আমি তো আমার গল্প বলছি (পর্ব-২)

0

দেবী গাফফার:

সাত

আমার নাম দেবী কেন? আঁর নাম দেবী কিয়া?
মারামারি করে স্কুল থেকে এসে বাবার অপেক্ষা। এশার আজানের পরে বাবা বাসায় আসতেন। সাথে কিছু আধা পচা বেগুন বা মুলা, পাঁচ মিশালী পঁচা মাছ।
শুরু হতো ছোট খাটো যুদ্ধ, এতো রাতে মা মাছ কাটবে না। তর্কাতর্কির মাঝখানে আমরা ঘুমিয়ে যেতাম। রাত কতো হতো কে জানে! বাবা সব বাচ্চাদের ঘুম থেকে উঠিয়ে খাওয়াতেন।
অত রাতে পঁচা মাছ তরকারি কেন আনতেন?
অভাব অথবা সব হারিয়ে মাথায় সমস্যা মনে হয়। (সেটা এখন মনে হয়।)
বাবা কে বলি, আগে বলেন, আমার নাম দেবী কেন রাখলেন? এই নাম আজকে, এখনই পাল্টান। বাবা হাসেন।
বললেন, আমি চাই তুমি বড় হয়ে দেবী হও। দেবী অর্থ গডেস। দেবী কারও ক্ষতি করে না, সবার উপকার করে, কোটি মানুষ তাকে মানে। দেবী পবিত্র, দেবী কোন পাপ করতে পারে না। ঐ কথা আজীবন আমার মাথায় রয়ে গেলো। (এটা আমার বাবার চিন্তাধারা আশা করবো এটা নিয়ে কোন জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হবো না।)

লেখক: দেবী গাফফার

বাবা বলেন, মাগরীব আজান এর পরে ব্যাগ নিয়ে বাজারে এসো। বাজার ঘাটা থাকবো।
বাজার নিয়ে আসার সময় মনে হতো সব অন্ধকার আমার জন্য অপেক্ষা করতো। টেক পাড়া চৌরাস্তায় মাছ কোম্পানির বাসা।( উনি মাছের ব্যবসা করতেন, সবাই ঐ নামেই ডাকতো)।
কারেন্ট নাই। বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে কুলহু আল্লাহ পড়তাম আর দৌড়াতাম।
একটু পরেই বাবা আসতেন। এখন মনে হয় ওটাও আমার ট্রেনিং চলছিলো।
আমার জন্য বাবা কাপড় আনতেন স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট। ছেলেদের মতো ছোট বাটি ছাঁট চুল। সবাই ছেলে মনে করতো।

একদিন স্কুল থেকে আসার পথে এক বান্ধবীর বাসায় যাই। ওর মা সুঁই সুতা দিয়ে নাক কান ফোঁটা করে দেয়।
বাবা দেখে এমন চিৎকার, সাথে সাথে কান নাকের সুতা ফেলে দিতে হলো।
স্কুল যেতাম বার্মিজ লুংগি পরে, মাথায় খোঁপা করে কত রকমের ফুল পরতাম। ক্লাসে মাসিক, ষান্মাসিক সব পরীক্ষায় ফেল।
রোমা, ফিরোজা, দিলরুবা তোরা এখন কে কোথায়? (আমার বইল্যা পাড়ার সাথীরা)।
আমাদের অংক স্যার ছিলেন কামাল স্যার। অংকে ইহজীবনেও পাশ করিনি। স্যার সারাক্ষণ পান খেতেন। ‘কালকে পান আনবি, তাহলে পাশ করবি। না আনলে ফেল’। আরও বলতেন, ‘তোর মাকে বলবি, ভাঁপা পিঠাও নিয়ে আসবি’।

