‘পরকীয়া’- জীবনের অদ্ভুত এক বেসুরো সুর!

0

লতিফা আকতার:

পরকীয়া এমন একটি সুর যা দুইজন ব্যক্তির কানে মধুর হয়ে এলেও অনেকের জীবনে সেটা বেসুরো হয়েই বাজে। নিয়ে আসে ভাঙ্গন।

পরকীয়া আমাদের জীবনে অপরিচিত তো নয়ই, বরং বেশ পরিচিত এবং বহুল আলোচিত একটা শব্দ। পরকীয়া ‘প্রেম’ কিনা এ নিয়ে বহু তর্ক-বিতর্ক রয়েছে। কেউ এর পক্ষে বেশ জোরালো যুক্তি দাঁড় করান। পরকীয়াকে প্রেমের তকমা দেন। তেমনি পরকীয়ার বিপক্ষেও হাজারও যুক্তি আছে। সেটা ধর্ম, এবং সমাজ এবং সম্পর্কের নিয়ম দ্বারা সমর্থিত।

পরকীয়ার পক্ষ-বিপক্ষে হাজারও যুক্তির বাইরে দাঁড়িয়ে একটা বিষয় বুঝেছি- এটা একটা চাহিদা। সে চাহিদা মনের, শরীরের। উপমহাদেশের এই সমাজে মানুষের মন- শিল্প, সাহিত্য, ধর্মের প্রভাবে মিশ্রিত অদ্ভুত এক মিথস্ক্রিয়া। এ সমাজের নারী- পুরুষ বড় হয়ে ওঠে হাজারো নিষেধ এবং দায় মাথায় নিয়ে। এবং নিজের মন কে বুঝে ওঠার আগেই তাদের অন্যের মনকে বুঝে চলতে হয়।

এই বুঝে চলা না চলার মধ্য দিয়ে সে বড় হয়ে ওঠে। সমান্তরালভাবে আর একটা বিষয় বেড়ে ওঠে সংসার নামক প্রতিষ্ঠানের পাঁচজনের প্রতি কর্তব্য। এই কর্তব্যের দশ-পাঁচটা ছবি মনের মধ্যে যতোটা স্পষ্ট, ততোটা স্পষ্ট তার মানস কন্যার ছবি নয়। বসন্ত নিয়ে স্বপ্ন থাকলেও বসন্তের বাতাসকে উপলব্ধি করতে পারে ক’জন? সে সুযোগই বা কোথায়?? আর সুযোগ না থাকার কারণে সত্যিকার প্রেম কী জিনিস তা অনেকেরই অজানা থেকে যায়। শুধু জানা থাকে সংসার নামক একটি কাঠামো এবং তাতে টিকে থাকা।

আর যখন সুযোগ আসে তখন তাঁর মনে উঁকি দেওয়ার সময় নাই। হয়তোবা উঁকি দেওয়ার প্রয়োজনটা উপলব্ধি করে উঠতে পারে না। এ সমাজে বিবাহের জন্য পরিবারের সদস্যরা সঙ্গী নির্বাচন করে থাকে। আর সে নির্বাচনে ব্যক্তির মননের চেয়ে তাঁর বাহ্যিক এবং পৈর্তৃক অবস্থানের উপর বেশি জোর দেওয়া হয়। অচেনা দু’জন সংসার নামক নৌকায় উঠে পড়ে। কেউ কেউ অবশ্য নিজের মনকে প্রাধান্য দিয়ে সঙ্গী নির্বাচন করে। কিন্তু তাতে অধিকাংশ সময়ই পরিবারের সম্মতি পাওয়া যায় না। সে আর এক বিপত্তি। নিজেদের মনকে বাদ দিয়ে সবার মন রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়তে হয়।

সকল ব্যস্ততা কাটিয়ে মানুষ যখন স্থির হয় তখন সে পিছন ফিরে তাকায়। পাঁচজনের মন রক্ষা করা ব্যক্তি তার হারিয়ে যাওয়া বসন্তকে খুঁজে ফিরে। আর বসন্ত ছুঁয়ে ছুঁয়ে সংসার জীবনে প্রবেশ করা ব্যক্তির চারদিকে অপরিণত বয়সের ভুল ত্রুটি উপলব্ধি করে। কেউ কেউ হাহাকার অনুভব করে মনের মাঝে।

আর এই হাহাকারে শীতল বাতাস হয়ে আসে পরকীয়া। যদিও সবার জীবনে এই শব্দের আবির্ভাব হয় না। প্রেমিকা স্ত্রী, বাবা মায়ের পছন্দ করা মেয়ে স্ত্রী- এক সময় সন্তানের মা হয়ে ওঠে। আবার নারীর দিক দিয়েও তাঁর পছন্দ করা সঙ্গী- কর্মী পুরুষ, সন্তানের পিতা। জীবনের বিভিন্ন ধাপের পরিবর্তনকে যে প্রাণ ভরে আপন করে নিতে পারে, তাঁর ভালোবাসা ফুরিয়ে যায় না বা নিত্য নতুন রুপ নিয়ে কড়া নাড়ে না। এই কড়া নাড়া অধিকাংশই শুরু হয় মধ্য বয়সের স্থির জীবনে এসে। সকল সমস্যার কম বেশি সমাধান হয়ে যাওয়ার পর। স্থির জীবনে এসে সংগ্রামের সেই সময়টা ভুলে গিয়ে মানুষ হারিয়ে যাওয়া বসন্ত খুঁজে। সন্তান লালন পালনে ব্যস্ত স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে মনে হয় ও আর এখন আমাকে বুঝে না। আগের মতো নাই। তেমনি নারীও বুঝতে চায় না জীবনের মূল্যবান সময়ে নিদারুণ মানসিক দু:শ্চিন্তা নিয়ে, চারদিক এক করে ফেলা লোকটি মূলত সংসারকেই ভালোবাসে। কিন্তু ব্যস্ততার মধ্যে চাপা পড়ে যায় তার প্রকাশ।

