একটি বেগুনির গল্প

0

ফারহিম ভীনা:

অনেক জেদ, জবরদস্তি আর কান্নাকাটি করার পর অবশেষে প্রথম রোজা রাখার অনুমতি যখন পেলাম তখন আমার বয়স হবে ৯-১০ বছর। ঠিক হলো সাতাশ রোজা পবিত্রতম দিন, সে দিনের রোজায় সওয়াব বেশি, সেদিন হবে আমার প্রথম রোজা।

কথা দিলেও আব্বা-আম্মাকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারি না- যদি অন্যান্য দিনের মতো বলে বসে, ‘উফ্ কী ঘুম কাতুরে মেয়ে বাবা, ডেকে ডেকে হয়রান হয়ে গেলাম, তোমার ঘুম ভাঙে না’। তাই উত্তেজনায় আর টেনশনে আমার আর ঘুম আসে না। কী জানি যদি আজো চুপি চুপি আব্বা-আম্মা আমাকে বাদ দিয়ে সেহেরি খেয়ে ফেলেন!

আমি রাতে শুয়ে শুয়ে ঘড়ি পাহারা দেই- জানি রাত আড়াইটা বাজতে না বাজতে একদল ঘুম তাড়ানিয়া ছেলে টিনের বাক্স পিটিয়ে বলবে, ‘রোজাদাররা উঠুন, সেহেরির সময় হলো’। আব্বা অবশ্য এদের যন্ত্রণায় মহা বিরক্ত।
বলবেন, ‘পাড়ায় কত বাসায় কত সমস্যা থাকতে পারে, অসুস্থ মানুষ আছে, নন-মুসলিম আছে- মাঝরাতে সবাই ঘুমের বারোটা বাজানো ভারি অন্যায়। এতো শব্দ পীড়ন!’ কিন্তু আমি সেদিন অপেক্ষা করছিলাম ঘুম তাড়ানিয়া ছেলেদের চিৎকারের।‘ রোজাদাররা উঠুন, সেহরির সময় হলো’। জেগে থাকতে থাকতে কখন যে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি তা নিজেই জানি না। ছেলেদের বিকট চিৎকারও শুনতে পেলাম না। ঘুম ভাঙলো আব্বা-আম্মার ডাকাডাকিতে। এইবার এক লাফে বিছানা ছেড়ে খাওয়ার টেবিলে।

ছোট ভাই পাভেল আর রাসেল তখনো গভীর ঘুমে- এরা দিনে তিনটা করে রোজা রাখতো যে।
ঘুমের ঘোরে ভাত খাওয়ার কী কষ্ট-দু’এক লোকমা মুখে দিতে না দিতেই আম্মার বকুনি- ‘আরে ঘুমাচ্ছো তো! ঠিকমতো খাও। আব্বা বলছে, ‘থাক একটু দুধ কলা খেয়ে নাও’। ‘না না, ক্ষিদে নেই’। বলে আমি দৌড়ে আবার বিছানায়। আহ্ আমি রোজা রাখছি, আব্বা আম্মা আর ফাঁকি দিতে পারলো না।
সকালে উঠেই পাশের বাড়ির রিন্টিকে আমার প্রথম রোজার খবরটা দিতে হবে। যত উৎসাহে ঘুমালাম, ঘুম থেকে উঠে তত উৎসাহ থাকলো না-সকালে উঠেই ক্ষিদে পেল, তৃষ্ণা পেল। সকালের রুটি ভাজির জন্য মনটা আকুল হয়ে উঠলো। নাহ আমি রোজা – আমি রোজা ভাবতেই মনটা চাঙ্গা হয়ে উঠলো।

