনি পড়তে যেয়েন না। এগুলো পুরুষদের জন্য। ব্যাকডেটেড বুড়ো রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন!

নারীবাদ আসলেই একটা পাপের জিনিস? সামান্য বুঝতে চেষ্টা করি। নারীর শরীরের অংশ থেকেই নতুন মানুষের জন্ম হয়। নারী জানতো এটা, যে তার গর্ভ থেকে জন্মেছে, সে নিশ্চিত ভাবেই তার সন্তান। কিন্তু নারী যতক্ষণ স্বীকার না করছে ঐ পুরুষ তার সন্তানের জন্মদাতা ততক্ষণ পুরুষের সঙ্গতি নেই পুরুষের নিজের সন্তানের পিতৃত্ব দাবি করার। পুরুষ তাই পরিবারতন্ত্র পছন্দ করে। অন্তত নারীর ভরণপোষণের দ্বায়িত্ব নেবার পাশাপাশি পুরুষ একটা নিশ্চিত প্রশস্তি লাভ করতে পারে যে, এই নারী এবং এর গর্ভজাত সমস্ত সন্তান তার এবং সেই সূত্রে সে এই ব্যাপারেও নিশ্চিন্ত হল, যে তার কষ্টার্জিত সমস্ত জাগতিক সম্পদ সে তার উত্তরাধিকারীর হাতে দিয়ে যেতে পারলো। এটি বিবর্তনবাদের পুরুষতান্ত্রিকতা।

তুমি মেয়ে কোথায় গেলে!
পরিবারের মধ্যে। তা পরিবার ভালো। নিদেন পক্ষে নিরাপত্তার জায়গা। অন্তত সাদা চোখে আমরা তাইই দেখি। পরিবার নারীর জন্য নিরাপদ জায়গা। যদিও সব সময় তা হয় না। স্বামীর দ্বারা, পরিবার দ্বারা, সমাজ দ্বারা এমনকি নিজের জন্মদাতার দ্বারা নারী বিভিন্ন ভাবে নিগৃহীত হয়।

নারীবাদ নারীর সামাজিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সমস্ত রকম নিগ্রহের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পুরুষ নারীর সমান অধিকারের কথা বলে। যদিও সমাজের জায়গাভেদে এই সমান অধিকার চাওয়া সব জায়গায় উপযুক্ত কিনা এই নিয়ে ভুরি ভুরি তর্ক আছে। কিন্তু মানুষ কেন তার অধিকার চাইবে না?
সহজ কথা, শুধুমাত্র মেয়ে বা ছেলে হবার কারণে সমাজে একটা মানুষের উপর যে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য হয়, — সেটি বদলে যাক, মেয়ে বাইরে নির্ভয়ে চলুক, বড় কথা নিজের জীবনের লক্ষ্য নিজেই ঠিক করুক, নিজেকে কিছু কাজের সাথে যুক্ত করুক… সমাজের কাছে এই প্রত্যাশার নাম নারীবাদ।

এখন প্রশ্ন এসে গেল, তাহলে গৃহকর্ম কি কোনও কাজ নয়? আমি যে সারাদিন ঘরে বইসা ছেলে স্বামী পিতার জন্য এতো এতো খানা পাকাই, ঘর সাফ করি, সবার সমস্ত জিনিস হাতের কাছে রেডি রাখি,… এসবের কি তাহলে কোনও দাম নাই?

এর উত্তর আছে। কোনও শ্রমকেই ফেলে দেওয়া হয়নি কাগজপত্রে। আমরা কিছুক্ষণ মার্কসের অর্থনৈতিক বিভাজন দেখে আসতে পারি। মার্কস মূলত সকল রকম কাজকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে দুই ভাগে ভাগ করেছেন।

১. উৎপাদনশীল এবং ২. উপ- উৎপাদনশীল। প্রোডাক্টিভ আর রিপ্রোডাক্টিভ। পুরুষ বাইরে যে সব কাজ করে, মোটের উপর ধরে নেওয়া হয়, তার সবই প্রোডাক্টিভ্। মানে পুরুষের সমস্ত কাজই অর্থকরি।

এইখানেই নারীর অধিকার এবং সামর্থ্যর পার্থক্য হয়ে যায়। নারীর ঘর গুছানো, কাপড় ধোয়া, বাসন মাজা, সন্তান পালন, সমস্ত কাজই রিপ্রোডাক্টিভ। অর্থাৎ মুল উৎপাদন এবং অর্থনীতিতে এই কাজগুলোর কোনও ভূমিকা নাই। সেই কারণে নারীর সমস্ত শ্রম তুচ্ছার্থে গণ্য হয়।

