হোয়াট ইজ বিউটি!

0

বিকাশ ভৌমিক:

আমার মনে হয় বিষয়টা একেবারেই আপেক্ষিক। কিন্তু সমস্যা বাঁধে তখন, যখন কারও শিখিয়ে পড়িয়ে দেওয়া গাইডলাইন ধরে আমরা এর বিচার করতে বসি। যেকোনো দেশের বা জাতির নর নারীর অবয়ব গড়ে ওঠে সেই অঞ্চলের আবহাওয়া পারিপার্শ্বিকতা খাদ্যাভ্যাস এবং সেখানকার মানুষের মননশীলতার ভিত্তিতে।

যেমন ধরুন, গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের আগে বা পরে অব্দিও জার্মান, ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ, রুশ লোকেদের মোটামুটি দেখেই আলাদা করা যেতো। অর্থাৎ তাদের মধ্যে সংকরায়ন হয়েছিল খুব কম। কিন্তু এই সংকরায়নই বিপদ বাঁধিয়ে ফেললো আমাদের উপমহাদেশে, যার বলি হলো আমাদের নদীর মতো সরল নারীরা।
যুগে যুগে গ্রিক, আরবি, ফারসী, আফগান, পাঠান, মঙ্গোলীয়, সবশেষে ব্রিটিশরা এলো, যুদ্ধ করলো, আমরা হেরে গেলাম, আমাদের নারীদের করা হলো ধর্ষণ থেকে মহাধর্ষণ। ফলাফল হিসেবে আমরা এমন এক সংকর জাতিতে পরিণত হলাম, যে সংকরায়ন ঢুকে গেলো চেহারা, গায়ের রঙ, মানসিকতা এমনকি চিন্তা চেতনাতেও। এবং তিতা হলেও সত্য এই সংকরায়ন এর আফটার শক এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে আমাদের নারীরা।

ব্রিটিশরা দেখিয়ে দিয়ে গেলো চামড়া সাদা হতে হবে, আবার যাওয়ার সময় কিছু মলম দিয়ে গেলো, সেগুলো মাখলে নাকি আমাদেরও চামড়া সাদা হবে। বছরের পর বছর ধরে আমরা সেই মলম ঘষেই যাচ্ছি, মাগার চামড়া সাদা হওয়ার নাম নেই। কিন্তু মনের মধ্যে আশা আছে, এইতো আর কদিন পর আমিও সাদা হবো, কারণ টিভিতে রাস্তার বিলবোর্ডে রোজ দেখাচ্ছে পরীমনি, বিদ্যা সিনহা মিম, ক্যাটরিনা কাইফ নাকি এই মলম মেখে, এই সাবান দিয়ে স্নান করেই ঝলমলে সুন্দর হয়ে গেছে।

একটা উদাহরণ দেই–
ধরুন একই মায়ের পেট থেকে একজন খুব সুন্দরী আর একজন অসুন্দরী মেয়ের জন্ম হলো, ধারণা করতে পারেন, ওই অসুন্দরী মেয়েটিকে কী পাশবিকতা নিয়ে বড়ো হতে হয়? চোখের সামনে সবাই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে কার্পণ্য করে না।

আবার খেয়াল করুন, ওই দুই বোনের দুজনই কিন্তু চরম বিপদে। যে বোনটি সুন্দরী, সে ছোটবেলা থেকেই থাকবে সিসি ক্যামেরা রেঞ্জের মধ্যে। স্কুলে যাবে? কোনো না কোনো শিক্ষক ওঁৎ পেতে বসে আছে, আত্মীয়দের মধ্যেও ওঁৎ পেতে বসে আছে, পাড়া প্রতিবেশির কথা নাহয় বাদই দিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্রেন্ড, বড় ইয়ারের ভাইয়ারা, ক্ষমতাধর শিক্ষক সবার মন জুগিয়ে চলতে হবে, হেসে হেসে কথা বলতে হবে, চেম্বারে ডাকলে যেতে হবে। একটু এদিক-সেদিক হলেই কপালে জুটবে বেশ্যামির তকমা। ঘরে ফিরে কী মুক্তি পাবেন, বিবাহ হওয়ার আগে কতবার যে কুরবানির হাটে উঠতে হবে তার ঠিক নেই। এক কথায় এদেশে সুন্দরী হয়ে জন্মানো মানে আপনি সম্পূর্ণভাবে পাবলিক প্রপার্টি।

আর ওই অসুন্দরী মেয়েটি তো মরবে ধুঁকে ধুঁকে, আরো ভয়ানক মরন। সে গান গাইতে পারে, ছবি আঁকতে পারে, কবিতা লিখতে পারে কিন্তু সব কথার শেষ কথা হলো, তার সাদা চামড়া নেই কেনো? তোমার উন্নত নাসিকা প্রশস্ত ললাট নেই কেনো? সুতরাং তুমি বাতিল।

আচ্ছা বলতে পারেন, এই দুই বোনের কেউই কি এই পরিণতির জন্য নিজেরা দায়ী? তার মানে তো তারা এই পৃথিবীতে জন্মেই বিপদে পড়লো।

(চলবে)

শেয়ার করুন:
  • 135
  •  
  •  
  •  
  •  
    135
    Shares

লেখাটি ৬৬৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.