জেন্ডার রোল পাল্টে দেয়া একটি পরিবারের গল্প

0

তানিয়াহ মাহমুদা তিন্নি:

আমার বাবা-মার যখন বিয়ে হয় বাবা তখন বি,এ- এর শিক্ষার্থী, আর মা সদ্য কলেজ থেকে ঝরে পড়া। আমার মা যখন দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী, তখনই নানা মারা যাওয়ায় অভাবের সংসারে ভাইয়েরা চেয়েছিলেন কোনরকমে আমার মা-খালাদের পাত্রস্থ করতে। আমার বেকার বাবা কোনরকম টিউশনি পড়িয়ে সংসার চালাতেন, আর তার উপর বছর না ঘুরতেই আমার জন্ম। সংসারে নতুন মুখ, আর বাবাও বিএ শেষ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এম,এ তে ভর্তি হয়েছেন, সেটার টুকটাক খরচ, সব মিলিয়ে অনেকটা বাধ্য হয়েই মা একটি এনজিওতে কাজ করতে শুরু করলেন।

শৈশবের যতটুকু স্মৃতি আমার মনে পড়ে, আমার মা সকাল আটটার মধ্যে আমাদের খাইয়ে চলে যেতেন কাজে। কিছুদিনের জন্য আমাকে দেখভালের জন্য একজন সহকারি ছিল, আর বাকিটা সামলাতেন আমার বাবা। টিউশন, তার পড়াশুনা সেগুলো সামলে যতটা পারতেন সময় দিতেন আমাকে। পরে বাবাও যখন কর্মব্যস্ত হয়ে পড়লেন, মা-বাবার পুরোনো অভ্যেস কিন্তু থেকেই গেল। সন্তান মানুষ করার যে দায়িত্ব সাধারণত মায়ের উপরেই আমরা চাপিয়ে দিতে অভ্যস্ত, আমাদের দুভাইবোনের ক্ষেত্রে সেগুলো পালন করেছেন বাবা।

আমাদের পড়াশোনার হাতেখড়ি বাবার কাছেই। আমাদের দু-ভাইবোনের হয়তো মনেই পড়ে না মা কবে মুখে ভাত তুলে খাইয়েছেন, অথচ বাবার ক্ষেত্রে সেটা ছিল অতিসাধারণ ব্যাপার, ক্লাস টেন পর্যন্ত স্কুলে যাবার জন্য তৈরি করে দেয়া থেকে আনুষঙ্গিক আর যা কিছু, সব করেছে আমার বাবা, রাতের বেলা টয়লেটে যেতে ভয় করলে নিজের রুম থেকে ডাকি- “আব্বা, আমার বাইরে যেতে হবে”। আব্বা দরজা খুলে বের হলে তবেই না আমি বের হয়ে টয়লেট যেতাম। পিরিয়ডে পেট ব্যথা, মায়ের আগে বাবাকে বলতাম, ওষুধ থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনা, সব দায়িত্ব ছিল বাবার। জ্বর হয়েছে, রাতে বার বার গা মুছে দেয়া, কিংবা মাথায় পানি ঢেলে দেয়া এসব করেছেন বাবা, যে কোনো আবদার বাবার কাছেই, বাবা মানেই আমাদের ভাই-বোনের ভরসা। যদিও নিয়মিত বাড়ির রান্নাটা মায়ের দায়িত্বেই ছিলো, কিন্তু মায়ের অসুস্থতায় বাবাকে দেখেছি রান্না করতে, মায়ের কাপড় পরিষ্কার করতে, বাজার থেকে একগাদা ছোট মাছ কিনে আনার পর মা-বাবা একসাথে মাছ কুটছেন, এটা ছিল আমাদের বাড়ির অন্যতম একটা সাধারণ দৃশ্য।

এবার আসি মায়ের কথায় – কর্মজীবী মা আমার অনেকটাই কড়া শাসনে রাখতেন আমাদের। বাবা যতটা আহ্লাদ দিতেন, মা ছিলেন ঠিক তার উল্টো। ছোটবেলায় যমের মতো ভয় করতাম তাকে। আমরা দুটি ভাইবোন দেখতাম, আমাদের মা আর সবার মার মতো নন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার কাজের পাশাপাশি বাড়ির যাবতীয় কাজ করছেন।

ছোটবেলা থেকে বাবা না থাকায় প্রচুর কাজ করতে হয়েছে তাকে, নানাকাজে তিনি পারদর্শিও বটে। আমরা দেখেছি অনায়াসে এক মণ ধান বয়ে নিয়ে শুকাতে দিতে, চুলায় ব্যবহারের জন্য কুড়াল দিয়ে কাঠ ফাড়তেন আমার মা, বাবা যেটাতে হিমশিম খেত। ধান-চাল ভাঙানোর যে মিল গ্রামে, সেটাতে মাকেই বেশি যেতে দেখেছি বাবার থেকে। সংসার চালানোর টাকা-কড়ির হিসেব কিংবা যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে মায়ের অংশগ্রহণ ছিল অনস্বীকার্য।

