“খারাপ মা” – পঙ্গু সমাজের পঙ্গু দৃষ্টি

0

লতিফা আকতার:

মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা তীব্র। সন্তান হিসেবে হরহামেশা উপলব্ধি করেছি। এখনও করি। তবে সবচেয়ে বেশি করেছি রোকেয়া হলের জীবনে। জীবনে বাড়ি ছেড়ে প্রথম থাকা। আমাদের বরিশালের লোকজনের হোম সিকনেস প্রচণ্ড। আমরা বরিশাইল্যা স্টাইল এ খাই, ঘুমাই এবং মরিও। আমাদের সময় রোকেয়া হলে কার্ড ফোনের নতুন বুথ দিয়েছে। আর আমার মাসিক খরচের অনেকটা চলে যেতো তার পিছনে। আম্মা কেমন আছো? এই একটা প্রশ্নের উত্তর জানতে প্রতিদিন চলে যেতো ইউনিট এর পর ইউনিট। আর মায়ের কাছে এটা পাগলামি মনে হতো। হাসতেন। সেই হাসিতে আদরের ছোঁয়া ছিলো।

আর সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা কতোখানি তীব্র সেটা বুঝেছি নিজে মা হওয়ার পরে। মা হওয়ার পর একটা নারীর জগত সন্তানকে ঘিরে ঘুরতে থাকে। আর কর্মজীবী মা বলে অস্থিরতাটা বেশি থাকে। দীর্ঘক্ষণ ছোট বাচ্চাকে রেখে বাইরে থাকতে বাধ্য হওয়া মায়ের কষ্ট আবার অন্য রকম। তার উপর যদি পারিবারিক সাপোর্ট না থাকে। অধিকাংশ নারীই বায়োলজিক্যালি মা হওয়ার পাশাপাশি তীব্রভাবে মানসিক দিক দিয়েও মা হয়ে ওঠে। সে এক পরম বিস্ময়। নারী জীবনের এক বিশাল বৈচিত্র্য।

এক নারী জীবনের বহু বৈচিত্র্যের সমাহার। মাতৃত্বেও এর শেষ নাই। এই অভিজ্ঞতায় মা শব্দটির সাথে নানান বিশেষণ যুক্ত হয়। সহকারিবিহীন মা, কর্মজীবী মা, সিঙ্গেল মাদার, সন্তানের সাথে মানিয়ে চলতে চলতে হাঁপিয়ে ওঠা ক্লান্ত মা।

মাকে সবসময় সর্বংসহা হতে হয়। হাঁপিয়ে ওঠা, ক্লান্ত হওয়া বা নিজস্ব কোনো চাওয়া পাওয়া থাকতে হয় না। এ কথা কিভাবে চালু হয়েছে, কে বা কারা চালু করেছে তা আমার জানা নেই। তবে যে চালু করেছে এবং যাঁরা এখনো এই মতবাদে বহাল আছে, তাদের মানসিকতার স্বাভাবিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এই প্রচলিত ধারণা নারীর জন্য মোটেও সুখকর নয়।

আর এই অ-সুখকর পরিস্থিতির কারণে মায়ের সাথে যুক্ত হয় ভালো মন্দ শব্দদ্বয়। আর এটা আসে একজন মা হওয়া নারীর আশপাশের পরিবেশের কারণে। সে কেমন পরিবেশে বাস করে সেটা বিরাট ফ্যাক্ট। যদিও আমরা পুরোপুরি এক জাজমেন্টাল সমাজে বাস করি। যেখানে মাতৃত্ব ও হরহামেশা প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হয়।

আমরা মধ্যম আয়ের দেশে বাস করি । আর এটা তো সেদিনের কথা। এই অবদানে ভূমিকা রাখা অধিকাংশ মানুষগুলো নিম্ন আয়ের পরিবার হতে উঠে আসা। আর এ ধরনের পরিবারে সবচাইতে কঠিন সময় পার করা মানুষটি হলো মা। যে কিনা অধিকাংশ সময়ই নিজের মৌলিক চাহিদার সাথে আপোস করে সন্তানকে পুষ্টি যুগিয়ে গেছে এবং এখনো যায়। সকল সুবিধা বহাল থাকা অবস্থায় সন্তান জন্মদান এবং মানুষ করা আর সুবিধা বঞ্চিত পরিবেশে একজন নারীর মা হয়ে ওঠা এক নয়। শারীরিক মানসিক পরিবর্তনের এই সময় ব্যক্তির নিজের যত্নের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ক’জন পিতা এবং তাঁর পরিবারের সদস্য বুঝতে পারে?? এ সময় ও বহু নারী কে অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। নারীর খুব একটা মুক্তি নাই।