আর তখন আসে দায়িত্বহীন এক সম্পর্ক পরকীয়া। দায়িত্বহীন এজন্য যে তাকে কোনো কিছুর দায় নিতে হয় না। শুধুই ভোগ। সেটা সময়ের বা জৈবিক হতে পারে। কিংবা উভয়ই। বিবাহিত নারী বা পুরুষ তার শারীরিক চাহিদা পূরণ করার জন্য কাছাকাছি আসে। যদিও শুরু হয় মানসিক চাহিদা এবং বন্ধুত্বের নামে। শুরুতে কমন একটা কথা- আমার সঙ্গী আমাকে বুঝতে পারে না। যদিও এই সম্পর্কের পরিণতি শরীরে। পরকীয়ার বহুকালের প্রচলিত, সংজ্ঞায় যতক্ষণ বিবাহিত ব্যক্তির এই প্রেমের সম্পর্ক শরীরে না পৌছায় সেটা যতোক্ষণ পরকীয়া নয়। এসব করা হয় সংসার নামক সামাজিক এক সাইনবোর্ডের আড়ালে। আর আড়ালে করা এই প্রেম এক এডভেঞ্চার। অন্যের নজর ফাঁকি দিয়ে, অন্যের নাকের ডগার উপর বসে কিছু করতে পারার আলাদা এক উত্তেজনা।

আর এই উত্তেজনায় বহু সঙ্গী’র, মানুষের জীবনের সুর বদলে যায়। প্রেম কে সঠিকভাবে উপলব্ধি করে বড় না হওয়া কিংবা সংসারের পাঁচজনের মতামত কে গুরুত্ব দেওয়া ব্যক্তি পরকীয়াতে প্রেম খুঁজে। কিন্তু ব্যক্তির এই খুঁজে ফেরা আর কারো জীবনে তামাশা হয়ে আসে। সমাজের চোখে সে হেরে যাওয়া একজন।অথচ সংসার এর প্রতি মনোযোগী ঐ ব্যক্তি বুঝে উঠতে পারে না তাঁর দোষ কোথায়?

সবচাইতে বড় বিপদ আসে সন্তানের জীবনে। সব কিছু বেসুরো হয়ে বাজে। একজন সঙ্গী হিসেবে সঙ্গীর কর্মের কারণে এই ভয়াবহ বেসুরো সুর তাঁকে শুনতে হয়, অকারণে অসম্মান বয়ে বেড়াতে হয়।

পরকীয়ায় লিপ্ত ব্যক্তি নিজেও জানে তাঁর এই সুর বেশি দিন বাজবে না বা সবার সামনে বাজানো সম্ভব নয়। তাই সংসার নামক সাইনবোর্ডকে সে একবারেই ভেঙে গুড়িয়ে দেয় না বা নামিয়ে ফেলে না। কিংবা এই সমাজের চারদিকের চাপে দুর্বল মেরুদণ্ড নিয়ে বড় হওয়ার কারণে দিনশেষে নিরাপদ আশ্রয় হারানো বা অভ্যস্ত সম্পর্ক ছেড়ে নতুন সম্পর্কের অনিশ্চয়তা নিতে পারার মানসিক জোর না থাকার কারণে অধিকাংশ পরকীয়া কখনো কীয়া হয়ে উঠতে পারে না।

পরকীয়ায় লিপ্ত ব্যক্তির শরমিন্দা হওয়ার বোধ একটু কম থাকে। কিংবা বার বার প্রেমে পড়তে পারার আত্মবিশ্বাস থেকে নিজেকে প্রেমিক মানুষ হিসেবে খুঁজে পেয়ে গর্ববোধ করে। কিংবা নিজের দুর্বল মুহূর্তের কৃতকর্মের দায়ভার সঙ্গী’র উপর চাপানোর বিশাল গুণ থাকতে পারে। তাই বলে সঙ্গীটির জীবনে বা সন্তানের জীবনে যে লজ্জা আনলেন, মানসিক অশান্তির যে বে-সুর বাজালেন তার দায়ভার কিন্তু আপনারই। তা কোনো কিছু দিয়ে ঢাকার নয়।

মূল্যবোধ প্রেমের ক্ষেত্রে সাজে না। কিন্তু মানুষ হিসেবে নুন্যতম দায়িত্ব থাকতে হয়। আর পরকীয়া রত ব্যক্তি কিংবা এ সমাজে সংসার করা মানুষ কয়জন প্রেম বোঝে?? আর একটা বিষয় “দায়িত্ব”- যাকে আপনি প্রেমের নামে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে চাচ্ছেন- মনে রাখবেন তার জন্ম ও কিন্তু প্রেম থেকে ই। নিজেকে যতো বড় প্রেমিক মনে করেন না কেন – বাস্তবিক অর্থে আপনি একজন দায়িত্ব এড়ানো কাপুরুষ বা কামহিলা। যাঁর প্রচেষ্টা থাকে শুধুই নিজের জীবন ভোগ করার। ভোগ নয় মানুষ হিসেবে জীবন উপভোগ করুন- সঠিক সুর হয়ে, বেসুরো হয়ে নয়।

শেয়ার করুন:
  • 3.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    3.1K
    Shares

লেখাটি ১৬,২৬৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.