মহা বিপদে পড়ে যেতাম। নিজেরা তিন বেলা খেতে পাই না, স্যারের এগুলো কী করে যোগাড় করবো? আমার মা তো কোনো পিঠা বানাতে পারে না।
“সেদিন স্যার যদি জানতেন” আমি খালি পেটে স্কুলে গিয়েছি, বিকালে ভাত পাবো কিনা জানি না, তাহলে হয়তো অতখানি বিব্রত আমাকে করতেন না। স্যার আজকে বেঁচে নেই। থাকলে হয়তো স্যারকে একটা পানের বরজ কিনে দিতাম, আর পৃথিবীর সব চেয়ে মজার পিঠা স্যারকে খাওয়াতাম।
এর মধ্যে আমি স্কুল এ ফেল করি। আর স্কুলে যাই না।

পাশেই ছিলো মগ পাড়া। সারাদিন মগ ছেলেমেয়েদের সাথে খেলি। মগপাড়ায় গুড় দিয়ে বাংলা মদ তৈরি হতো, যত খুশি গুড় খেতাম।
উদ্দেশ্য পেট ভরা। মগেরাও আদর করতো। ওরা ভাবতো, আমিও মগ। যেহেতু আমার মা দেখতে মগের মতো, আমিও সত্যটা বলতাম না। ক্ষিদার কাছে মানুষ পরাজিত, হয়তো আমার বেলায়ও তাই ঘটেছিলো। সত্যটা জানলে আর হয়তো আমাকে আদর করবে না, খাবারও দিবে না।

আট – ৭৪ এর দুর্ভিক্ষ

মাঝির ঘাটে যে বাসাটায় আমরা থাকতাম, ঐ বাসাটা কোন এক বিদেশি কোম্পানি বানিয়েছিলো। পরে আর কোন কাজ করেনি।
বাসার সামনে একটা সাইনবোর্ড ছিলো, লাডলা ব্রাদার্স।
জায়গার মালিক আমার সম্পর্কে জ্যেঠা হোন। সেই সুবাদে আমরা ওখানে থাকি। বাসায় কোন বাথরুম নাই, টিউবওয়েল নাই। বাসার পিছন দিকটায় একটা পুকুর।
ঐ পুকুরের পানি মগেরা বাংলা মদ বানানোর কাজে ব্যবহার করে,পুকুর পাড়েই প্রকৃতির কাজ সারে। আমরাও তাই, গোসল, রান্না পুকুর ভরসা।

হাড় কাঁপানো শীত আর সহ্য হয় না।
বাংলাদেশে ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ সেবার, চারদিকে অভাব আর অভাব। মাঝির ঘাটে মাছ ধরার নৌকা বানানো হতো। আমি আর আমার ভাইটা ওখানে লাকড়ি আনতে যাই। যারা নৌকা তৈরি করতো ওরা ওখানেই রান্না করে খেতো।

একদিন বললো, তোমাদের লাকড়ি দিব এক শর্তে, কী সেটা? লোকটা বললো, তোমার মাকে বলো, আমাদের রান্নার হলুদ-মরিচ যা যা মসলা লাগে বেঁটে দিলে তোমরা লাকড়ি পাবে।
মাকে বলার পর মা নিয়ে আসতে বললেন। ওরা অনেক লোক, কক্সবাজারের লোকেরা অনেক ঝাল খায়। মা এক গামলা করে মরিচ বেঁটে দিতেন, আমরা লাকড়ি নিয়ে আসতাম।
একে তো দুর্ভিক্ষ, তার মধ্যে এতো শীত। শীতও যেন দয়া মায়া ছাড়া আমাদের ওপরই আক্রমণ করতো। শীতে সব ভাই-বোন এক বিছানায় কাঁপাকাঁপি, যেন দাঁতে দাঁত লেগে যেতো। পাতলা কাঁথা কি আর শীত মানে? ঘুম ভাঙলে দেখতাম কাঁথার ওপরে চটের বস্তা দেওয়া।
এখনও চটের বস্তা কাঁথা দেখলে মনের অজান্তেই কেঁপে উঠি।

