আমি তো আমার গল্প বলছি (পর্ব-৪)

0

দেবী গাফফার:

উনি চলে গেলেন। দেখাও হয়নি, তখনকার প্রেম এমনই ছিলো। আমি জানতাম না আমার ভালবাসার ফলাফল কী দাঁড়াবে। আগামীকাল কী হবে আমরা কেউ জানি না।

তিন মাস পার হয়ে গেলো কোন চিঠি নাই। খবর নাই। পিয়ন এর অপেক্ষায় থাকি, আমার কোন চিঠি আসে না। এদিকে দুঃখ রয়েই গেলো। কোন অলৌকিকভাবে দুঃখ চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও দেখতে পাচ্ছি না।

চাচী ঢাকা থেকে কক্সবাজার গেলেন। একই অবস্থা। বললেন, ঢাকা চলো, কোন কথা শুনতে চাই না।একজনের খাওয়া তো বাঁচবে, পাশের বাসার খালার কাছ থেকে ২৫০ টাকা নিয়ে চাচীর সাথে রওয়ানা দিলাম ঢাকা।

দুই দিন পর মা ফোন করে জানালেন, উনার (মি. কক্স এর) তিন ভাই এসে মা’কে যা তা বলে গেলেন। এও বলে গেলেন, আমি যদি ওনাকে বিয়েও করি, আমার ভাইদের লাশও পাওয়া যাবে না। মা ফোনে বললেন, ‘আমি মা হয়ে তোমার পা ধরি, এই পৃথিবীতে তোমরা ছাড়া আমার কেউ নাই।তোমাদের দিকে তাকিয়ে আমি বেঁচে আছি। আমার বেঁচে থাকাটুকু কেড়ে নিও না’।

যে ভাইটা বেশি খারাপ ব্যবহার করেছিলেন, উনি মারা গেছেন। উনার বউ বাচ্চার অবস্থাও আমাদের ঐ সময়কার কাছাকাছি। উনার ভাইদের ওপর আমার কোন অভিযোগ নেই। ওই সময় উনাদের হিংস্রতা না দেখলে হয়তো আজকের দেবীর জন্ম হতো না। উনাদের জন্য দোয়া।

কে জিতবে? আমার ভালোবাসা? না দারিদ্র্যের ছোবল?

এই ঘটনা চাচী শুনে বলেন, তোমার একার সুখের জন্য ভাইদের জান যাবে, তুমি যদি তাই চাও যা খুশি করো। আর এক কাজ করতে পারো, বিয়ে করো, ভালো পাত্র আছে।

আমি আমার সাথে যুদ্ধ করি, আমার ভালবাসার বলি হবে আমার নিষ্পাপ মা ভাই। মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে মেজোমাকে বলি (চাচীকে মেজমা ডাকি), আমি বিয়ে করবো, কই পাত্র?

রাজীবকে মনে আছে? এতো ভালো ছেলে হয় না, প্রতিদিন আসে, ছোট চাচাতো ভাইটাকে জিজ্ঞেস করে, দেবীর কোন খবর আছে? আর আসবে না?

মেজো মা বলেন, রাজীব আমার কাছে বলেছে, আপনারা যা বলবেন আমি সব মানবো, দেবীকে আমি বিয়ে করতে চাই।

সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। তার আগে তো আমার রাজীব সাহেব এর সাথে কথা আছে। ওস্তাদ এর সাগরেদকে এফডিসি পাঠাই।
কী বলবো?
ওকে বলি, রাজীব সাহেব এর সাথে দেখা করে বলবে দেবী ঢাকায়, ওস্তাদ এর বাসায়।

রাত তখন একটা। শুটিং এর ড্রেস পরা, কাঁধে ব্যাগ, রক্তাক্ত শার্ট। আমিই দরজা খুলি, আমাকে দেখেই বললেন, আপনার খবর পেয়ে মেকআপ উঠানোর মতো সময়টুকুও নষ্ট করতে ইচ্ছে করলো না। আবার যদি বাসায় থেকেও নাই বলেন?

আমি বললাম, আপনিও গেলেন কেনো?

শোনেন, আসল কথায় আসি। আপনি গত দুই বছর ধরে কোন না কোনভাবে আমার পিছনে লেগে আছেন, কেনো? মেজো মা লজ্জা পান, ‘বাবা ও এরকমই, কিছু মনে করো না’।

না মেজো মা, আমি দেবীকে ভালোবাসি।

শোনেন, আপনি আমাকে বিয়ে করবেন?

জ্বী।

আমার কিছু কথা আছে, কালকে দেখা করবেন।

রাজীব সাহেব বললেন, মগবাজার মোড়ে আমার বন্ধুর চাইনিজ রেস্টুরেন্ট টাইকিং, ওখানে আসবেন?

ঠিক আছে।

রাজীব সাহেব চলে গেলেন।

এতো সুন্দর করে মানুষ কথা বলতে পারে? দেখতে হুবহু রাজেশ খান্নার মতো না? অমিতাভ বচ্চনের মতো ভয়েস না? দাঁড়ানোর ভংগী, বসার স্টাইল সব যেন আলাদা, মন কাড়ে। আগে তো চোখে পড়েনি? অর্ধেক কথা ইংরেজিতে বলেন, তাও ব্রিটিশ এক্সেন্ট!

