বাসায় গিয়ে রান্নাটা রেডি পান তো?

0

ফারজানা নীলা:

“মেয়েরা শুধু স্বার্থের বেলায় নারীবাদী। স্বার্থের বেলায় সমঅধিকার খুঁজে”- বহুল ব্যবহৃত এই কথাটা শোনেনি এমন অধিকার সচেতন নারী কমই আছে।

আপনার অফিস শেষ হয় সন্ধ্যায় ৫টায়। আপনার ছেলে কলিগের ছুটি হয় আরও এক ঘণ্টা পর। তখন আপনাকে উপরের লাইনের মতো কিছু ব্যঙ্গ কথা শুনতে হবে।

হ্যাঁ, কথাটা আসলেই ঠিকই। মেয়েরা ঢ্যাঙ ঢ্যাঙ করে আগে আগে চলে যাবে, আর ছেলেরা অতিরিক্ত পরিশ্রম করবে, এ তো হয় না। আপনি নারী পুরুষের সমতা চাইবেন, আবার নিজে অতিরিক্ত সুবিধা পাবেন, তা তো অন্যায়।

আফসোস শুধু ছেলেরা এই বাড়তি সময়ে অফিসে থেকে কী সুবিধা পায় সেটা দেখে না। তারা সুবিধা পায় এই যে বাসায় গিয়ে রান্নাটা রেডি পায়। চা’টা গরম পায়। শুয়ে শুয়ে টিভি দেখতে পায়। সকালে উঠেও তারা নাস্তাটা রেডি পায়।

অফিসের কাজ সেরে তাদের বাড়ির কাজ করতে হয় না। কেননা বাড়িতে তাদের বউ তো আছেই। বউও যদি অফিসে কাজ করে, করুক। কিন্তু বাড়ির কাজ বউকেই করতে হবে। এতে নো সম-টম অধিকার!

যে মেয়েদের দেখিয়ে ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘আহা যদি মেয়ে হতাম, তাড়াতাড়ি ছুটি পেতাম”, সেই মেয়েরা যে বাসায় গিয়ে আপনাদের মতো গা এলিয়ে দিয়ে টিভি দেখার সময় পায় না, সেই খবর রাখেন? আপনি তো জনাব সকালে উঠেই টেবিলে নাস্তা সেরেই দৌড় দেন অফিসে। দৌড় দেওয়ার আগে ভেবেছেন, আপনার স্ত্রীও অফিসে যায়, কিন্তু সে আপনার কত আগে বিছানা ছেড়েছে? কত ঘণ্টা আপনি ঘুমিয়েছেন, কত ঘণ্টা আপনার কর্মজীবী বউ?

হিসেব করেননি তো কখনও? করবেন কীভাবে, আপনি তো দেখেন কেবল কত আগে তারা অফিস ছুটি হয়, আর আপনাদের কত পরিশ্রম করতে হয়! আহ!

ঘর সামলান, বাচ্চা সামলান, রান্না সামলান এই সবে আপনারা সাহায্য করেন তো? কিন্তু পরেরদিন তো বলতে শুনি, “কালকের খেলাটা দারুণ হয়েছিল”। বাসার কাজে সাহায্য করলে তো এই কথাটা বলতে পারার কথা না।

সমতার কথা বলে এমন বাড়তি সুবিধা তাহলে অফিস নোটিশ দিয়ে বন্ধ করে দেন। এরপর দুজনই রাত করে বাসায় ফেরেন। রাত করে দুজনই মিলেমিশে রাঁধেন। রাত করে ঘুমান। দেরি করে সকালে উঠেন, দেরি করে অফিসে যান।
পারবেন?

একদিনও পারবেন না। কারণ সমতা আপনারাই চান না। সমতা চাইলে সকল কাজ একসাথেই মিলেমিশে করতেন। সমতা চাইলে বাসার কাজেও সমতা আনতেন। সেটা ঠিক আপনাদের আঁতে পোষায় না। ছেলে জাত তো! ছেলেদের অফিস ফেরত পায়ের উপর পা দিয়ে চা না খেলে, খাবারে লবণ কম হয়েছে না বললে, সকালে ঠিকঠাক নাস্তা না পেলে গলা উঁচু করতে না পারলে পুরুষত্ব জাগে না।
বাড়তি কাজের চাপ না দেখে আপনারা বাড়তি সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তুলেন খুব মূর্খের মতো।

বাসে মেয়েদের আলাদা সিট আছে কেন এটা নিয়েও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন আপনারা বিজ্ঞ পুরুষগণ। কখন গায়ে বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কুৎসিত ছোঁয়া পাননি তাই বুঝেন না আলাদা করে বসতে কেন বাধ্য হয় মেয়েরা!

“রাতে তো মেয়েরা কাজ করতে পারবে না, মেয়েরা কি সব পারে নাকি” বলে নাক কুঁচকানো স্বভাব যেন আপনাদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য।

হ্যাঁ, ঠিক তো মেয়েরা তো অবলার বংশধর। তারা রাতে বাইরে কাজ করতে কীভাবে পারবে? আচ্ছা কেন পারে না? সেটা কি ভেবেছেন কোনোদিন? আরে ধুর, ভাববেন কীভাবে? এতো সময় কই আপনাদের? আপনারা তো অতিরিক্ত পরিশ্রম করেন।

সময় বের করে কোন এক ছুটির দিনে ভেবে দেখবেন যে আপনাদের মতই দেখতে কিছু পুরুষজাত তাদের ধর্ষণ সাথে বোনাস হিসেবে হত্যা করে ফেলে রেখে যায় বলে তারা পারে না রাতে বের হতে।
আপনারা তো “সব পারেন” পুরুষজাত। তাহলে ধর্ষণটা বন্ধ করতে পারেন না? সেখানে আপনরা বড্ড অলস। নাকি সেটা আপনাদের আয়ত্তে নেই বলে পৌরুষে ঘা লাগে না! নাকি সেখানেও ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে চেষ্টা করেন যে মেয়েদের কারণেই ধর্ষণ হয়েছে!

শেয়ার করুন:
  • 522
  •  
  •  
  •  
  •  
    522
    Shares

লেখাটি ২,২২৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.