গৃহবধুরা কারও বোঝা নয়, বরং রাষ্ট্র-সমাজ আমাদের কাছে ঋণী

0

ফারজানা আকসা জহুরা:

কয়েক মাস আগে একজন নারী আমাকে বলেছিলেন; “আপনি তো এমনেই স্বামীর বোঝা, সারা জীবন স্বামীর বোঝা হয়েই থাকবেন, কাল যদি এক্সিডেন্ট স্বামী মারা যায়, তাহলে কি সারাজীবন বাচ্চাকে বুকের দুধ খাইয়ে মানুষ করতে পারবেন?”

কথাগুলো শুনে ঐ নারীর প্রোফাইল চেক করেছিলাম। তিনি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ করছেন, হয়তো চাকরিও করেন।

গত বছর বিদেশে পড়তে আসা এক উচ্চশিক্ষিত ছাত্র বলেছিল যে আমি নাকি ঘরে বসে বসে শুধু বাচ্চা পালি! তেমন কোনো কাজ করি না!

না, আমি এগুলি কথা তেমন একটা গায়ে লাগাই না! কারণ আমরা যারা ঘর-সংসারের কাজ করি তাদের সকলকে এই ধরনের নোংরা কথা প্রায় শুনতে হয়। তবুও কেন জানি এদের মতো মানুষের চিন্তাভাবনা দেখে অবাক হই!

অবশ্য এটাও বুঝি যে, সমস্যা এদের না, আমাদের শিক্ষা ও সমাজ ব্যবস্থার। যেখানে সন্তান লালনপালন ও ঘর সংসারের কাজগুলোকে কোনো কাজ হিসেবে ধরা হয় না!

আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মানুষেই মনে করেন, হাউজওয়াইফ মানেই মুখ ভর্তি মেকআপ করে, সারাদিন শপিং করে, অবসরে হিন্দি সিরিয়াল দেখে কান্নাকাটি করা কিছু মানুষ! যারা ঘরে বসে বসে শুধু সন্তান লালনপালন ছাড়া তেমন কোনো কাজ করে না! এরা হলো স্বামী ও সমাজের একটা বোঝা! আচ্ছা, আসলেই কি তাই?

আমার দুটো সন্তন আছে; একটার তিন বছর, আরেকজন পাঁচ বছরের। আমার বাসায় কোনো গৃহকর্মি নেই। গত পাঁচ বছর ধরে সংসারের ও সন্তানদের সব ধরনের কাজ আমাকে করতে হচ্ছে। ভাববেন না আমার স্বামী আরাম করে দিন কাটায়। তিনি সকল ৯’টা থেকে রাত ১২’টা পর্যন্ত কাজ করেন এবং ছুটির দিনে ঘরের কাজে যতটুকু সম্ভব সাহয্য করেন।

আমি যখন প্রেগন্যান্ট ছিলাম তখন খাটের উপর পা তুলে ঘরের ভিতর আরাম আয়েশ করে সময় পার করতে পারিনি। খুব ইচ্ছে হতো কেউ আমার সেবাযত্ন করুক, আমার জন্য নানা পদের রান্না করে খাওয়াক, সবাই আমাকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকুক! আমারও বেবি শাওয়ার হোক, আমিও সেজেগুজে কুটু কুটু টাইপের ছবি তুলি! কিন্তু না ওসব কিছুই হয়নি।

অবশ্য বাংলাদেশে থাকলে বাসায় দুই/একজন গৃহকর্মি থাকতো, যে সকালে এসে নাস্তা বানিয়ে দিতেন, ঘর পরিষ্কার করতেন, কাপড় ধুতেন, মসলা পিষে দিতেন, কিংবা নানা ধরনের কাজ করে আমাকে সংসারের কাজে সহযোগিতা করতেন। আর মা বাবা থাকলে তো কথাই ছিল না, সারাদিন তারা আমার সেবাযত্ন করতেন, কি তাই না? আর যদি আমি চাকরি করতাম, তাহলে আমার বাচ্চা সংসার তো সবাই তারাই সামলাতো।

এতে হয়তো আমার কিছুটা সাহয্য হতো, নিজের জন্য কিছু সময় পেতাম। নিজের টাকা আয় করে খেতে পারতাম। কিন্তু দুঃখজনক হলো আমার এই সুযোগ-সুবিধা কোনোটাই নেই।
ভাববেন না আমি একমাত্র নারী যার অবস্থা এমন, বরং আমার তো নারীর সংখ্যা শুধু বাংলাদেশে কেন, সমগ্র পৃথিবীতেই বেশি!

