বিয়ে সর্বরোগের উপশম নয়

শাহরিয়া খান দিনা:

ছোটবেলায় বাংলা ব্যাকরণ পড়তে গিয়ে “সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দিব কোথা”- বাক্যটির সাথে আমরা সবাই পরিচিত হয়েছি। আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে আমরা কিন্তু সর্বরোগের ওষুধ অনেক আগেই আবিষ্কার করে ফেলেছি। অবাক হচ্ছেন? নাহ! আমি ওষুধ হিসেবে ফুটপাতে কবিরাজদের বিক্রি করা জোঁকের তেলের কথা বলছি না। তবে এটাও ঠিক যে দেশে জোঁকের তেল সর্বরোগের ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সে দেশের কিছু লোকদের মধ্যে বিশাল সমস্যা তো আছেই। তো এই সর্বরোগের মহাঔষধের নাম হচ্ছে ‘বিয়ে’।

মেয়ে পড়াশোনায় ভালো করছে না?
– বিয়ে দিয়ে দাও।

ছেলে কাজকর্ম করছে না?
–বিয়ে দিয়ে দাও।

ছেলের ক্যারিয়ারের ধারাবাহিতা নেই?
–বিয়ে দিয়ে দাও।

ছেলে নেশাখোর?
–বিয়ে দিয়ে দাও। ঠিক হয়ে যাবে।

মেয়ে/ছেলের আচরণগত বুদ্ধিগত সমস্যা আছে?
–বিয়ে দিয়ে দাও।

আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশি তথা সামাজিক প্রাণীদের দ্বারা প্রেস্ক্রাইব করা এই সর্বরোগের ওষুধ তাদের নির্ধারিত সময়ে খাওয়ানো হলেই কি সব ঠিক হয়ে যায়? বাংলা সিনেমার শেষ দৃশ্য কিংবা রূপকথার গল্পের শেষ লাইনটির মতো “অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো” ব্যাপারটা কি তেমনি হয়? নাকি এখান থেকেই শুরু হয় আরেকটি ভয়াবহ হরর গল্পের? যেখানে স্রেফ দুর্ভাগ্য ক্রমেই জড়িয়ে যায় কিছু নিরাপদ জীবনের সাথে আর খেসারত দেয় কিছু নিষ্পাপ প্রাণ।

এদেশে বিয়ে মানে অনেক সত্যের লুকোচুরি আর অনেক লোকদেখানো মিথ্যের বাহাদুরি। বিত্ত-বৈভব, সামাজিক স্ট্যাটাস দেখে বিয়ে হয়। ছেলে অথবা মেয়েটার মন দেখে নয়। কে কবিতার ছন্দ মিলাতে গিয়ে রাত পার করে, আর কে রোবট বানাবার স্বপ্নে বিভোর থাকে, জানা হয় না। ছেলেটার হিমালয় প্রিয় তো মেয়েটার সাহারা মরুভূমি, তাতে কার কী? ফলাফল দু’জনার যোজন যোজন মানসিক দূরত্ব।

আবার ধরেন, যে ছেলেটি নেশাগ্রস্ত তার পরিবার যথাসম্ভব গোপনীয় রাখে তার এই বাজে অভ্যাসটি। যদি খুব চালাক-চতুর না হয়, আর এরেঞ্জ ম্যারেজ হয়, তাহলে বউটা যতদিনে আসল চেহারা জেনে যায়, ততদিনে তার আর কিছু করার থাকে না! নিত্যকার অশান্তি যখন এ’কান থেকে ও’কানে গড়ায়, তখনই আবার সেই আগের মতোই সামাজিক শুভাকাঙ্ক্ষীরা হাজির হয়ে যান। এবার ভিন্ন উপদেশ, আরেহ! একটা বাচ্চা নাও তো, সব ঠিক হয়ে যাবে। তারপরও যদি ঠিক না হয়, তখন ‘বউ’ এরই দোষ, সেই তো ওকে ধরে রাখতে পারলো না! ভালবাসা দেয়নি বলেই তো আমাদের অমন ভালো ছেলেটা ঘরে থাকলো না!

