যখন আর ফেরার পথ থাকবে না …

0

আফসানা কিশোয়ার:

মানুষ এখন ডাটা খায়, তথ্যসমৃদ্ধ জিনিস পড়তে তাদের ব্যাপক আগ্রহ, আর আগ্রহ আছে লিংকে, যে কোন কিছু লিখবেন, বলবে “লিংক হবে লিংক”!

আজকে ব্যক্তিগত পরিসরে কথা বলার জন্য এতো কথার অবতারণা-আমার চল্লিশের উপর বয়স, ১২ বছর বয়স থেকে ইভটিজিং সয়ে, মোকাবেলা করে, কর্মক্ষেত্রে জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্যের প্রতিরোধ করে তবেই আজকের আমি।

আফসানা কিশোয়ার

– ৬ই মে রাতে আমি অফিসের মিটিং থেকে ফিরছিলাম, নানা কারণে সেদিন আমার নিজের গাড়ি নেয়া হয়নি,যার গাড়িতে এলাম সেই ড্রাইভার খতম তারাবি পড়তে যাবে বিধায় আমি নেমে গেলাম। তারপর কিছুতেই রিকশা বা সিএনজি পাই না। হাঁটছি বহু বছরের অনভ্যস্ত পায়ে। ফুটপাত ধরেই হাঁটছি, কই যাস কই যাস বলে কিছু চ্যাংড়া আমার জীবন অস্থির করে তুললো, এতো ক্লান্ত গরমে, মিটিং শেষে ঘুরে আর মারতে ইচ্ছা করেনি। শুধু মনে হলো লাভ কী!

-অফিসে গ্যাঞ্জাম লেগেছে, ব্যাপার কিছুই না, আগের দিন এক গ্রাহক যে টাকা নিয়েছে তার ভেতর ছেঁড়া নোট পড়েছে, অফিসার টাকা চেঞ্জ করে দিতে দিতে বলেছে স্যার, আপনি গতকাল কাউন্টার ত্যাগের পূর্বে টাকা দেখে নেয়া উচিৎ ছিলো। অন্য অফিসার মিটমাটের আশায় গিয়ে জাস্ট বলেছে স্যার আপনার অভিযোগ থাকলে ম্যানেজার ম্যাডাম কে বলেন।

তার উত্তর, মহিলা ম্যানেজার? আমার যত সমস্যাই হোক আমি মহিলা ম্যানেজারের কাছে যাবো না। মহিলাদের জন্যই এই অবস্থা।

-নিজের বাসার ছাদে রাতে চাঁদ দেখতে গিয়েছি,পাশের বিল্ডিং এ মাদ্রাসা আজকে অনেক বছর, সেখান থেকে ভেসে এলো, এই শালী এতো রাতে ছাদে কী! তারপর গায়ে পানি মারার চেষ্টা, সরে গেলাম বলে গায়ে পড়লো না।
বকা দিলাম, ছ্যাঁত করে লাইট নিভিয়ে পর্দা টেনে আসামীরা সরে গেল।

এই হলো অবস্থা!

১০ ফুট বাই ৮ ফুট রুমে তিন চারজন বাচ্চা, চরম গরম, এদের ভোর ৪টা থেকে রাত ১২ টা পর্যন্ত পড়াশোনা চলে, বিশেষ বিশেষ দিনে তারা সেই বাসায় মাইক লাগায়, ঘুমানোর কোন উপায় আমাদের বাসায় নেই। বাসার চারপাশে কয়েক টন ময়লা ফেলা।

সামনে রেলওয়ের জায়গা দখল করে মসজিদ। ভোর থেকে মাইক দিয়ে উন্নয়ন কাজে দান চাওয়া শুরু হয়।

আমার আজকাল রাগ হয় না। লক্ষ লক্ষ বাচ্চার জন্য অন্তর পোড়ে, এরা এমন ব্যবস্থায় বন্দী যেখানে মায়ের বয়সী নারীকে শালী বলতে বাঁধে না।