মা আমাকে বড় বড় বাজার থেকে ‘নিলামি’ কাপড়ের টুকরা এনে দিতে বললেন। (তখন বিদেশীদের পরে ফেলে দেওয়া কাপড় বাংলাদেশে আসতো, আমরা নিলামি কাপড় বলতাম, আমি ঐ নিলামি কাপড় পরতাম বলে সমবয়সী বাচ্চারা আমাকে নিলাম বালা, নিলাম বলতেই থাকতো)।

বড় বাজার বা পান বাজারে ঐ কাপড় কেউ কিনলে ছোট বড় করে দেওয়া হতো। ফলে কাপড়ের অনেক টুকরা বের হতো। মায়ের কথামতো মার জন্য ব্যাগ ভরে কাপড়ের টুকরা এনে দিলাম। সারা রাতদিন জেগে দেখি বিরাট এক কম্বল তৈরি করে ফেলেছেন। বাহ, এই প্রথম দেখলাম উনি কিছু একটা করে ফেলেছেন। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়াতে কিচ্ছু পারতেন না। রান্নায় লবণ হতো না, ভাত নরম বা শক্ত থাকতো, প্রতিদিন এই নিয়ে বাবা চিৎকার করতেন।

শীত গেলো, গরম আসলো। কারেন্ট নাই, ফ্যান নাই, মশারির ভিতরে অসহ্য গরম। ভাইগুলা কান্না কাটি করতো। এক মশারিতে সবাই। মায়ের পাঁচ নম্বর বাচ্চা পেটে।।

তালের পাখা পানিতে ভিজিয়ে বাতাস করতেন। পানির ছিটা গায়ে লাগতো, সে এক স্বর্গীয় অনুভূতি।
মার পরনে একটাই বার্মিজ লুংগি, রাতের বেলা গোসল করে লুংগি ধুয়ে দিতেন দিনে পরতেন।
এই গরমে বাবা কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুম। মা ভয়ে ভয়ে বলছেন, উঠেন, বাসায় কিছু নাই, বাচ্চারা সব না খাওয়া, কোন উত্তর নাই। সারা দিন গেলো, রাত গেলো বাবা শুয়েই রইলেন।
অনেক রাত, হয়তো রাত গভীর। বাইরে ভৌতিক অন্ধকার। (মা খুব ভীতু ছিলেন, ভূত এর ভয়, বিজলি চমকালে খাটের নিচে পালান। একসাথে পাঁচজন মানুষ দেখলে ভয় পান)।
সেই ভীতু মা আমার অন্ধকার রাতে বের হয়ে পিছনের ধান ক্ষেত থেকে হাতে ছিঁড়ে অল্প ধান নিয়ে চুলায় টেলে, চাল বের করে জাও রান্না করে ক্ষুধার্ত বাচ্চাদের তুলে খাওয়ালেন।

ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া বাবার দুধ চুরির খবর শুনে মায়ের মুখটা বার বার চোখের সামনে ভাসছিলো।
সেদিন কি আমার মা চুরি করেছিলো? যদি চুরি করে থাকে, পৃথিবীর সব মা যেন চুরি করে।

নয়

বার্মা থেকে ছোট মামা আসছে, আমার সম বয়সী। আমার সাথে বাজারে নিয়ে যাই। চাল বাজারের পাশে বিভিন্ন রকমের তৈরি খাবার এর দোকান বসতো। জর্দা সেমাই, দুধ সেমাই, সিদ্ধ মিষ্টি আলু, কত কী!
জর্দা, সেমাই এতো সুন্দর করে সাজানো,দেখে মুখে পানি আসতো। মামা বলে, আমি একটু সেমাই খেতে চাই, খাওয়াবি? আহারে মামু আমার, ওর বুঝ আর কত! ও তো জানে না আমার হাতে কোন টাকা নেই।
মামা আমার খেতে চেয়েছে, যেভাবে হোক মামাকে সেমাই খাওয়াবো। চলো খাবে। জিজ্ঞেস করি, প্লেট কত? আট আনা মনে হয়।
হাতে কিন্তু টাকা নাই।