এই সব ঠিক করে দেয়া পরামর্শগুলি আসলে সব এলোমেলো করার প্রথম ধাপ। স্টুডেন্ট লাইফ থেকেই দেখবেন আপনার পড়ার বিষয় এবং প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আপনি যতটা অজ্ঞ, অন্যরা ততই বিশেষজ্ঞ। তাদের দূরসম্পর্কের লতাপাতায় প্যাঁচানো আত্মীয়ের সন্তানও আপনার চাইতে কত যোগ্য তা জেনে আপনি ধন্য হোন বা না হোন, কিন্তু জানানো হবেই আপনাকে।

এরপর পড়ালেখা শেষ, তো চাকরি করছো না কেন? চাকরি হলো, তো বিয়ে করছো না কেন? বিয়ে হলো, তো বাচ্চা নিচ্ছো না কেন? বাচ্চা নিলেন, তো আরেকটা নিচ্ছো না কেন? এই ‘কেন’ চলতেই থাকবে। আমাদের সবার জীবনে হাজারও সমস্যা, তবুও আমরা অন্যের সমস্যার সহজ সমাধান দিয়ে ফেলি।

গতানুগতিক প্রশ্ন আর তথাকথিত সামাজিক পরামর্শকে পাত্তা না দিতে শেখাটা জরুরি। আমার জীবন আমার মতো। অন্যে এটা করছে তাই আমারও করতে হবে তার মানে নেই। আমাদের প্রত্যেকের জীবনের গল্প, সামাজিক, পারিবারিক অবস্থান একরকম নয়। একরকম নয় চিন্তাভাবনা। আমি কীরকম জুতো পায়ে জীবনের পথ হেঁটেছি, সেটা আমি জানি। কীভাবে জীবন সাজাবো, সেটা একান্তই আমার ইচ্ছা এবং আমার নিয়মে, কোন সামাজিক প্রেশারে নয়।

অভিভাবকদের প্রতি বিনীত অনুরোধ, প্রয়োজনে ফ্রিতে আলকাতরা পেলে নিয়ে নেন, তবুও কোন সমস্যার সমাধান হিসেবে ফ্রি উপদেশের বশবর্তী হয়ে সন্তানকে বিয়ে দিবেন না। এতে সমস্যার সমাধান হয় না, বরং আরও অনেকগুলো নতুন সমস্যার তৈরি হয়। এক্ষেত্রে বেশিরভাগ পরিবারেই ভাঙ্গন অবশ্যম্ভাবী। ভুক্তভোগী হয় ওই সংসারে জন্ম নেয়া শিশু সন্তানগুলি। আপনাদের কোন অধিকার নেই অন্যের জীবন ধ্বংস করার!

বিয়েই মানবজন্মের একমাত্র লক্ষ্য উদ্দেশ্য নয়। যদি কোন শারিরীক-মানসিক সমস্যা থেকেই থাকে তার বিয়ে করতেই হবে এমন কোন কথা নেই। দোষত্রুটি গোপন করে নয়, বরং সত্যিটা জানিয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া সম্পর্কের প্রতি আন্তরিকতা এবং শ্রদ্ধাশীল সততার প্রমাণ। যখন দুইটা মানুষ উপলব্ধি করবে এবং সামর্থ্য লাভ করবে, “হ্যাঁ আমরা একটা পরিবার গড়তে চাই বাকিটা জীবন একসাথে পার করার জন্য”, বিয়েটা তখনই হোক।

এখনও আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটা মানুষ বিকারগস্ত, নেশাখোর, টাউট-বাটপার যাই হোক, চিকিৎসা একটাই বিয়া করাও, বাচ্চা নাও। পরিবার গঠন এবং প্রতিপালনের মতো আর্থিক, মানসিক, শারিরীক সামর্থ্য না থাকলে তার বিয়ে করতেই হবে কেন? কতগুলো জীবন বিপন্ন করার দায়টা কি সমাজ নেয় কখনো?

শেয়ার করুন:
  • 1.5K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.5K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.