রাস্তা দিয়ে হাঁটলে কই যাস কই যাস বলে ১৮-২০ এর ছোকরা ৪০ এর নারীকে নির্দ্বিধায় ঘিরে ধরে, মহিলা ম্যানেজারকে নিয়ে তীব্র বিদ্বেষ অন্তরে ফেরি করে ফেরে দেখতে আপাত সিভিলাইজড মানুষ।

এক যাত্রাবাড়ী থেকে কাঁচপুর এই ৮ কিলোমিটার এলাকায় ৬৬ কওমী মাদ্রাসা।
এক বেসরকারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী কওমী মাদ্রাসায় ৫৩ লক্ষ ছেলে মেয়ে পড়ছে। পড়ুক আপত্তি নেই। গভঃ এর এদের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই,তা নিয়ে আমাদের মতো পাতি মানুষদের বলার কিছু নেই। কওমী,কিন্ডারগার্টেন,ইংলিশ মিডিয়াম,বাংলা মিডিয়াম কেউ নৈতিকতা শিখছে না কেন?

শিক্ষা বাচ্চাদের অধিকার ছিল, সেই বাচ্চারা প্রাইমারি স্কুলে পড়ুক আর মাদ্রাসায় পড়ুক, কী ইংলিশ মিডিয়ামে, আমাদের রাজনীতিবিদদের ক্ষমতায় টিকে থাকার হাতিয়ার হওয়ায় সর্বত্র শিক্ষার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।

যারা কওমীর হোস্টেলে থাকে তারা অধিকাংশ মানবেতর জীবন যাপন করে। ওরা যত্রতত্র ময়লা না ফেলা, অন্যকে সম্মানের বিষয় কোথায় শিখবে? ওদের খেলার জায়গা নেই, দেশীয় মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, এক নারী বিদ্বেষ আর পৃথিবীর সবাই বিধর্মী এই এক বোধ নিয়ে গড়ে ওঠে। ওরা তো আমাকে আওয়াজ দেবেই।

পারলৌকিক কাজ অবশ্যই যার যার ধর্মানুসারে সবাই পালন করবে, সেজন্য মানব শিশুর সব সুযোগ সুবিধা কেড়ে নিতে হবে?

আমার মা কেমোথেরাপি দিয়ে এসে ভোর ৪টা থেকে শুরু হওয়া এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য একদিনও শান্তিতে ঘুমাতে পারেনি। কী যে দৌরাত্ম্য! বাসার কেউ ছাদে যেতে পারি না, হয় গায়ে থুতু দিচ্ছে, না হয় কলম ছুঁঁড়ে মারছে। কতদিন বলেছি, বাবারা এমন করে না, ভদ্র হও। কে শোনে কার কথা!

পুরা দেশটা একটা নারদখানা নারীদের জন্য তো বটেই, পুরুষদের জন্যও। বেশিরভাগ পুরুষ নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবার এক বায়বীয় পরাবাস্তব স্বপ্নে বলে বসে টিজিং রেইপ সব দেশে হয়, আসো ভিডিও দেখাই, হে নারী ও পুরুষ মানবসন্তানকূল, বিপদ সবার। মোকাবেলা সবাইকে করতে হবে। প্রতিটা ইস্যুতে অন্য কেউ আপনার হয়ে আন্দোলন করবে এ ধারণা থেকে বের হয়ে আসুন।

আমাদেরও বয়স হচ্ছে, আমাদেরও আছে মানবীয় ক্লান্তি, মধ্যবিত্তের ভণ্ডামি ও নিস্পৃহতার গবাক্ষ গলে কী দৈত্য যে তৈরি হয়েছে তা আর মাত্র দুবছর গেলেই সবাই বুঝবে, তখন আর ফেরার পথ থাকবে না এটাই যা অসুবিধা।

শেয়ার করুন:
  • 61
  •  
  •  
  •  
  •  
    61
    Shares

লেখাটি ৪৬৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.