বললাম, দুই প্লেট দেন। মামুকে বার্মিজ ভাষায় বলি, মামু, তুমি দৌড়াতে পারো? মামু বলে, পারি। খাওয়া শেষ হলে আমি ইশারা করার সাথে সাথে আমার সাথে জোরে দৌড় দিবা। মামু বেচারা এই কথা শুনে ওর খাওয়া গলায় আটকে যাওয়ার অবস্থা।

যার দোকানে সেমাই খাচ্ছিলাম, ওই লোক যে বার্মিজ ভাষা বুঝে আমি জানতাম না। ঊনি মুচকি হেসে মামার দিকে তাকিয়ে বার্মিজ ভাষাতেই বলেন, তুমি ভয় পেও না, খাও, দৌড়াতে হবে না। আমি ওর বাবাকে চিনি, পরে টাকা নিয়ে নিবো। কে জানে লোকটা এখন কোথায়!

পরের দিন আমি আর ভাইটা বিলে মাছ ধরতে যাই। অনেক ঘন্টা কষ্ট করে একটা মাছ ধরি। মাছটা মনে হয় আঙ্গুলের সাইজ হবে। হঠাৎ ও বলে উঠে, দিদি, মাছটা পড়ে গেছে। আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। কী বললি? রাগের মাথায় ওর হাত কামড়ে দিই।

এখন মায়া লাগে, সব কাজ আমি করতাম, ও কোন কাজের ছিলো না। মায়ের মতো সবকিছুতেই ভয় পেতো। আজকে বাসায় গেলে বকা শুনতে হবে। ঐ দিন আর বাসায় ঢুকি না। টেকপাড়া ব্রিজের ওপর পা দুলিয়ে বসে থাকি। এশার আজান এর পর বাবা আসবে, বাবার হাত ধরে বাসায় গেলে মা আর কিছু বলতে পারবে না।
এগুলো ছিলো আমার প্রতিদিনের রুটিন।

বাবা মাঝে মাঝে চার আনা, আট আনা দিলে, আমারটা খরচ করে ফেলতাম, ভাই এরটা খরচ করতো না। ভোরবেলা আরবী পড়তে যেতাম, সব বাচ্চারা এটা-ওটা কিনে খায়। আমি কী করবো, ভাই এর মাটির ব্যাংক এর পয়সা শলার ঝাড়ুর সরু কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে চুরি করতাম। একদিন ভোরবেলা চুরি করার সময় হঠাৎ আওয়াজ, এই দিদি কী করেন, বলেই বিলাপ ধরে কান্না। আমি দৌড়।

টেক পাড়া স্কুল এর পাশে শাহ আলমের বাবার মুদি দোকান। খিটখিটে বুড়া। দাদা, একটা আচার দেন, বাবা টাকা দিবে। না দিব না। আমারও রাগ ওঠে গেলো। আচার এর প্যাকেটসহ নিয়ে দৌড়। বাসায় বিচার আসলো, সেদিনও এশার আজান পর্যন্ত ব্রিজে বসা। বাবা কিছু বলেননি। পরে জেনেছিলাম বুড়ার ছেলে বুড়ার সবকিছু নিয়ে বউসহ চলে গিয়েছিলো।

দশ

বাজারে যাচ্ছি, এটা পড়, ঐটা বল। রাস্তায় হাঁটা অবস্থায়। হাঁটি আর পড়ি।
এক ফুফাতো ভাই ছিলো, হাফিজ ভাই ( হাফিজ্যা বদ্দা)। প্রায় রাতে আসতো। বাবা বলতেন, ভাত খা। না না, আমি এইমাত্র খেয়ে আসলাম, পেট ভরা।
মামা যখন বলছেন, আপনার সম্মানে এক মুঠ খাবো।