এই যে সন্তান লালনপালন কিংবা তাদের জন্য এতো এতো কষ্ট, কোনোটা নিয়ে আমার তেমন কোনো দুঃখ নেই। কিন্তু যখন কেউ বলে,
তুমি কী করো?
তুমি কী চাকরি করো?
তুমি তো স্বামীর ঘাড়ে বসে খাও?
ঘরে এতো কাজ কীসের?
বাচ্চা পালা আবার কোনো কাজ হলো নাকি?
ব্লা ব্লা ব্লা, তখন সত্যি মেজাজটা ভীষণ খারাপ হয়। আচ্ছা আমার জীবন কি তুমি যাপন করো? না আমার মতো তোমাকে এতো এতো দায়-দায়িত্ব পালন করতে হয়?

কবে এই সমাজ বুঝবে যে ঘরের কাজও কাজ, এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় কাজ?
আমি যদি রান্না না করি কোনো দেবদূত এসে আমাদের জন্য রান্না করে দিবে না।

ভেবো না রান্না আবার কাজ কীসের? তাহলে বলি, রান্নার জন্য তরকারি লাগে, যা আমার স্বামী যোগাড় করে, সেই তরকারি কেটে কুটে ধুয়ে মসলা পাতি তৈরি করে তবেই আমাকে রান্না করতে হয়। আমার তো দশ-বিশজন সহায়তাকারী নেই যে সবকিছু করে রাখবে, আর আমি শুধু খুন্তি নাড়বো?
হাঁড়ি, পাতিল, থালা, বাসন থেকে শুরু করে টয়লেট পরিষ্কার সবই এই দুই হাতে করতে হয়। আমার ঘর সংসারে যাবতীয় কাজ আমাকেই করতে হয়, কোনো দেবদূত এসে আমার কাজগুলো করে দেয় না। না আমার বাচ্চাদের হাগুমুতু পরিষ্কার করে দেয়!

হ্যাঁ, এখন তুমি বলবে তো এগুলি আবার কাজ কীসের? এগুলি কোনো কাজের মধ্যে পড়ে নাকি?
তাহলে শোনো, আমার বাচ্চা হাগুমুতু পরিষ্কার যদি কাজ না হয়, তাহলে তো বাচ্চারা ঐ হাগুমুতু মধ্যে পড়ে থেকে অসুস্থ হয়ে এক সময় মারা যাবে। সে তো জন্ম গ্রহণ করেই নিজের হাগুমুতু নিজে পরিষ্কার করতে শেখেনি।না তুমি জন্মের পরপর আয় রোজগার করতে শিখেছিলে?

তোমাকে লালনপালন করে হাগুমুতু পরিষ্কার করে দুধ খাইয়ে কাউকে না কাউকে তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়েছিল। তার পরে তোমার শিক্ষা তোমাকে যোগ্য করেছে। আর এখন তুমি বড় হয়ে ঐ নিত্যকর্মগুলোকে অকাজ হিসেবে প্রমাণ করছো? বলি তোমার মা বাবা কি তোমাকে লালনপালন করে একটা কাজ করেছিলেন? নাকি অকাজ করে জীবনটা নষ্ট করেছেন?

বহু কাল ধরে এই সমাজ ঘরের কাজকে কাজ না হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
কেন জানো?
কারণ সমাজ যদি ঘরের কাজকে কাজ বলতো তাহলে তো নারীদের শোষণ করতে পারতো না। নারীদের অবমূল্যায়ন করতে পারতো না। নারীদের অবদানকে ছোট করে দেখাতে পারতো না। না, নারী উপরে পুরুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারতো!

এই যে প্রায়ই তোমরা নারীদের বোঝা বলে চালিয়ে দাও, আদৌ কি নারী পুরুষের বোঝা?
যুগের পর যুগ নারীর কাজকে কোন কাজ না বলে, নারীকে ঘরের কাজে ইচ্ছে মতন ব্যবহার করে নারীকে পুরুষের বোঝা বলে চালিয়ে দেওয়া কি পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা নয়? এই চিন্তা কি নারীর প্রতি বৈষম্য নয়?

