আমার চোখে নারীবাদ ও মানবিক গুণাবলী

0

আফরোজা চৈতী:

আমার অভ্যাসই হচ্ছে যখন যে বিষয়টি নিয়ে কাজ করি সেটার ভেতরে ঢুকে যাই। একটা তথ্যচিত্র নির্মাণ করছি “হিজড়া” সম্প্রদায় এর উপর। শিল্পী দিদি বলে ডাকি তাকে। কেন দাদা নয়? আসলে দাদার চেয়ে দিদির পরিচয়টাই তার সাথে আমাকে অনেক বেশি একাত্ম করে।

তার সাথে আমার পরিচয় এর পরিধি বেশ দীর্ঘ। আজ প্রায় সাত বছর তার সাথে আমার পরিচয়। আমি তার ওখানে যাই, খাই, থাকি। আর এসব নিয়ে কোনদিন আমার মনে কোন কিন্তু আসে নাই। অনেক প্রগতিশীল নারী অথবা পুরুষকেই দেখেছি “হিজড়া” শব্দটা নিয়ে বুলিং করতে। হয়তো নিতান্তই ফান হিসেবে তারা এটা করেন, কিন্তু যখন চিন্তাচেতনায় উদারতার লেবাস পরে ঘুরে বেড়ানো মানুষগুলো বলেন “হিজড়া বাচ্চা প্রসব” বা “হিজড়া হয়ে যাই নাই”, তখন মনে হয় এই যে যারা নারীবাদ, প্রগতিশীলতা ইত্যাদি ইত্যাদির চর্চা করে থাকেন পোশাকে, চুলের ফ্যাশনে, তারা আসলেই কতটা মানবিক গুণের চর্চা করেন? কতটা নারীবাদ এর মূল ভাবটা ধারণ করেন?

আর সমাজে যখন এইসব আবাল-আগাছায় ভরে যায়, তখন সত্যিকার অর্থেই আমাদের পূর্বসুরী যারা নারী স্বাধীনতা বা মানবিকবোধের চর্চা করে গেছেন, তাদের সেই আন্দোলনকে কতটুকু এগিয়ে নিতে পারে এই আগাছার দল?

নারী-পুরুষ এর মতো হিজড়াও আর একটি লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্য ছাড়া কিছু তো নয়। হতে পারে তারা সন্তান ধারণে ভূমিকা রাখেন না। শুধু এই কারণেই কি এতোটা হেয় প্রতিপন্ন হোন তারা? মানবসভ্যতাকে (শুধুমাত্র জন্মদান প্রক্রিয়ায়) এগিয়ে নিয়ে যাবার পথে তাদের কোন ভূমিকা নেই, এই জন্যই কি সমাজ, রাষ্ট্র এতোটা নির্দয়, নির্মম তাদের প্রতি?

যদি তাই হয়, তবে নারীর প্রতি কেন এখনও এতো অত্যাচার, নিপীড়ন, নৃশংসতা? এর একটি সুক্ষ্ম রাজনৈতিক কারণ আছে। যে রাজনীতি নারীকে তুমি মহান, তুমি মাতা বলে পরমুহূর্তেই তাকে বেশ্যা বলে ডাকছে, সেই একই রাজনীতি একজন হিজড়াকে তার জন্মের জন্য দোষারোপ করে, জাতিগতভাবে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করে। তাই যারা নারীবাদের চর্চা করেন, তাদের লেখা, আলাপে খুব সতর্কভাবেই এই রাজনীতিটা মাথায় রাখা উচিত। নারীবাদ কখনও কোন জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্রকে হেয় প্রতিপন্ন করে না। বরং এই পৃথিবীর সকল প্রাণীকূল ও প্রকৃতির প্রতিই নারীবাদ এর রয়েছে প্রচ্ছন্ন ভালোবাসা। কোন পুরুষের প্রতিও যদি কোন অন্যায় অমানবিক আচরণ কোনো নারী করে থাকে, সেটাও নারীবাদ মেনে নেয় না।

নারীবাদ প্রকৃতিনির্ভর ,মানবিক এক জীবনবোধ। যা নারীর প্রতি ঘটে যাওয়া অন্যায় এর প্রতিবাদ এর পাশাপাশি এই পৃথিবীর সকল অমানবিক আচরণের প্রতিবাদ করে। কে বড়, কে ছোট, কে হিজড়া বা কে পুরুষ এইসব ছাপিয়ে একজন “মানুষ” সে এই পরিচয়টাই নারীবাদ এর কাছে মুখ্য।

নারীবাদ যেমন করে একজন মানুষকে তার অস্তিত্ব রক্ষায় তার পাশে দাঁড়ায় ঠিক তেমনি একটি গাছ বা প্রকৃতি রক্ষায়ও সে সোচ্চার হয়। নারীবাদ, প্রকৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার পক্ষেও কথা বলে। নারীবাদ বিশ্বাস করে এই পৃথিবীর সকল প্রাণ এর তার নিজস্বতা নিয়ে এই পৃথিবীতে বেড়ে উঠার অধিকার আছে। ঠিক যেমনভাবে একজন নারীর প্রতি হওয়া অন্যায়কে, সামাজিক অবমাননাকে নারীবাদ মেনে নেয় না, ঠিক তেমনি এই সমাজের কী পুরুষ, কী হিজড়া, কী বৃক্ষ সকল প্রাণ এর প্রতিই সমান শ্রদ্ধা পোষণ করে নারীবাদ।

শেয়ার করুন:
  • 199
  •  
  •  
  •  
  •  
    199
    Shares

লেখাটি ৩৩৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.