কর্ম সারা, ভাত খাচ্ছে তো খাচ্ছে, থামে না। শেষমেষ মা না খেয়ে থাকতো। আমাদেরও পেট ভরতো না। মাঝে মাঝে বাবা বন্ধু নিয়ে আসতেন, বা রাস্তায় পরিচয় হওয়া কোন লোক।
মায়ের বার্মিজ নাম মালায়ি। বাসায় ঢুকেই বলতেন, মালায়ি, আজকে আমি খাবো না, আমার ভাত উনাকে দাও। তাতেও মা না খেয়ে থাকতেন।

চা ছিলো মায়ের নেশা, সাথে চুরুট (সব বার্মিজ ছেলেমেয়েরা চুরুট খায়)। গুড় দিয়ে লাল চা খেতো, আর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তো। দুধ চা খাওয়ার অভ্যাস।
আমি এখনও লাল চা দেখতে পারি না। খিচুড়ি না, আটার রুটি না। অভাব নাড়া দিয়ে যায়। অভাব এতো ভালো বাসলো আমাদের ছেড়ে যাওয়ার কোন লক্ষ্মণ নাই।

হঠাৎ দেখি মা বাংলায় নাম সই করা শিখছেন। কারণ নারী কল্যাণ সমিতিতে লোক নিবে। ৬০ টাকা বেতন, দুপুরে লেটকা খিচুড়ি। ওখানেও খিচুড়ি। মা না খেয়ে বিকালে আসার সময় আমাদের জন্য নিয়ে আসতেন।

ঈদের কথায় আসি। প্রথম মাসে ৬০ টাকা বেতন পেয়ে, আমার জন্য কেনা হলো ন্যায্য মূল্যের দোকান থেকে ছয় টাকা দামের গজ কাপড়। ভাইদের জন্যও কেনা হলো।
লাল টকটকে চোখ জুড়ানো লাল। রাস্তার ওপারে জ্যেঠার বিশাল বাড়ি। পুতুল আপাকে হাতে পায়ে ধরে আমার রুমাল কাট ফ্রকটা সেলাই করাই।
অনেক পরে ৫০ হাজার টাকা দামের শাড়ি পরেও সেদিনের লাল জামার অনুভূতি আসেনি। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ঈদ ছিলো সেবার।

১১

এই ঘটনা লেখার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত না। কাওকে বলিনি, লেখা শুরু না করলে হয়তো আমার সাথে জীবন গল্পের এই অংশটুকু কবরে চলে যেতো।
ইফতারের পরে প্রচণ্ড ঝড়, আমার ভিতরও ঝড় হচ্ছে। আমি বন্ধুর বাসায় দাওয়াতে। এই ঘটনা রাতে লিখবো, লিখবো না থাক, না না লেখ লেখ।
অনেক গল্প হচ্ছে, আমিও অনেক কথা বলছি। আমি কি কারও কথা শুনতে পাচ্ছি? আমি ঠিক আছি তো?

নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ বড় হিংস্র।
আমি সত্যি কথা বলতে কখনো লজ্জা পাই না, এখনও পাই না। কিন্তু এই কথাটুকুর মধ্যে কোথায় যেন আমার অপমান, কারও প্রতি রাগ ঘৃণা দলা পাকিয়ে গলার কাছে এসে ঠেকে থাকে। ঝড়ের পর বক যেমন ঝিম ধরে আমারও তেমনটা হয়। হ্যাঁ হয়, এখনও হয়।