গেল অর্থনৈতিক দিক। কিন্তু এসব এখন আর সদা সর্বদা সত্য নয়। অনেক মেয়েই এখন প্রোডাক্টিভিটির সাথে যুক্ত। মেয়েরা কোথায় নেই আজ! চাকরি, ব্যবসা, ডাক্তারি, নভোচারী! কোথায় কোথায় না নেই মেয়েরা! কিন্তু এইবার এসে গেল সামাজিক নিরাপত্তা। পড়ার জায়গায়, শেখার জায়গায়, কাজের জায়গায়, মেয়েরা নিরাপদ তো! নাহ, সবসময় নয়। এমনকি বেশিরভাগ সময়ই নয়। সেই জন্যই মেয়েরা জোরেশোরে দাবি তোলে, — সমান অধিকার চাই, কাজের জায়গায় নিরাপত্তা চাই, শরীর যেন মেয়ের জন্য ট্যাবু না হয়ে দাঁড়ায় সেই নিশ্চয়তা চাই।

মানুষের বহুগামিতার কথা বলতে না যাওয়াই ভালো। বিশেষত প্রত্যেক পুরুষ নিশ্চিত জানে পুরুষ বহুগামী।
বড় বড় সাধুসন্তও এই ব্যাপারে বাদ যায় না। কিন্তু নারীর মুখে যদি কেউ সেই কথা কখনো শোনে তাহলে পুরোই রাম, রাম, অবস্থা! পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কেন নারীর বহুগামিতা অনুমোদন করে না, তা আগেই বলেছি। এখানে সন্তানের পিওরিটির ভয় কাজ করে, এখানে নিজের উত্তরাধিকার হাতছাড়া হবার ভয় কাজ করে।

কিন্তু সবাই কি নিজের জায়গা ছেড়ে দেবে! নাকি সবাই একরকম হবে? কেউ কেউ নিজের সমস্ত অধিকারের জন্য উচ্চকিত হবে। কে কী চায়, শুধু চাওয়া আর পাওয়ার পার্থক্য। অনেক নারী তো ঘরের কাজগুলোকেও প্রোডাক্টিভ হিসেবে নেবার দাবি জানান। একজন মানুষের সমস্ত জীবন কেটে গেল রান্নাঘরে, অথচ সেই মানুষটার কোনও অর্থনৈতিক মূল্য ধরা হল না! এটা কেমনে হয়। আমরা জানিই অনেক বাড়িতেই নারী ছাড়া হাঁড়ি চড়ে না।

কাজে কাজেই একজন মানুষের সারাজীবনের উদ্দেশ্য যদি অন্যদের জন্য খানা পাকানো আর ঘর গুছানোও হয়, তাকেও তুচ্ছ করার কিছু নেই। সেও সমান অধিকারেরই যোগ্য। আর এই অধিকার পাওয়ার জন্য পুরুষের প্রিয় পাত্র হবার চেয়ে নিজে অধিকার সচেতন হওয়া বেশি জরুরি। অবশ্য নিজেকে প্রোডাক্টিভিটির সাথে সরাসরি যুক্ত করা ছাড়া কেমনে সেইসব অধিকার পাওয়া সম্ভব সে ব্যাপারে কোনও গ্যারান্টি নেই।

দুই নম্বরের সুখী হবার থিওরিটি নারীবাদীদের জন্য একটি বড়সড় হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু কথা ফেলনা নয়। পুরুষ যে ব্রক্ষ্মচারী হয় তাতো সুখী হবার জন্যই। জাগতিক সুখ না হতে পারে, তাকে আধ্যাত্মিক সুখ তো বলাই যায়। একাকি মানুষ নিজের মর্জির মালিক নিজে। সে সুখী হবে নাতো কি পরিবারের পাঁচ জনের ইচ্ছেয় নিজের ইচ্ছে মিলিয়ে দেওয়া নারী বেশি সুখী হবে!

বিশেষ করে আমাদের দেশে এমন মায়েদের অভাব নেই যারা স্বামী সন্তানের বাড়তি টাকা খরচ হবে সেই ভয়ে নিজের শক্ত অসুখের কথাও সযত্নে সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে। তারপর হঠাৎই একদিন নিজে নেই হয়ে যায়।

শেয়ার করুন:
  • 492
  •  
  •  
  •  
  •  
    492
    Shares

লেখাটি ১,৯৮৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.