‘মানসিক নির্যাতন’-নারীর মেরুদণ্ড ভাঙার এক হাতুড়ি

0

লতিফা আকতার:

পৃথিবী এগিয়ে গেছে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আর এই এগিয়ে যাওয়া তো মানুষের হাত ধরে এসেছে। সেখানে নারী-পুরুষ সমভাবে না হলেও শিক্ষা মননে প্রায় কাছাকাছি অবদান রেখেছে। যে নারী কাজের জন্য বাইরে যায় না তারও যথেষ্ট অবদান রয়েছে। গৃহের পাঁচজনের মানসিক শান্তি নিয়ে কর্ম করার পেছনে তাঁর যথেষ্ট ভূমিকা। আর কর্মজীবী নারী ঘরে-বাইরে পরিশ্রম করে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমান ভূমিকা রাখছে। এর সংখ্যা এখন আর নেহায়েত কম নয়।

এগিয়ে যাওয়া বিশ্বে সবকিছুতে নতুন নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যাপক সাফল্য যেমন এসেছে তেমনি এর ব্যবহারকারীর জীবন ধারায়ও এসেছে পরিবর্তন। সেই পরিবর্তিত জীবন ধারায় নারীর জীবনে অত্যাচারের নতুন মাত্রা হিসেবে যোগ হয়েছে মানসিক নির্যাতন। এই নির্যাতন ব্যক্তির জন্য এক নতুন যন্ত্রণা। আর এই যন্ত্রণা ভোগ করতে সমাজে বিভিন্ন স্তরে।

জন্ম হতে শুরু।
মেয়ে? এর পিছনে টাকা খরচ মানে তো পুরোটাই লোকসান।
কালো- বিয়ে হবে?  বিয়ের সময় তো এক গাদা খরচ। পৈতৃক সম্পত্তিতে অধিকার আদায়ের চেষ্টা করা মেয়ে তো বাপ-ভাইকে ভালোবাসে না। মেয়েকে সম্পত্তি দেওয়া মানে তো এক অর্থে পরের ছেলের পাওয়া। ঘর দিয়ে দিয়ে শুরু হয়ে বাইরের জীবনেও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত।

আর এই অত্যাচারের বিস্তৃতি সর্বত্র। স্ব অর্জনে কর্মস্থল এর ব্যতিক্রম নয়। নারী আবার বস হয় নাকি! নারী সে যতো বড় অফিসার হোক না কেন, কাজ-কর্ম পুরুষের চেয়ে কীভাবে বেশি বোঝে? কাজের ভুল ধরে বকাবকি করা মানে স্বামীর সাথে ভালো সম্পর্ক নাই। সংসারে অশান্তি। তাই অফিসে এতো মেজাজ। ভালো জায়গায় পোস্টিং পাওয়া মানে উপরে ভালো যোগ আছে। নারী হলে তড়তড়িয়ে উপরে ওঠা সম্ভব। আরও হাজারও মন্তব্য। যদিও বসের সামনে এসব আলোচনা হয় না। সে সাহসও নাই। কিন্তু অন্য নারী কলিগের সামনে এই রাজা উজির মারা মানুষগুলো এক অর্থে নারী কলিগকে মানসিক নির্যাতনই করে। বিস্তারিত বলতে গেলে সাতকাহন হয়ে যাবে।

যৌথ জীবনে নারী আজকাল শারীরিক নির্যাতনের চেয়ে মানসিক নির্যাতনের শিকার বেশি হয়। যৌতুক প্রথা বিলুপ্ত প্রায়। সুশীল মধ্যবিত্ত সমাজের তথাকথিত সুশীল লোকজন বিয়েতে যৌতুক নেন না। গিফট নেন। আর কন্যার প্রতি বাবা মায়ের ভালোবাসার প্রতিযোগিতা হয় গিফটের সাথে। ছেলের পছন্দের বিয়েতে গিফট না পাওয়া লোকজন তা উসুল করে কথার মারপ্যাঁচ দিয়ে। বউয়ের কমতি খামতির চেয়ে তাঁর পিতৃকুলের কমতি খামতি যত্ন সহকারে তুলে ধরা হয়। সঠিক শিক্ষার অভাব বা অতি চালাক বলে তাদের ছেলের গলায় ঝুলে পড়েছে। আর তাদের বাড়ির মেয়েগুলোর মাথায় কোনো ঘিলু না থাকায় সম্ভব হচ্ছে না।

এ সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষ নিজেকে আপনা-আপনি এক সুপিরিয়র অবস্থানে বসিয়ে নিয়েছে। একতরফা ভাবে স্বঘোষিত উচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত মানুষগুলো কখনোই নারীকে তার সমান্তরাল ভাবতে চায় না, ভাবতে পারে না। তারা মস্তিষ্কে এই নিয়ে বড় হয়েছে যে- নারী কখনোই বেশি বুঝতে পারে না। অফিসের বস বুঝলেও ঘরের বউ তো একেবারেই না। আর ঘরের বউ যদিও বা বুঝে ফেলে তাহলে শুরু হয় যন্ত্রণা। সে যন্ত্রণার অদৃশ্য আগুনে পুড়িয়ে মারা হয় নারীকে। তার নাম মানসিক অত্যাচার। এমন সব বহু কাজ রয়েছে যার জন্য বউটি নিজে সরাসরি দায়ী নয়। তারপরও তা নিয়ে কথা শোনাতে ছাড়ে না।

যাই হোক, রাস্তা ঘাটে বের হলে নারীকে শারীরিক তো অবশ্যই, মানসিক নির্যাতনের শিকারও হতে হয়। সে অত্যাচারী ব্যক্তি দোকানদার হতে শুরু করে রিকশা চালক, সহকর্মী, বস যে কেউ হতে পারে। প্রযুক্তির যুগে নিত্য নতুন বহু শব্দ প্রচলিত আছে। কিন্তু সেসব শব্দ একটু এদিক ওদিক ঘুরিয়ে কী সুন্দর করে নারীর জন্য যন্ত্রণাদায়ক সুড়সুড়িমূলক করে তোলা যায় তা এ যুগের পুরুষ জানে। আর মানসিক অত্যাচারের এ এক নতুন সংযোজন।

নির্যাতনের সকল হাতিয়ার ব্যবহার করে অভ্যস্ত ঘরে বাইরের পুরুষ কী কখনো চিন্তা করেছেন মুদ্রার পিঠ উল্টে গেলে কি হবে? সেদিন হয়তো বা আর খুব বেশি দূরে নয় যেদিন নারী আপনার প্রয়োগকৃত টেকনিক আপনার উপর প্রয়োগ করবে। বাসে নারী যাত্রীর পাশের সিটকে বাড়ির সোফা ভেবে হাত পা ছড়িয়ে বসার অভ্যাস ত্যাগ করুন। না হলে নিজেকে হয়তো বাসের সিটে নয়, ফ্লোরে খুঁজে পাবেন। চোখ দিয়ে চাটা বন্ধ করুন। নাহলে হয়তো এই সুন্দর পৃথিবী দেখার জন্য এক সময় চোখ খুঁজে পাবেন না। স্মার্ট ফোনের যাচ্ছেতাই ব্যবহার করা বাদ দিয়ে দিন। কেননা এই ফোনের ব্যবহার একজন নারীও জানে।

শেয়ার করুন:
  • 3.8K
  •  
  •  
  •  
  •  
    3.8K
    Shares

লেখাটি ৪,১৭৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.