গতকাল থেকে আমার সাথে আমার যুদ্ধ হচ্ছে। আমি ঘেমে যাচ্ছি। যে কথা আমার বাচ্চারা জানে না, ওদের বাবা জানে না, আমার মা, ভাই, চাচাতো ভাইবোনেরাই শূুধু জানে।
আমার শক্তি নাই, আমি জীবনে প্রথম লজ্জা পাচ্ছি, অপমান বোধ করছি। ক্ষমা করতে না পারার বেদনা, আমার চোখের দুই কোন ভেজা ভেজা মনে হচ্ছে। আমার জীবনের এতো পাওয়া, যেন কোন মূল্যই নাই।
আমি কি আজকে সারাদিন অন্যমনস্ক? তাই তো? আমি তো কারও কথা ঠিক মতো শুনতে পাচ্ছি না। ঘাড়টা একটু ব্যথা করছে? করুক না।
” ঐ সময়েই, মার চাচাতো বোনের স্বামী এক মহিলা নিয়ে হাজির। কী হলো? এই মহিলা কে? খালুর সাথে ঐ মহিলার পরকীয়া, ভেগে আসছেন আমার বাবার কাছে, আসছেন, বিয়ে করবেন। মার হুলস্থুল শুরু। পরের দিন ওই মহিলাসহ খালু চলে গেলেন।
দুই দিন পর বাসায় পুলিশ, কেন, কী হলো? ঐ মহিলার ফ্যামিলি নারী নির্যাতন মামলা দিয়েছে, কোথায় ছিলো, কার বাসায় গিয়েছিলো, এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আমার বাবা দ্বিতীয় আসামী। বাবা বাসায় ছিলেন না।
যখন জানলেন, রাতে আর বাসায় আসলেন না। ঐদিন প্রথম আমি সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। আমি এখন কী করবো? কার কাছে যাবো? পাঁচজন মানুষ কী খাবে? কে খাওয়াবে? কার ওপর ভরসা করবো?

পৃথিবীতে কে আছে আমার? কার গলা জড়ায়ে ধরে বলবো, আমার বাম চোখ দিয়ে কেন পানি পড়ে? (মানুষ যখন কলিজায় ব্যথা পায়, তখন নাকি বাম চোখ দিয়ে পানি পড়ে!)
পরের দিন বাবা আমাকে খবর দিয়ে বাইরে নিয়ে গেলেন। বাজার ঘাটা যাও, নাম মনে নাই, তার সাথে দেখা কর। তোমাকে কিছু ওষুধ দিবে, ওগুলো বাসে উঠে বিক্রি করো। আমি বাজার ঘাটা গিয়ে ঐ লোকের সাথে দেখা করলে আমাকে কিছু কাঁচের ছোট ছোট শিশি দিলো। ওপরে লেখা “লোম নাশক”!!! (লিকুইড ভিট)!!!

আমি আগের লেখাতেই বলেছি, বাবা আমার পৃথিবী, আমার গুরু, বাবার জন্য আমার জান হাজির। বাবার আদেশ, বাবা আমাকে শিখিয়েছেন বিপদের সময় কীভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাই বলে বাসে বাসে ওঠে আমি কী বলবো? আমি ছোট হলেও জিনিসটা কী চিনলাম!
আমাকে বুঝালেন, এখন তুমি ছাড়া সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার কেউ নাই। তোমার মা বোকা মানুষ, ছোট ছোট ভাইরা না খেয়ে মারা যাবে। আমি মেনে নিলাম, সেদিন থেকে আজ অবধি সংসারের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।

সেই লোম নাশক নিয়ে আমি বাসে উঠি, আর বলি, ভাই লোম নাশক লাগবে? ভাই একটা নেন। বাসের যাত্রীরা অবাক হয়ে আমার পা থেকে মাথা দেখে, ভাবে, কিনে।
কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে, তুমি কেন এসব নিয়ে আসছো, কেউ কানাকানি করে, মুচকি হাসে। আমি হাফ প্যান্ট পরা, আমার শরীর দেখে। সেই প্রথম আমি বুঝি আমার একটা শরীর আছে। সেদিন বুঝলাম, পুরুষের নোংরা চাহনি কেমন হয়! সেই কুৎসিত হাসি, আমি বুঝি।
আমি কী করবো, আমার মা, ভাই কী খাবে? পৃথিবীতে কে আছে আমার? কয়েকদিন গেলো, আমি আর পারি না। প্রতিদিনকার কুৎসিত চাহনি, দাঁতে দাঁত চেপেও রাগ নামতো না।

