কর্মজীবী নারী স্বামীর জন্য জাহান্নাম?

0

লতিফা আকতার:

অতি প্রাচীন প্রশ্ন। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এ ধরনের বিষয়ে খবর হয়। আর আমরা মনে মনে কম শংকিত হই না। এ সমাজে এখনো নারীর জীবনযাপন, ঘর, অনেকটা সংসারকেন্দ্রিক হিসেবে বিবেচিত হয়।

নারী শিক্ষা প্রসারের শুরু শুরুতে নারী তার অর্জিত আলো সংসারে বিকিরিত করেই সন্তুষ্ট থাকতো। সবাই খুশি। বাড়ির বউ উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত- গর্ব করে কেউ কেউ বাইরেও এর প্রচার করে বেড়াতো।কিন্তু আলোক বর্তিকা হাতে একজন নারী যখন ঘরের বাইরেও এর ছটা ছড়াতে শুরু করলো তখন ধীরে ধীরে আকর্ষণ কমতে শুরু করলো।

বাবার বাড়ি থেকে শুরু করে বিবাহ পরবর্তী জীবনে শ্বশুরবাড়ির লোকজন নানান প্রশ্নের সম্মুখীন হতে শুরু করে।

পিতা তার কন্যার আয় খাওয়ার জন্য মেয়েকে চাকুরিতে ঢুকিয়েছে। এমন কথা শুনতে হয়েছে এমন পিতার সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। স্বামী বেচারা বউ খাওয়াতে পারছে না। চারিদিকে নানান টিপ্পনী। ঘরের বউ বাইরে চাকুরি করে, দশ পুরুষের সাথে মিশে- এমন স্বামীর জন্য তো বেহেশত হারাম। শ্বশুরবাড়ির লোকজন এ ধরনের কথা এড়ানোর জন্য পুত্র ও তাঁর কর্মজীবী বউকে আলাদা সংসারে চলে যেতে বলেছে, এর সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়।

গৃহিণীর রাগ অনুরাগ থাকতে পারে। কেননা সে সারাদিন সংসারের পিছনে খেটে মরে। কিন্তু কর্মজীবী নারীর মেজাজ বরদাশত করার পেছনে কোনো যুক্তি নাই। একটাই যুক্তি- সংসারে কয়টা টাকা আনে বলে এতো মেজাজ! সারাদিন বাইরের মানুষের সাথে কাটিয়ে এসে সংসারের করা কাজ কারো চোখে খুব একটা পড়ে না। সবকিছু ঐ চাকুরিতে গিয়ে ঠেকে। আর নারীর পার্সোনালিটি নির্ধারণ করতে না পারা এই সমাজে কে শ্রেষ্ঠ- গৃহিণী নাকি কর্মজীবী নারী? সংসারে কার অবদান বেশি?? বিতর্কের নতুন টপিক।

নারীর অবদান, তাঁর কর্ম নিয়ে দ্বিধান্বিত সমাজে- এর প্রভাব পড়ে বিবাহ নামক বিষয়ে। অতি কনজারভেটিভ কিন্তু স্পষ্টবাদি পুরুষ বেহেশত হারানো এবং সমাজের পাঁচটা প্রশ্নের সম্মুখীন না হওয়ার জন্য বিয়ের পূর্বেই বউয়ের চাকুরিতে আপত্তির কথা জানিয়ে দেয়। কেউ কেউ নিম রাজি। আর অনেকে নিজের সাথে স্ত্রীকে সমান্তরাল দেখে। আর কেউ কেউ বউয়ের চাকুরি করতে চাওয়ার দুর্বলতাকে ফায়দা হিসেবে নেয়। ঘরে বাইরে পরিশ্রম করা স্ত্রীর সব টাকাই স্বামীর। উদয়াস্ত পরিশ্রম করা নারী বলতে গেলে ঘুষ দিয়ে নিজের আইডেন্টিফিকেশন কেনে।

আইডেন্টিফিকেশন এর সমস্যায় এখন পুরো নারী সমাজ। এখন আর পুরুষরা এ নিয়ে আলোচনা করে না। এখন নারীই নারীর প্রতিপক্ষ। গৃহিণী বনাম কর্মজীবী নারী। পুরুষতান্ত্রিকতার মশাল হাতে এগিয়ে যাওয়া নারীরা সারাদিন এ সমাজের সেই সংকীর্ণ এবং জটিল প্রশ্ন একজন আরেকজনকে করে বেড়ায়। গৃহিণী স্ত্রী স্বামীব্রতা, নাকি কর্মজীবী নারী? কর্মজীবী নারী স্বামীকে কতোটাই বা সময় দিতে পারে? সন্তানের আবদার কীভাবে পূরণ করে? আর গৃহিণী সে তো স্বামীর অন্ন ধ্বংস করা এক নারী। বাসায় বসে টিভি সিরিয়াল দেখা যাঁর প্রধান কাজ (???)।

আলোচনা-সমালোচনা তো শুনি, শুনতে হয়। কিন্তু তাতে নারীর কি খুব একটা উন্নয়ন হয়? মানুষ হিসেবে কিছু নির্ধারিত দায়িত্ব সবাইকেই পালন করতে হয়েছে, হবে। সে পুরুষ বা নারী যেই হোক না কেন। জগত সংসারে গৃহিণী বা কর্মজীবী নারী- যাঁর যাঁর দায়িত্ব একজন মানুষ হিসেবে, নিজ দক্ষতায় উত্তীর্ণ হয়।

আর মাসলা মাসায়েল প্রচারকদের জন্য- বেহেশত যাঁর যাঁর কর্ম দিয়ে হাসিল করতে হয়। ধর্ম মেনেও, পর্দা করেও চাকুরি করা যায়। ইসলামের শ্রেষ্ঠ মানুষ যাঁর প্রথম স্ত্রী একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন। এবং বিয়ের পর তিনি স্ত্রীর ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। কিন্তু তিনি স্ত্রীকে ব্যবসা হতে পুরো বাদ দিয়ে অন্দর মহলে অবরুদ্ধ করেছেন- এ রকমটা কোথাও পড়িনি।
অন্যের মুখে ঝাল খাওয়া বাদ দিয়ে নিজের মুখে খান। নিজের মুখে যাই খাবেন, সেটা অমৃত সমান। কতোকাল আর টোটকা প্রয়োগ করে দিনাতিপাত করবেন? আপনার ইহকাল, পরকাল, আয়কাল, ক্ষয়কাল নিশ্চিত করার জন্য নারী এ ধরাধামে আসেনি। নিজেকে সুপিরিয়র ভাবার গাধামী হতে বের হয়ে চোখ কান খুলে বাইবেল, কোরআন, গীতা পড়ুন। সব দিনের আলোর মতো পরিষ্কার লাগবে।

আর নারীকেই বলছি- নিজের অবস্থান নিজেকে তৈরি করে নিতে হয়। আর তৈরি করা সে অবস্থানে ব্যক্তি তার নিজ ধারায় চলে। সে নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ করে এক অর্থে পুরুষের হাতই শক্তিশালী করা হয়।

আর কর্মজীবী নারী পুরুষের জন্য জাহান্নাম কিনা জানি না। তবে পাপ পূণ্যের দাড়িপাল্লায় নারীর ইহজগত জাহান্নমে পরিণত হয়।

শেয়ার করুন:
  • 308
  •  
  •  
  •  
  •  
    308
    Shares

লেখাটি ১,৯৬৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.