ধান কাটার গল্প

0

সালমা লুনা:

ধান কাটার মৌসুম শুরু হয়েছে। সবাই ধান কাটতে ছুটে যাচ্ছে গ্রামে। ছাত্র শিক্ষক সরকারি বেসরকারি কর্মকর্তারা ছুটে বেড়াচ্ছেন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া।

বাস, ট্রেন, দামি গাড়ি, নৌকা থেকে নেমে লোকজন ছুটছে, পরম মমতায় গোছা গোছা ধানের শীষ কেটে স্তুপ করছে।
তাদের লালপেড়ে সাদা সবুজ লুঙ্গি, চকচকে নতুন মাথাল, হাতে হাতে ঝকঝকে নয়া কাস্তে।
নামীদামী ফটোগ্রাফাররা ছবি তুলছেন, ফটোসেশন হচ্ছে। আহা!

সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদের কর্তামশাইরা আগে সরকারি কার্যোপলক্ষে ট্যুরে যেতেন। তখন তাদের গিন্নীরা যেভাবে ব্যাগ গুছিয়ে দিতেন, এখনো সেভাবেই তাদের কাপড় গুছিয়ে দিচ্ছেন। জামদানি ডিজাইনের লুঙ্গি, সাথে ম্যাচিং গামছা। আলাদা ব্যাগে কারুকাজ করা মাথাল। নানা ডিজাইনের কাস্তে।

শেভ করতে করতেই কর্তা হাঁক দেন, ওগো শুনছো? গতবারের ওই লাল পেড়ে লুঙ্গিটাও দিয়ে দিও। সাথে লাল গামছাটা। আঁখিকোনা থেকে নামিগঞ্জ যেতে হতে পারে।

ছেলেমেয়ে দ্বিতীয়বার এসে ঘ্যানঘেনিয়ে যায়, ‘মা পাপা যে যাচ্ছে, আমরা কবে যাবো?
তাদের মা কষে ধমক লাগায়, যাও ফার্মভিল খেলো গে। তোমাদের তো ধান কাটতে যাবার সময় আসেনি এখনো।
ছেলে তেড়িয়া হয়ে বললো, ‘আমি তো কলেজে পড়ি মা! আমার এখন আর ছোটবেলার সর্ষে ক্ষেতের মতো শুধু ফটোসেশন করার জন্য ধান ক্ষেতে যেতে ইচ্ছা করে না। লজ্জা লাগে। আমার বন্ধুরা অনেকেই যাচ্ছে এবার ধান কাটতে। আমিও এবারই যেতে চাই।’

মা বাবার ব্যাগ গোছানো রেখে ছেলেকে বোঝায়, ‘বাবা সামনের বছর ইউনিভার্সিটিতে উঠবে, তখন যেও। ফার্স্ট সেমেস্টারেই তোমার একটা কোর্স থাকবে ধান কাটার উপরে। সুবিধা হবে বাবা।’

ছেলে ঘাড় নেড়ে চলে যায়।

মেয়ে মাকে জিজ্ঞেস করে, মা, পাপা আর ভাইয়া ধান কাটতে যাবে, আমরা কবে যাবো?
মা হেসে ফেলেন, দূর বোকা! আমরা তো ধান কাটতে যাবো না। আমরা যাচ্ছি ধান সিদ্ধ করতে, ধান রোদে শুকিয়ে ঢেঁকিতে ধান ভানতে।

মেয়ে হাত তালি দিয়ে উঠে, যাবো? কী মজা!
মা, ঢেঁকী কী?
মায়ের ইচ্ছে করে বলতে, ঢেঁকী হলো ওই যে, যেটা সগ্গে গেলেও ইয়ে করে।

মুখে বলেন, ‘অবশ্যই যাবো। তোমার আন্টিরাও যাবে। তবে তুমি এবার গেলেও কিন্তু কিছু করতে পারবে না। শুধু মাঝে মাঝে পা দিয়ে ধান নেড়ে দিতে পারবে। আর লাঠি দিয়ে কবুতর শালিক বুলবুলি তাড়াবে।’
মেয়ে অবাক হয়, ‘কেন মা? ওদের তাড়াবো কেন? ওরা কী করেছে?’