রিন্টিকে তো জানানো হলো না। ‘আমি একটু পাশের বাড়ি যাচ্ছি’ বলেই দে দৌড়। রিন্টি আমার প্রথম রোজার কথা শুনেও পাত্তা দিল না। সে রোজা রাখেনি। বরং আমারে দেখিয়ে দেখিয়ে ‘বিউটি হজমি খাওয়া শুরু করলো। হজমি খাচ্ছে, আর জিভ দিয়ে চটাস চটাস শব্দ করছে। ছি: একে আমি জানের বন্ধু ভেবেছি। আমি বাসায় ফিরে আসছি দেখে রিন্টি বললো, ‘শোন, পেট চেপে শুয়ে থাক্, ক্ষিদে চলে যাবে। নাহলে লুকিয়ে কিছু খেয়ে নে, রোজাটা ফুঁ দিয়ে গ্লাসে ঢেলে খেয়ে নিবি, তারপর গ্লাসের রোজাটা একটু পানি দিয়ে পেটে নিলেই আবার রোজা’। ‘যাহ্ বাজে কথা’ আমি রেগে যাই। আর ও চটাস চটাস করে বিউটি হজমি খেতেই থাকে।

আমি বাসায় এসে রুশ দেশের উপকথা নিয়ে বসি। ছোট্ট গোল রুটি, চলেছে গুটি গুটি। ইশ্ আবার খাবার কথা। অন্য গল্প পড়ি। বোকা আইভানের গল্প- একই গল্প বার বার পড়তে আমার ভালো লাগে- নতুন মজা, নতুন সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু আজকের দিনটি কী বিচ্ছিরি – ঘড়িটা খালি ধীরে চলছে, যেন অথর্ব বুড়ি, হাঁটতেই পারছে না।

দেখি পাভেল, রাসেল ম্যাচ বাক্স দিয়ে গাড়ি গাড়ি খেলছে। ওদের প্রখর কাল্পনাশক্তি- এই ম্যাচ বাক্সই আবার একটু পর হেলিকপ্টার হয়ে যাবে। রাসেল এসে বললো, ‘আপুমণি, বলাকা চকলেট আছে, খাবে’? ‘ইশ আমি রোজা, আর তোমরা বলাকা চকলেট খাচ্ছ’? সবাই কী শক্রতা করছে! আমি মায়ের পেছনে দৌড়াই, ‘আম্মা আজকে কী ইফতার? শুধু ছোলা, পিঁয়াজু হবে?
আম্মা মুচকি হেসে বলে, ‘হ্যাঁ, তাই তো’। পাভেল দৌড়ে এসে বলে, ‘না আজকে অনেক ইফতার হবে। চপ, তোমার পছন্দের বেগুনি সব হবে’। ‘যাক তবে রোজা রাখা সার্থক। আম্মা বলছে ইফতারির ঢের বাকি। একটু বসে হাতের লেখা মকশো করো, নামতাগুলো লিখো, সময় চলে যাবে’।
ইশ্ রোজা রেখে কেউ বুঝি পড়ে? আমি বুঝি এতো বোকা! আম্মার সামনে থেকে দৌড়াই। রেডিও ছাড়া হয়েছে – একটু পর অনুরোধের আসর শুরু হবে। ঠিক সময় কেটে যাবে।

রান্নাঘর থেকে ইফতারির আয়োজন টের পাওয়া যায় আজ। আম্মা বলেন, রান্নাটা একটু দেখলে তো কাজে লাগে! না ক্লাসের পড়া, না ঘরের কাজ! শুধু গল্পের বই আর গল্পের বই। অথচ স্কুলের রেজাল্ট আমার খুব ভালো, তাও নাকি পড়তে হবে। তবে এটা ঠিক, ক্লাসের পড়ার চেয়ে রান্না দেখাও ভালো। আমি রান্নাঘরে দেখি আলু সেদ্ধ দিয়ে মাথা মাখা মাখা করে ছোলা ভাজা হচ্ছে, একটু টক স্বাদ আনার জন্য তাতে আবার টমেটো কেটে দেওয়া হলো। লোহার কড়াইতে অল্প জ্বালে ছোলা রান্না হচ্ছে। সহজ কাজ। এবার আম্মা চপ বানাতে বসেছে- আলুর চপের ভেতর ঠেসে ডিম ঝুরি, বেরেশতা আর ধনেপাতা দেওয়া হলো। তারপর ডিমে গড়িয়ে বিস্কুটের গুড়ো মাখিয়ে ডুবো তুলো ভেজে রাখছে। আম্মা এক আইটেম শেষ না হতেই অন্য আইটেমের রান্নায় যোগান দিচ্ছে।

