বালিশ সমাচার!

0

সাজু বিশ্বাস:

মহেস্মতী থেকে বাহুবলীকে ডেকে পাঠানো হয়েছে বালিশ তোলার জন্য। বাহুবলী আগা-মুড়ো তেমন কিছু জানে না। সে শুনেছে বাংলাদেশে নাকি বালিশ তোলার জন্য হাজার টাকা মিলছে। টেলিভিশন, মাইক্রোওয়েভ, ফ্রিজ তোলার জন্য হাজার হাজার টাকা। বাহুবলী ঠিকানা ধরে চলে এসেছে। গেটে দারোয়ান তাকে আটকে দিল।

— দাঁড়াও হে, তোমার নাম কী? এরকম আজব পোশাক পরে আছো কেন? জানো না এটা সংরক্ষিত এরিয়া? জাতির বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ প্রকল্প একটিভ হচ্ছে এখানে?

মর্যাদার ব্যাপারটা বাহুবলীর কাছে নতুন ঠেকলো। তাকে মর্যাদার ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি, তাকে বলা হয়েছে সরকারি একটি আবাসিক এলাকায় কিছু বেসম্ভব জিনিস তুলতে হবে। বাহুবলী সবিনয়ে জানালো, আমি বাহুবলী… আমার সাজ পোশাক তো আগাগোড়াই এইরকম। আমি অবশ্য একবার বলেছিলাম, অলটাইম এই আধা ল্যাঙট ধুতি আমার পছন্দ না, কমসে কম আমায় দুই একটা কোয়ার্টার প্যান্ট বা পাতলুন পরতে দিন, কিন্তু পরিচালক রাজি হলো না!

দারোয়ান হাত উল্টে একরকম তাচ্ছিল্য করে বলতে লাগলো, থাক থাক, আর বিস্তারিত বাখানি করতে হবে না, লাল ল্যাঙটের উপর আবার নীল উড়ুনি কোমরে বাঁধা! এখন গেট পাশ দেখাও দেখি?

—‘আমার তো গেট পাশ নেই, যে আমাকে সংবাদ দিয়েছিল, সে বলেছিল গেটে এসে বালিশ তোলার কথা বললেই হবে’ বাহুবলী ঝটপট উত্তর দিল।

দারোয়ান ইতিউঁতি করছে। এই আজব পোষাকের লোকটাকে গেট দিয়ে ঢুকতে দেবে কী দেবে না। বাইরের কোনও লোক কারো বিনা অনুমতিতে ঢুকে এদিক ওদিক খবর নিলেই তো ঝামেলা। তবে কারো রেফারেন্স যদি হয়! একখানা রিকন্ডিশন্ড টয়োটা হাঁকিয়ে একটা লোক এসে গেটে থামলেন। দারোয়ান লোকটা হেলেদুলে তার দিকে এগুলো। লোকটার কানে কানে কিছু বুঝালো।

লোকটা ব্যতিব্যস্ত হয়ে বাহুবলীর দিকে আগাতে আগাতে বললেন, ‘ও হ্যালো! বাহুবলী, আমিই আপনাকে খবর পাঠিয়েছিলাম, — হয়েছে কী, আপনি তো শিবের সেই রকম বড় একখান মূর্তি পাহাড়ের এধার থেকে ওধারে বয়ে নিয়ে একেবারে হৈ হৈ ফেলে দিয়েছেন, তাই আপনাকে ডেকে পাঠালাম, — হয়েছে কী, সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার বালিশ শুনেই সবাই ভড়কে গেছে’,… শেষ দিকে তোঁতলাতে তোঁতলাতে বললো লোকটা।

বাই দ্য ওয়ে, আমিই এখানকার মালি। নিজের পরিচয় দিয়ে লোকটা হাত বাড়িয়ে দিল। বাহুবলী মালির হাতের ঝাঁকুনি খেতে খেতে চোখ ছানাবড়া হয়ে তার দিকে তাকালো। মালি টয়োটায় চেপে এলো!