মা বাবার ব্যাগ গোছানো শেষ করে ক্যামেরাটা চেক করে ঢুকিয়ে দিয়ে চেইন টেনে দিতে দিতে বলেন, ‘তা তো জানি না মা! ছবিতে দেখেছি লম্বা একটা বাঁশ দিয়ে ওদের তাড়ায়। সম্ভবত ওরা ধান খেয়ে ফেলে তো তাই।
এসময় কিছু একটা মনে পড়ে যায় মায়ের।

বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেবো কীসে! – আরে তাই তো! ধান খেয়ে ফেললে যে খাজনা দেয়া যায় না তাই তাড়ায়।
নাহ্, এটা এখন মেয়েকে বলা যাবে না। বললেই নানান প্রশ্ন করবে। ওকে এখন খাজনা ট্যাক্স এসব বোঝাতে গেলে ঝামেলা হবে।
সেটা ঠিক হবে না। তার এখনই একটু শপিংএ যেতে হবে। ধান মাড়াই এর পর উড়ানি দেয়ার জন্য একটা সবুজ ডুরে শাড়ি, সেদ্ধ করতে চুলার পাড়ে বসার জন্য একখানা লাল জরিপাড় শাড়ি, পা দিয়ে নেড়ে দেবার জন্য হলুদ তাঁতের শাড়ি কিনতে হবে। সাথে এক্সেসরিজ।

গুলশান ভড়ং নাকি এবার খুব ভালো ভালো ডোকরার গয়না এনেছে। অনলাইনেও কিছু মাদুলি তাগা দেখে রেখেছে। ওদের কাছে ধনেখালি কস্তা পাড়ের শাড়িরও একটা ওয়াইড রেঞ্জের কালেকশন এসেছে ধান উৎসব উপলক্ষে। আজই যেতে হবে। নইলে সব শেষ হয়ে যাবে। কে জানে, ভাবিরা সব চলেই গিয়েছে কীনা!

সে যে এইবার উৎসবের বিভিন্ন দিনে বিভিন্ন রঙের শাড়ি পরবে এটা কাউকে বলেইনি। খুব গোপন রেখেছে। সবাইকে একেবারে চমকে দেবে বলে
কর্তার জন্যও চুপিসারে অনলাইন থেকে জামদানী ডিজাইনের লুঙ্গি কিনেছে। তাদের দুজনকে সোসাইটিতে বেস্ট কাপল বলে। সেই হিসেবে এমনিতেই তাদের সবাই হিংসা করে। এরকম দেখলে তো আরো জ্বলবে সবাই।
করুক। সবাই জ্বলুক। ধান উৎসব বলে কথা!

ধান উৎসব হলো এখন জাতীয় উৎসব। এর প্রধান লক্ষ্য হলো ধান কাটা থেকে শুরু করে চাল তৈরি পর্যন্ত প্রতিটা ধাপকে শিল্পসম্মতভাবে জনগণের কাছে তুলে ধরা। দেশীয় ঐতিহ্যকে জিইয়ে রাখা।

যদিও এই উৎসব থেকে যে ধান পাওয়া যায় সেই ধানের কোনো দাম পাওয়া যায়না। এই ধান বিকোয় না। সারাদেশের ছাত্র, ব্যাঙ্কার, ডিসি, ছাত্রনেতাদের রোদে পোড়া ঘামসিক্ত এই ধান। ওদের দাম নিয়ে কোনো কথা নাই। চাল নিয়ে কথা নাই। ওই ধান আর চাল দেশের অমূল্য সম্পদ।

খাবার জন্য চাল অন্য দেশ থেকে আসে ট্রাককে ট্রাক। টনকে টন।
এ ধান আমাদের ভালোবাসার ধন। বড় আদরের, একতার ধান।
কারণ এই ধান কামার কুমোর ও তাঁতীদের পুণরায় ফিরিয়েছে নিজ নিজ পেশায়।
খটখট করে জেগে উঠেছে বাংলার তাঁত। দিনরাত গনগনে আগুন কামারশালে।

তাঁতীপাড়ায় বোনা হচ্ছে হরেক রকম লুঙ্গি। লালপেড়ে, নীলপেড়ে কস্তাপেড়ে এমনকি কাতান পাড় অলা লেটেস্ট ডিজাইনের লুঙ্গি পর্যন্ত। সাথে ম্যাচিং ম্যাচিং গামছা।
কামারশালেও তৈরি হচ্ছে নানা মার্কার কাস্তে। চারিদিকে উৎসবমুখর পরিবেশ!