আজকে আছে পিঁয়াজু আর খাস্তা বেগুনি। চালের গুড়ো আর বেসনের ঝাল মিশ্রণে বেগুন ডুবিয়ে ভাজলে যা মজাদার বেগুনি হয় না! আম্মার হাতের বেগুনি অসাধারণ, রোজায় বেগুনের দাম চড়া- তাই বেগুনি হয় কালে ভদ্রে।
আমি আম্মাকে বলছি, ‘আজ কিন্তু অনেক বেগুনি বানাবে’। আম্মা বললো, ‘আচ্ছা। এখন সাবধানে ছোলাটা নেড়ে দাও, সাবধান, ঢাকনা খুললে যেন ভাঁপ না লাগে। তারপর কয়েকটা খেজুর পানিতে ভেজাও। শসাগুলোও ধুয়ে নাও’।

ইশ্ আমাকে দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে- আমি না রোজা! আমি বুঝে গেছি আমাকে মেয়ে বানানোর গভীর ষড়যন্ত্র করছে আম্মা। ঘড়ি এবার বেশ জোরে হাঁটছে, সত্যি সাড়ে চারটা বেজে গেল। আব্বা পাতিলে শরবত বানাচ্ছে আজ আমার প্রথম রোজা বলে, মহা উৎসাহ তার। পাভেল, রাসেল সবাইকে ডেকে আব্বা বাসা সরগরম করে রাখছে। একজন লেবু নিয়ে দাঁড়িয়ে। আর একজন চিনির কৌটা নিয়ে।

আব্বা টুকটুক করে শরবৎ নাড়ছে, কাগুজি লেবুর সুগন্ধে বাসা প্লাবিত। বাসায় ফ্রিজ নেই, আব্বা বাজার খুঁজে এক চাক বরফ নিয়ে এসেছে- তার ভেতরে শরবতের বোতল ঢুকিয়ে রাখা হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে শরবৎ এ ঠাণ্ডাই। দুদিন আগে আমার ছোট চাচা ‘স্কোয়াশ’ নামের ম্যাজিক বোতল দিয়ে গেছে- আজ স্কোয়াশের শরবতও হচ্ছে। আরো আছে লাল রঙের রুহ আফজা। সব বরফের চাকে ঢোকানো হলো। হঠাৎ আব্বার মনে পড়লো, এ যাহ্ জিলাপি তো আনা হলো না! মেয়ের প্রথম রোজা বলে কথা।

আব্বা বাজারে বেরিয়ে গেল- আম্মা পেছন থেকে বললো, ‘দরকার নেই, আমি নারকেলের পুলি পিঠে বানিয়েছি’। উফ্ আম্মার পেটে পেটে এতো রহস্য, নারকেল পুলিও আজ হয়েছে। ইফতারির সময় হচ্ছে না কেন? আম্মার মনে পড়লো কাঁচা ছোলার কথা। কাঁচা ছোলার সাথে আদা কুচি, লেবু পুদিনা পাতা দিয়ে এক রকম মজাদার সালাদ বানানো হয় সেটা নাকি খুব উপকারী। জিলাপী আনতে গিয়ে আব্বা চারটা কমলাও নিয়ে আসলো। প্লেটে প্লেটে ইফতার সাজানো হচ্ছে- অল্প আঁচে চুলোয় পেঁয়াজু আর বেগুনি রাখা আছে মচমচে ভাবের জন্য। সব ইফতারি টেবিলে আনা হলে ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই অবস্থা। প্লেটে প্লেটে ইফতার সাজানো হচ্ছে। এর মধ্যে নানুর বাসা থেকে খিচুড়ি এলো।