—তাহলে কাজ শুরু করে দিন, বিকেলে দেখা হবে। এইকথা বলে মালি বিদায় নিল।

বাহুবলী প্রায় হাঁ করে তার গাড়ির দিকে তাকিয়ে রইলো। মালি গাড়িতে! ‘এখানকার মালি বেতন পায় কত’!

— ‘তেষট্টি হাজার টাকা’। দারোয়ান বাহুবলীর মিনমিনে গলা শুনে বললো। ‘আমার নিজের বেতন কত জানো? একাত্তর হাজার’। দারোয়ান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো।

এখনকার সবচেয়ে বড় কর্মচারির বেতন কত তাহলে? (বাহুবলী বড় বড় কর্মকর্তা, পরিচালক, এইসব পদবী বোঝে না, সে জানে রাজার কর্মচারি সবাই)
বাহুবলী প্রায় চিৎকার করে ওঠে বিস্ময়ে।

— চার লাখ ছিয়ানব্বই হাজার টাকা।

— দেশের প্রধানমন্ত্রীর বেতন কত তাহলে! বাহুবলীর বিস্ময়ের আর সীমা রইলো না।

— এক লাখ পনেরো হাজার, দারোয়ান নির্বিকার জবাব দেয়।

আর রাষ্ট্র প্রধানের?

এক লক্ষ কুড়ি হাজার মাত্র।

বেতন কমিশন দেশের কীসের কী কী করে তাহলে?
বাহুবলী ঝপাং করে প্রশ্ন করে ফেলে।

দারোয়ান এবার তিরিক্ষি স্বরে জবাব দেয়, — আরে ভাই এটা সংরক্ষিত এলাকা, — এখানে কোনও কমিশনের প্রবেশ নিষেধ।

বাহুবলীর ঘোর কাটে না, তার মনে পড়ে তারা রাজতন্ত্রের বিশাল মুকুটটি পাহাড় থেকে গড়িয়ে ঝর্ণার জলের তলায় ফেলে দিয়েছিল যাতে দেশের রাজা প্রজা শোষণ করে শক্তিশালী হয়ে না ওঠে।

বাহুবলী ঘোরে ঘোরে একটি বেখাপ্পা প্রশ্ন করে বসে দারোয়ানকে। — ভাই, ধানের দাম কত এবছর জানেন?

দারোয়ান লোকটি বিষম রাগান্বিত হয়। ধানের কেজি বারো টাকা। কৃষক ধানের দাম না পেয়ে হাউকাউ করছে। কেউ কেউ বিনামূল্যে কৃষকের ধান কাটতে যাচ্ছে সেজেগুজে। পত্রিকাওয়ালারা সেই ছবি দিয়ে খবরের গরম গরম কাটতি বাড়াচ্ছে। কিন্তু এই আধা ল্যাঙট পরা প্রাগৈতিহাসিক চরিত্রকে এসব কথা বলার কোনও মানে হয় না।

দারোয়ান কঠিন গলায় বাহুবলীকে বললেন, — বালিশ তুলতে হবে না, তুমি বাপু বিদেয় হও এখান থেকে। এটা সংরক্ষিত এলাকা। দেশের বিরাট কর্মযজ্ঞ চলছে এখানে। সেই ১৯৬১ সাল থেকে কাজ চলছে। এর উৎপাদন শুরু করতে এমনিতেই আরো পাঁচ বছর লাগবে। দেশের স্ট্যাটাস বাড়বে, ঘরে ঘরে লাল নীল বাতি জ্বলবে, — তুমি বাপু বিদেয় হও এখান থেকে।

বাহুবলী একবার বলতে যাচ্ছিল, আমি তো মহেস্মতীর রা- রা-

সে মুখের কথা মুখে গুঁজে দিল, — থাক থাক, এই রকম রাম রাজত্বে আমার আর রাজা হয়ে কাজ নেই।

শেয়ার করুন:
  • 72
  •  
  •  
  •  
  •  
    72
    Shares

লেখাটি ৪৫৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.