পরের দিন উনার সাথে দেখা করি। আমার ভিতরে ঝড় তুফান সব হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত ছাড়া আমার কোন রাস্তা খোলা নাই। হেরে যাওয়া সৈনিক এর মতো, দুই পায়ে যেন গুলি লেগেছে।

কোন সময় না নিয়ে বলা শুরু করি।
সব বলি, মি. কক্স এর কথাসহ। শেষে বলি, আপনি আমাকে বিয়ে করবেন উল্টা যৌতুক দিয়ে।করবেন? আপনাকে দেওয়ার মতো আমাদের কিছু নেই।

জ্বী আমার কিছু লাগবে না।

কালকে আপনার গার্জিয়ান পাঠাবেন, পরশু বিয়ে হবে। আর যদি না পারেন আমি পরশু কক্সবাজার চলে যাবো।

জ্বী আমি কালকেই পাঠাবো। আমি মনে মনে চাচ্ছিলাম বিয়ে হলে হবে, না হলেও ভালো।

পরের দিন রাজীব সাহেব এর বড় একজন, ছোট একজন চাচাতো ভাই আসলেন। মেজো মাকে প্রস্তাব দিলেন। সাথে পাঁচ ভরি গয়নার একটা সেট, ২৫ হাজার টাকা। আমি যেন আমার পছন্দমতো কেনাকাটা করি।

রাতে ভাই বাসায় আসলে মেজোমা সব বলেন। ভাই তো চিৎকার শুরু করে দিলেন। এই বিয়ে কোনদিন হবে না। কারণ ও ফিল্মের লোক। রাতদিন মহিলা শিল্পীদের সাথে ওঠা বসা, প্রতিদিন স্ক্যান্ডাল নিউজ হয়। দেবী এইসব মেনে নিবে না, রাজীব মার খাবে, বিচার আসবে প্রতিদিন।
মেজোমা হাতে পায়ে ধরে ওস্তাদকে বুঝালেন। আমি সকালে ওঠে নিউমার্কেট যাই। যাই হোক সবার জন্য, আমার জন্য কেনাকাটা করলাম।

ভাই এরও আজকের মতো ভালো অবস্থা ছিলো না তখন। ভাই বললেন, লোকজন তো নাই, তুই যা দাওয়াত দিয়ে আয়।

তখন মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে অনেকগুলো ফিল্ম পরিবার ছিল। তাদের মধ্যে দিলারা, খোকন, চন্দনা, ফজলে হক ভাই, খসরু নোমান ভাই।

আমার বিয়ে আমি-ই দাওয়াত দিতে গেলাম। বললাম, আমার এক চাচাতো বোনের বিয়ে আজকে রাতে। দিলারার ওপর দায়িত্ব পড়লো আমাকে পার্লার এ নিয়ে যাওয়ার। জীবনে প্রথম পার্লার দেখলাম, তাও বউ সাজাতে ২৫০ টাকা নিলো!

আমার কোন হলুদ হলো না, কোন ছবি উঠানো হলো না।

আমি কৃতজ্ঞতা জানাই আমার ভাইকে (ওস্তাদ) নিজের শেষ টাকাটা খরচ করে চাচাতো বোনের বিয়ে দিলেন, যেন বাবার দায়িত্ব পালন করলেন। এখন যার আকাশ ছোঁয়া সম্মান। ভালো থাকুক আমার ভাই।যা অনেকেই করবে না, ভাই আমার অনেক বড় মনের মানুষ।

আর আমার মেজো মা? সে তো আমার আর একটা মা, যতদিন বেঁচে ছিলেন আমি যেন তারই সন্তান। মেঝমাকে আল্লাহ বেহেশতবাসী করুন।

রাতে সব মেহমানরা আসলেন, বউ বেশে আমাকে দেখে সবাই অবাক।

অনাড়ম্বর পরিবেশে সম্মানিত ওয়াসিমুল বারী রাজীব সাহেব এর সাথে আমার বিয়ে হয়ে গেলো। আমি মিসেস রাজীব হলাম।

কান্নাকাটির পর্ব শেষ করে, আমার অসমাপ্ত প্রেমের কবর দিয়ে আমি রাজীব সাহেব এর হাত ধরে অজানার উদ্দেশ্যে উনার সফরসঙ্গী হলাম।

আমাকে জাকির হোসেন রোড এর বাসায় আনা হলো। ছোট ফ্ল্যাট, ২০০০ টাকা ভাড়া। কলিং বেলের আওয়াজ, তখন প্রায় ভোর আজানের সময়, কাজের ছেলেটা এসে বলে, স্যার …,…. ম্যাডাম আসছেন…।

(আজকে এতো বছর পর উনার নাম বলে উনাকে বিব্রত করলাম না।)

শেয়ার করুন:
  • 33
  •  
  •  
  •  
  •  
    33
    Shares

লেখাটি ৮৮৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.