জেন্ডারের ভিত্তিতে কাজের যে বিভাজন সমাজ করে রেখেছে সেটার অনেকটাই যেন উল্টে দিয়েছিল আমাদের পরিবার। যদিও সেটা খুব সচেতনভাবে করা হয়েছিল, তা বলাটা ঠিক হবে না, বরং, অনেকটাই প্রয়োজনে হয়ে গিয়েছিল।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাদারলি ফিগার বলতে যা বোঝায় আমরা সেটা বাবাতেই পেয়েছিলাম। আমার এমন অনেক ঘটনাই মনে পড়ে কোনো কারণে বাবা আমাকে শাসন করেছে, কিংবা গায়ে হাত তুলেছে তার কিছুক্ষণ পরেই আমাকে কোলে তুলে নিয়ে কাঁদছে, আর বলছে- তুই যে আমার বুড়ি মা, তোকে মারলে যে আমারও কষ্ট হয়, আমার কথা শুনিস না কেন, শুনলে তো আমি আর রাগ হতাম না।

ছোটবেলায় এমন অনেক দিন গেছে বাবা-মার ঝগড়া হয়েছে, আর আমি স্কুলে গিয়ে লুকিয়ে বাবার জন্য কাঁদছি, মনে মনে মাকে বকা-ঝকা করছি, এই মহিলাটা কেন যে বাবাকে কষ্ট দেয়, অথচ ঝগড়া কিন্তু দুজনেই সমানে-সমান করেছে।

বাবা-মায়ের বন্ধুরা যখন জিজ্ঞেস করতো, কাকে বেশি ভালোবাসো? আমি বলে দিতাম আব্বাকে- এ নিয়ে মায়ের যে একটু চাপা অভিমান ছিল, তা বড় হয়ে বুঝতে পেরেছি। কিন্তু ঐ যে বললাম, মায়ের রাশভারি-কড়া-আহ্লাদ না দেয়া বহিরাবরণ, সেটার ভয়ে আমরা দূরে দূরেই থাকতাম বেশি।

তবে এখন বুঝি এই প্রচণ্ড পরিশ্রমী, আর কড়া শাসনে রাখা মায়ের জন্যই আজ আমার এতোদূর পৌছে যাওয়া৷ এসএসসি পরীক্ষার মাত্র ১৭ দিন আগে যখন সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা চলে গেলেন, এই মাই শক্ত করে হাতটা ধরে বলেছিলেন, যত যাই হোক, আমার ছেলে-মেয়ে পড়বে, ঘরে-বাইরে রাতদিন পরিশ্রম করে পেছন থেকে শক্তি দিয়ে গেছেন, যতদূর যেতে চাও, যাও।

নারী এবং পুরুষের এই যে নির্মাণ, তা যে সামাজিকভাবেই নির্মিত, এর থেকে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে? পুরুষমাত্রই ভাবগম্ভীর, শক্ত-সমর্থ, নির্ভীক, সন্তান পালনে অপারদর্শী আর নারী মাত্রই আবেগি, গোবেচারা, নরম-শরম, অল্পতেই ভেঙে পড়া, দুর্বল, অবলা, এই প্রচলিত ধারণাগুলোকে আমি কখনোই মেলাতে পারিনি আমার পরিবারের ক্ষেত্রে।

থিওরিটিক্যালি না হোক, প্র্যাক্টিক্যালি তারা ভুল প্রমাণ করেছে প্রচলিত বস্তাপচা ধারণাগুলোকে। নারী এবং পুরুষের গুণাবলি মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল বাবা-মা দুজনাতে। একজন পুরুষ সন্তান লালনপালনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন তার উদাহরণ আমার বাবা। একজন নারী কতটা দাপটের সাথে উপার্জন করে একাই সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করে তুলতে পারেন তার প্রমাণ আমার মা।

আমি যখন একটা মাস্টার্স শেষ করে শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে আরও একটি মাস্টার্স করতে ভারত এলাম, অনেকেই বিস্মিত হয়ে নানাবিধ প্রশ্ন করছিল যে, “মেয়েমানুষের” এতো পড়াশোনার কী দরকার? এখনো করে। প্রতিবেশীরা যখন বলে মেয়েমানুষকে আর কতো পড়াবি? বিয়ে দিতে হবে না? আর কত পড়বে? মা হেসে উত্তর দেন, মেয়েকে এতো কষ্ট করে পড়ালাম, ওর আয়রোজগার না খেয়েই বিয়ে দেব?

হ্যাঁ, আমি এই স্বল্পশিক্ষিত মাকে নিয়েই গর্ব করি, যিনি অনেক তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত লোকের মতো মনে করেন না যে- “মেয়েরা কুড়িতেই বুড়ি”। এই মায়ের সাহসেই আস্ত আরেকখানা মাস্টার্স শেষ করে ফেললাম। এবার মাও মনে করিয়ে দিলেন, ফিরে এসে আমার সংসারের দায়িত্ব নেয়া উচিৎ। আমিও নিতে চাই, আম্মা।

এখনও বেশিরভাগ নারীদের যেভাবে ভাবানো হচ্ছে এবং তারা ভাবছে, নারীরা সন্তান জন্ম দেয়া এবং মানুষ করার মেশিনমাত্র, যেখানে আজও প্রতিষ্ঠিত সত্যি এই যে চাকুরিজীবী নারীদের সন্তান ঠিকঠাক “মানুষ” হতে পারে না, অর্থাৎ এটার মাধ্যমে এটারই বৈধতা দেয়া হচ্ছে যে সন্তান লালন-পালনে পুরুষদের দায় নেই বরং নারীদেরই দায়িত্ব, পুরুষ মানেই বাহির, আর নারী মানেই ঘর, সেই একই সমাজে দাঁড়িয়েও আমি বাইরের নারীই হতে চাইবো, আমার মায়ের অনুপ্রেরণায়।

লেখক: স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী, জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়, নয়াদিল্লি

শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares

লেখাটি ২,৯১৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.