আমি বলছি না যে, নারী শুধু ঘরের কাজ করবে, তার জীবন চার দেয়ালে বন্দি থাকবে। কিন্তু যে নারী ঘরসংসারের দায়ভারে জর্জরিত তাকে তুমি কেমনে বাইরের কাজও চাপিয়ে দাও? তার ঘরসংসারে কাজগুলোকে কীভাবে অকাজ হিসেবে ঘোষণা দাও?

ঘরের কাজকে মূল্যায়ন করতে না পারা এটা সমাজ আর রাষ্ট্রের সমস্যা। এই দায়ভার তো আমার নয়, সমাজ আর রাষ্ট্রের। এই সমাজ রাষ্ট্র বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের সন্তান জন্ম দিতে হয়, তাদের লালনপালন করে মানুষ বানাতে হয়।

ভেবো না, নারী শুধু বিয়ের পরে স্বামীর ঘরের কাজ করে। নারী বিয়ের আগেও বাবা মায়ের সংসারে কাজ করে। প্রতিটা মানব সন্তান গর্ভধারণ থেকে শুরু করে তাকে জন্মদান, তার লালনপালন, তার হাগুমুতু পরিষ্কার, তাকে বুকের দুধ দেওয়া সবাই গুরত্বপূর্ণ কাজ। তুমি এগুলোকে অকাজ বলো কেমন করে?

এই যে যত আবিষ্কারক আর বৈজ্ঞানিকের জন্ম হয়েছে, তারা কি সব আকাশ থেকে মাটিতে পড়েছিল? নাকি তাদের ৪০/৪২ সপ্তাহ মায়ের পেটে রাখতে হয়ছিল? আর তারা কি সব মায়ের পেট থেকে বের হয়েই বৈজ্ঞানিক হয়ে গেছে? নাকি আমাদের মত মানুষেরা তাদের হাগুমুতু পরিষ্কার করে বুকের দুধ খাইয়ে লালনপালন করে বড় করেছে?

এখন তোমরা বলবে, সংসার দুজনের, দুইজন মিলে করবেন। তাহলে তোমাদের অবগতির জন্য বলি যে; সংসার দুইজনের বলেই দুইজন সকল দায় দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিবে। কে কোনদিকটা সামলাবে, কতখানি সামলাবে, এটা তাদের হিসেব নিকাশ। কিন্তু সমস্যা হলো এই হিসেবে সব সময় নারীকে ঠকানো হয়।

একদিকে নারীকে বলা হয় ঘরের কাজ কোনো কাজ না, অন্যদিকে পাহাড় সমান কাজ তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তার শ্রমকে, সামাজগঠনে তার ভূমিকাকে অবমূল্যায়ন করা হয়। এসব থেকে বেরিয়ে যে নারী চাকরি করে কিংবা আয়-রোজগার করে, তাদেরকেও ঘরের কাজের সমস্ত দায় বহন করতে হয়। নারী যদি সন্তান ধারণ করতে চায়, তাহলে ঐ সন্তান তো তাকে পেটে রাখতে হবে, তার উপরে সংসারের সমস্ত কাজ আর আয়-রোজগারের বোঝাও তাকেই বহন করতে হবে?

কিন্তু কেন?
সন্তান কি তার একার?
যদি দুইজনের সন্তান হয়, কেন দুইজন তার দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করবে না?
রাষ্ট্র কেন তার ভবিষ্যৎ নাগরিকের লালনপালনকে কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দিবে না?
কেন ঘর সংসারের কাজগুলোকে কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দিবে না?
আর কেনোই বা যে সন্তানের লালনপালনের কাজটি করবে, সাংসারিক কাজগুলো করবে, তাকে ও তার কাজকে অবমূল্যায়ন করা হবে?
কেন তাকে প্রতি পদে পদে শুনতে হবে আমরা হাউজ ওয়াইফরা কোনো কাজ করি না?
আমরা সমাজের বোঝা?

বরং আমি বলতে চাই আমি, আমরা, হাউজ ওয়াইফরা স্বামীর কেন, কোনো দেশ বা রষ্ট্রেরই বোঝা নয়, উল্টো এই সমাজ এই দেশ, এই রাষ্ট্র আমাদের কাছে ঋণী।

শেয়ার করুন:
  • 379
  •  
  •  
  •  
  •  
    379
    Shares

লেখাটি ৬৯৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.