আযানের আগে আগে ফকির এসেছে। দুই ভাইকে নিয়ে আব্বা নিচে তাদের বসাতে গেছে। ইফতারের আর মাত্র ২ মিনিট। সবাই আমরা টেবিলে অপেক্ষায় প্লেটে প্লেটে ইফতার সাজানো আছে। আযানের সাথে সাথে আমি শুধু শরবৎ খাচ্ছি, আর কিছুই খেতে পারছি না। না চপ, না পিঠে, এমনকি বেগুনিও। আম্মা বললো, এগুলো হচ্ছে চোখের ক্ষিদে, দেখন ক্ষিদে। দু- তিনটা আইটেমের বেশি ইফতারিতে কিছু রাখতে নেই।

ইফতারির পর মোহাম্মদপুরের তিনতলা বাড়ির বারান্দায় বসেছি আমরা। সন্ধ্যে ঘন হয়ে নেমেছে। বাসার সব লাইট নিভিয়ে দেওয়া হলো গরম কম লাগবে। খোলা হাওয়া দৌড়ে যাচ্ছে। দূরে দেখা যাচ্ছে আকাশ আর মাঠ একসাথে মিশে যেন কানে কানে কথা বলছে। মেঘরা মানে আমাদের বাড়ির পোষা মেঘরা নিচু হয়ে উড়ে যাচ্ছে। বারান্দায় চাঁদের মুখটা হাসি-খুশি, যেন আমার একমাত্র ডলপুতুল সে।

পাভেল বলে চাঁদটা নাকি তার ফুটবল, আর রাসেল ভাবে, তার হারিয়ে যাওয়া বেলুনটাই আকাশে চাঁদ হয়েছে। আমরা তিন ভাইবোনই চাঁদের দিকে তাকাই। বাতাসে ভেসে আসছে কামিনী ফুলের গন্ধ। সবার মন ভালো।
কিন্তু আমি কাঁদছি –হু হু। ধূসর আঁধার চমকে ওঠে। আব্বা বললেন, ‘কী হলো মা, ইফতার পছন্দ হয় নাই’?
‘না এতো ইফতার –অনেক মজা। হু হু’
তাহলে? ঝাল হয়েছে? পেট ব্যথা করছে? আম্মা জানতে চান।
‘না ঝাল হয় নাই, হু হু, হু হু’। আমার কান্না বাড়তে থাকে।
‘আরে আরে কাঁদো কেন’? এবার পাভেল, রাসেলও অস্থির হয়।
‘আমি বেগুনি খেয়েছি, আমার কী হবে?
‘বেগুনি তো সবাই খেয়েছি, তো কী হয়েছে? বেগুনি তো খারাপ হয় নাই মা। তোমার মায়ের হাতের বেগুনি তো দারুণ’। আব্বা সান্ত্বনা দেন।
‘না আমি ইফতারির এক মিনিট আগে বেগুনি খেয়েছি। আযানের একটু আগে। ১টা খেয়েছি, হু হু, কিন্তু আমার কী হবে?

আমার কান্নার ‘হু হু’ শব্দ ছাপিয়ে সবার হা হা হাসি শোনা যাচ্ছে। আমার কান্না আরও বেড়ে যায়, হু হু করেই যাচ্ছি। পাভেল অংকে মহাপণ্ডিত, সেই ছোট্ট পাভেল সমাধান দেয়, ‘কাল তুমি ১ মিনিট পর ইফতারি খেও। ব্যস’।

আব্বা বলছে, ‘কিছু হবে না। তোমার রোযা হয়েছে, হুজুররা তো শরবৎ খেয়ে আযান দেন।

এখনও ইফতারির টেবিলে সবার প্লেটে বেগুনি সাজানোর সময় শুনতে পাই, ‘হু হু, আমি আযানের এক মিনিট আগে বেগুনি খেয়েছি। একটা, কিন্তু আযানের আগে, হু হু’।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১,৬১৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.