এই উৎসবমুখর পরিবেশের শুরুতে অবশ্য কেউ কেউ একটু অখুশি ছিলো। কুমোর আর জেলেরা গালে হাত দিয়ে বসেছিলো।

অনেক ভেবেটেবে শিল্পমন্ত্রী কুমোর পাড়ার প্রধানকে ডেকে বললো, তরা এত ভাবতাছোস ক্যান! তোগর বুদ্দি নাই, এত এত লোক আসবো, তারা কি খাইবো না? বেবাক ফুটেল রেস্টুরেন্টে মাটির সানকি মাটির পাতিল পুতিলা ঢুকায়া দে না! তাইলেই তো হয়া গেলো। জাইল্লাগর কী হইবো? সেইটা ভাব!
নদী নালা খাল বিল পুস্কুনিতেও মাছ নাই। হেরা জাল ফালায়া কী টাইন্না তুলবো!
ফিরাবার দুইদিন পরপর নিয়ম কইরা জাল ফালানি বন্ধ কইরা দেয়। তখন তো হেগো ভিক্ষা করা লাগে!

কথা শুনে কাইল্লা জাইল্যা ফ্যাচফ্যাচ করে চোখের পানি মোছে।
কিন্তু তার বুদ্ধিতে কিছু কুলায় না।

মীনমন্ত্রী শিল্পমন্ত্রীর উপর বেজায় নাখোশ হয়ে কী যেন হিসাব করেন। তারপর হৈহৈ করে উঠেন, ‘আরে জাইল্যার ঘরের জাইল্যা, শহরে গিয়া ভিক্ষা করার চে এই যে এত শহইরা লোকজন আসবে তাদের আশেপাশে থাকলেও কিছু না কিছু রোজগার হয়ে যাবে তোদেরও।
তোরাই বরং বেশী রোজগার করবি। কাঁচা টাকা পাবি।’

তাছাড়া খালি ধান কাটতে লোক আসবে তাতো না। শহরের নারী পুরুষ শিশুরা আসবে দুদফায় ধানক্ষেতে ফটোসেশন করতে।
একবার গাঢ় সবুজ ধানক্ষেতের সাথে আরেকবার পাকা ধানক্ষেতের সাথে। শহরের লোকজন কেমন তা তো সবাই জানে! সরিষা ফুটলে হামলে পড়ে ক্যামেরা নিয়ে, শিমুল ফুটলে দৌড়ে আসে, আম-কাঁঠাল পাকলেও দলে দলে ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলতে আসে।
ওদের ফুটফরমাস করলেও জেলেদের দিন চলেই যাবে। অন্তত জাল বন্ধ থাকলে শহরে রিক্সা চালাতে বা ভিক্ষা করতে তো যেতে হবে না!

লেখক: সালমা লুনা

সেই থেকে কুমোরের উঠোনের কোনের আগুন নিভছেই না, মাটির তাল ফুরোচ্ছেই না।
জেলেরাও অধিক দাদনে জাল আর নৌকা ভাড়ার খরচ থেকে বেঁচে গেলো। আবার যাদের নিজেদের নৌকা আছে তা দর্শনার্থীদের প্রমোদ বিহারে কাজে লাগালো।
ফলাফল হলো, বছরে ছমাস মাছ ধরা বন্ধ রাখায় খালে বিলে নদ নদীতে মাছ উপচে পড়ে। জাল ফেলার আগেই মাছ আপনি উড়ে এসে ধরা দেয়।
জেলেদের কালো মুখে সাদা হাসি ঝিলকায়। তাদের তো ডাবল রোজগার।
সবাই খুশি যে জেলেদেরও সফলতার সাথে জুড়ে দেয়া গেছে এই কর্মযজ্ঞের সাথে।

এখন গ্রামে গ্রামে কৃষক কামার কুমোর তাঁতী জেলে আনন্দে দিনাতিপাত করে।

এদিকে শহরে কোন ভিক্ষুক নাই। ফুটপাথে পলিথিনের ঘর নাই। রাস্তাঘাট ঝকমক করে। যানজট নাই বললেই চলে। সর্বত্র খালি আনন্দ আর আনন্দ। সুখ উপচে পড়ে।

মুখপোড়া নিন্দুকদের মুখে ঝামা ঘষে ধনধান্যে পুষ্পভরা দেশ তরতর করে উন্নত দেশ হয়ে যায়।
সকলে মিলে ধান কেটে যে সাফল্য এসেছে তা দেখতে দলে দলে বিদেশী পর্যবেক্ষক আসতে থাকে দেশে। কাটতে কাটতেও যে একটি দেশ এমন উন্নতি করতে পারে, তা সারা পৃথিবীতে এখন রোল মডেল।
ধান কাটা এভাবেই একটি দেশকে উন্নয়নের চরম শিখরে পৌছে দেয়।

শেয়ার করুন:
  • 78
  •  
  •  
  •  
  •  
    78
    Shares

লেখাটি ২৮৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.