সংগ্রাম করতে করতে ঘুরে দাঁড়ানো একজন নারী যখন সংসার ছাড়ে, তখন এ সমাজে সিঙ্গেল মাদার শব্দটার আড়ালে তার আর সব পরিচয় ঢাকা পরে যায়। এই ধামা ধরা সমাজ ব্যবস্থায় একজন সিঙ্গেল মাদার কে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করে সন্তান কে বড় করে তুলতে হয়। চিরচেনা ঘর, চিরচেনা মানুষের পরিবর্তিত রুপের সাথে সাথে সমাজের কঠিন রুপ সামনে এসে দাঁড়ায়। আর সে অবস্থায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে খুব কম জন ই এগিয়ে আসে।

সাহায্য সহযোগিতা ছাড়া বলতে গেলে একক প্রচেষ্টায় সন্তানকে বড় করে তোলা এই মায়ের জন্য ধাক্কা আসে পরবর্তী ধাপে। সন্তানের নানান অভিযোগ শুনতে হয়, নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। অধিকাংশ সময়ই এসব বাচ্চারা মায়ের সম্পর্কে নেতিবাচক কথা শুনে বড় হয়। আর এটা করে থাকে তার চারপাশের পরিচিত, কাছের লোকজন। সত্যি এ সমাজ পারেও।

সিঙ্গেল মাদার এর সন্তানদের বলছি- মাকে নিয়ে অভিযোগ করার আগে চিন্তা করুন। পরিণত দুইটি ব্যক্তির সম্পর্কে অবনতি আসতে পারে। সম্মানের প্রশ্নে আপোষ না করে একজন নারী ঘর ছাড়তে পারে। কিন্তু সন্তানের দায়িত্ব উভয়ের। অথচ মায়ের উপর পুরো দোষ চাপিয়ে, আপনার পিতৃদেব আপনার খোঁজ না নিয়ে এক অর্থে ভারমুক্ত জীবন যাপন করলেন। এটা কিন্তু এক ধরণের চালাকি। আপনার প্রতি তাঁর কোনো মায়া নাই। সে আপনাকে অনুভব করে না। কিন্তু মা অনুভব করে বলে- সারাটা জীবন আপনাকে মানুষ করার জন্য প্রচুর টেনশন নিয়েছেন, জীবনের অর্জিত অর্থ ব্যয়সহ জীবনের সবচাইতে মূল্যবান সময় আপনাকে দিয়েছেন। আর সেই মাকে মা হিসেবে খারাপ বিশেষণে ভূষিত করার আগে শ’বার চিন্তা করবেন।

আর এই সমাজের পিতার বাড়ির সদস্যদের বলছি, একজন নারী- বউ, স্ত্রী কিংবা আইনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভালো নাও হতে পারে। তাঁর উপর আপনার নানান আক্রোশ থাকতে পারে। কিন্তু তাকে শিক্ষা দিতে গিয়ে বাচ্চাদের ব্যবহার করবেন না। বাচ্চারা একটা নির্ধারিত সময়ের পূর্বের স্মৃতি মনে করতে পারে না। সে ভুলে যায় তাঁর মা কতো রাত ঘুমায়নি। তাঁর পটি কতোবার পরিস্কার করেছে। পেটে নিয়ে কতোবার বমি করেছে। হাজারও কাজ করেছে। আর সে সময় পিতৃদেব বন্ধুদের সাথে গল্প করেছে, টিভি দেখেছে। পরের দিন অফিসের নাম করে অন্য রুমে গিয়ে ঘুমিয়েছে। তাই সন্তানের সামনে হাসিচ্ছলে হলে ও মা কি কি পারে না বা মা ভালো না এসব বলা হতে বিরত থাকুন।

মা সে হাউজ ওয়াইফ, কর্মজীবী, ডিভোর্সি কিংবা বিধবা যাই তাঁর পরিচয় হোক না কেন- একটা বিষয়ে কমন- আর তা হলো মাতৃত্ব। মা কখনো খারাপ হয় না। খারাপ উপমা দেয় পঙ্গু সমাজ।

সকল কে মা দিবসের শুভেচ্ছা।

শেয়ার করুন:
  • 159
  •  
  •  
  •  
  •  
    159
    Shares

লেখাটি ৯০৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.