সিমি বানুকে মনে পড়ে

0

আফসানা কিশোয়ার:

২০০১ সালের ২৩ ডিসেম্বর আমাদের বন্ধুর সম্ভাব্য পার্টনার সিমি বানু আত্মহত্যা করে বিষপানে। সিমির তখন ২১ বছর, আমাদের ২৩। সিমি থাকতো খিলগাঁও এ, পড়তো নারায়ণগঞ্জ চারুকলায়। আমাদের জন্য ছিল এ এক আশ্চর্য সময়, আমরা তখন পথে নামি। আমাদের বন্ধু হয়ে যায় উদভ্রান্ত।

সিমি দিনের পর দিন বখাটেদের টিজিং এর কারণে আত্মহত্যা করে। বখাটেদের নাম ছিল দোয়েল, খলিল, রিপন, এমনকি থানার এসআই বাশারও ছিল এদের দোসর। এক সময় আমরা মামলার রায় পাই আত্মহত্যায় প্ররোচনার জন্য এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। যারা আজকে ২০ ২৫ বছরের, তারা জানে না এ ঘটনা। সে সময়কার ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রী নাজমুল হুদার ছায়াও পায় আসামীরা।

সিমি বানু

এরপর পদ্মা মেঘনা যমুনায় অনেক পলি পড়েছে। আমরা গাইবান্ধার চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী তৃষাকে পুকুরে লাফিয়ে পড়ে মরে যেতে দেখেছি বখাটেদের ধাওয়ায়। রাজশাহীর মহিমা, খুলনার রুমি এরকম অনেক নাম ৪০ পেরোনো আমাদের মস্তিষ্কে মাঝে মাঝে বুড়বুড়ি কাটে।

ইয়াসমিন হত্যা হয় পুলিশের হাতে, কারাগারে পুড়িয়ে ফেলা হয় চট্টগ্রামের সীমা চৌধুরীকে।
আমরা যারা লিখতে পারি তারা কবিতা লিখি, গান বাঁধি-কিন্তু তাতে অপরাধীদের জীবনে কোন হেরফের ঘটে না।

এই যে নৈরাজ্যের শুরু ও সাথে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া ও ক্ষেত্রবিশেষে বিচার না হওয়া, সেটাই হচ্ছে বর্তমান বাংলাদেশের রোগ। অনেকে আমাকে বলে আমি ড্রইংরুম বিপ্লবী। এই যে আমরা অল্প কয়েকজন আজকে অনেক বছর কোন না কোন ইস্যুতে কথা বলি, তারা তো তাও বলি, আপনারা তো বলেন না।

আপনারা সিমি বানুদের মরণকে হাস্যকর মনে করেন। আপনারা আমার বন্ধু যে ছিল সিমির সম্ভাব্য পার্টনার, তার তছনছ হয়ে যাওয়া জীবনের খবর রাখেন না। সিমির বান্ধবী স্বপ্নার আত্মহত্যার খবর জানেন না।

প্রতিটি নাম এক একটি সংখ্যা, অপরাধীরা জানে এদেশের বিচারের লম্বাকাহিনী তাই এখন যার যা খুশি করে, এখন আর কেউ ঝামেলা রাখে না, ধর্ষণ করে জাস্ট মেরে ফেলে। পাঁচ বছরের বাচ্চাকে ধর্ষণ করে মেরে বাগানে ঝুলিয়ে রেখেছে।

আপনারা ভাবছেন পর্দা করলে সব বন্ধ হয়ে যাবে। ঘটনা আসলে আদতে তা না, ঘটনা হচ্ছে আমাদের মাইন্ডসেট হয়ে গেছে যৌন নিপীড়নের শাস্তি হওয়া এতো সহজ না। যৌন নিপীড়ন কোনো অপরাধের কাজ না। এখানে যে নিপীড়িত সব দোষ তার, সে যে বয়সী হোক।

এখানে আরেকদলের ভাবনা আছে আমাদের শ্রেণী যারা নিজেদের মধ্যবিত্তভাবে তাদের শ্রেণীতে এসব ঘটে না, এগুলা বস্তিবাসী, নিম্নবিত্ত, শ্রমজীবী, গ্রামে বাস করা বাচ্চাদের সাথে ঘটে। শাজনীন ছিল ট্রান্সকমের মালিকের মেয়ে, এদের এসব ছেঁদো কথার পিঠে আমার এ কথা মনে হয়। চট্টগ্রামের তাসফিয়া ইংলিশ মিডিয়াম পড়ুয়া।

আফসানা কিশোয়ার

কথা বেশি বাড়াতে চাই না। সময় আছে জেগে উঠুন, নারী বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়া মানুষদের প্রতিহত করুন। আপনি যে এ জিনিস পছন্দ করছেন না তা অন্ততঃ একবার প্রকাশ্যে বলুন। আমরা শাহবাগী, আমাদের কাজ হলো যে কোন ইস্যুতে গিয়ে রাস্তায় দাঁড়ানো, এসব বিদ্রুপ না করে নিজের দিকে তাকান, নিজের দায়িত্ব মানুষ হিসেবে কী তা বুঝে পালন করুন।

আজকে হঠাৎ সিমির কথা খুব মনে পড়ছে, কারণ আমার সেই বন্ধু হাসপাতালে ডেঙ্গুর সাথে লড়ছে।

#রিড_বিটুইন_দ্য_লাইনস
#আসল_কথা_যায়_না_বলা

শেয়ার করুন:
  • 131
  •  
  •  
  •  
  •  
    131
    Shares

লেখাটি ৬০৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.