বাবা পুলিশ এর ভয়ে বাইরে বাইরে লুকিয়ে থাকে। প্রথম আমার ব্যক্তিত্ব আসলো। বললাম, আমি আর এইসব বিক্রি করতে পারবো না। আর একবার এইসব বিক্রি করতে বললেই, বলে বাবার চোখে চোখ রাখি। সেদিন আমার চোখে আগুন ছিলো।

বাবা ঘাবড়ে গিয়ে হয়তো মনে মনে ভেবেছিলেন, এই মেয়ের নাম দেবী রাখা ঠিক হয়নি। আমার ভিতরে অন্য এক দেবী জেগে কথা বললো।
বাবা বললেন, তোমরা রেডি হও, কক্সবাজার থাকা যাবে না। আমরা ঘুনধুম যাবো।
কক্সবাজার থেকে সবাই ঘুনধুম চলে গেলাম। টেকনাফ এর কাছে। গভীর জংগল, এই পাহাড়ে একটা বাসা, ঐ পাহাড়ে আর একটা। জংগলের কাঁচা কলা এনে লবণ দিয়ে সিদ্ধ করে খাওয়া। কলা গাছ সিদ্ধ সকাল বিকাল, আমার খারাপ লাগেনি। আমার কাছে ওটাই জীবন। কখনও মনে হয়নি মানুষের বাবার মতো আমার বাবা না কেনো? জংগলে অনেক খাবার। বেশি ক্ষিদে লাগলে গাছ থেকে কাঁচা তেঁতুল, জংলি ছোট ছোট বরই, সনসু গোলা, লটকন আরও কত রকমের ফল খেয়ে নিতাম। মন্দ না। দিন যাচ্ছে কেটে।
কিছু মাইল দুরে বাইশারী নামে একটা জায়গা আছে। ওখানে চাকমা বেশি। ওখানকার হেডম্যান খবর পাঠালেন, উনি প্রচণ্ড অসুস্থ, বাবা যেন যান।

আমি আর বাবা রওয়ানা দিলাম। দুইদিকে বিস্তীর্ণ ধানের মাঠ, হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো, মাঝে মাঝে ঘন জঙ্গল। রাস্তায় কোন গাড়ি চলে না, হয়তো কোনদিন চলেওনি।

আমার প্রচণ্ড ক্ষিদা লেগেছিল। ক্ষিদায় আর হাঁটতে পারছি না। জোৎস্না রাত, মাটির রাস্তা, সামনে পিছনে অনেক দূর দেখা যায়। হঠাৎ পাশ থেকে এক লোক বলে ওঠে, ক্ষিদা লেগেছে? আমি আর বাবা চুপচাপ হাঁটছি। লোকটার কাঁধে (ভার) কটকটি ওয়ালার মতো লাঠির দুই দিকে ঝুড়ি। ঐ ঝুড়ির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে অনেক খানি পাকন পিঠা বের করে আমার হাতে দিলো। এ যেন স্বয়ং আল্লাহর পাঠানো খাবার। আমরা হাঁটছি, হঠাৎ বাবা বললেন, একটা জিনিস খেয়াল করেছো? ঐ লোকটা কই? নাই, কোথাও নাই। ডানে বামে কোন রাস্তাও নাই। ভরা জোৎস্না রাত, আগে পিছে সব দেখা যায়। লোকটা কই গেলো?

(চলবে)

শেয়ার করুন:
  • 39
  •  
  •  
  •  
  •  
    39
    Shares

লেখাটি ৪৫৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.