নিঃসঙ্গ দম্পতি ও মহাজন ঈশ্বর

0

রিমা দাস:

অতঃপর মেয়েটি ঋতুবতী হইয়া উঠিলে ঘরে আনন্দের ঢেউ খেলিয়া গেলো। মা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়িলেন, বলিলেন –” যাক বাবা মেয়েটা ঠিক আছে, কোন চিন্তা নাই, এবার বিয়ের জন্য পাত্র দেখা যায়”। মেয়েটি বুঝতে পারে না তার এই প্রচণ্ড ও ভয়াবহ কষ্টে মা কেমন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকায় মেয়েটি। মেয়েটির বুকে কষ্টের উথাল পাতাল খেলা । মন খারাপ নিয়ে সে তার মায়ের সামনে থেকে চলে যায়। অভিমানে মুখ ভার করে ঘরে বসে থাকে, আর চিন্তা করে এই মা কি সত্যি আমার?

সেদিনের ছোট্ট মেয়েটি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, আর প্রতি মাসের নির্দিষ্ট সার্কেলে সে শুনে তার মা বলছেন — আমার নাতি হয়েছে নাকি? মা’এর এই কথার মানে যখন মেয়ে বুঝতে শিখলো তখন তার একটু একটু লজ্জা আর ভালোলাগা জন্ম নিতে শুরু করলো। সেই সাথে মাঝে মাঝে রাগও হতো মায়ের উপর। বলা নেই কওয়া নেই মেয়েকে তিনি সবার সামনে এমনভাবে উপস্থাপন করতেন যেনো মেয়ে এক্ষুনি একটি সন্তান জন্ম দিতে পারবে। মা তো, তাই মেয়েটি নিরবেই রাখতো তার অনুভূতিগুলো।

রিমা দাস

দিন গড়িয়ে রাত, রাত গড়িয়ে সপ্তাহ, সপ্তাহ গড়িয়ে মাস, মাস গড়িয়ে বছর, বছরের পর বছর এভাবে কাটতেই থাকলো একই গতিতে, একই নিয়মে।

ধরে নেই মেয়ের নাম মহুয়া। মহুয়া এই সমাজের আর দশটা মেয়ের মত সাধারণ, খুব সাধারণ। জন্মের পর মেয়ে হয়ে জন্মাবার কারণেই তার ভেতরে মাতৃত্বের অনুভূতি প্রবল, মেয়ে হয়ে জন্মাবার কারণেই তার ভেতরে বাৎসল্য প্রবল। সে এই প্রাবল্য নিয়ে মাঝে মাঝে হিমশিম খায়। তার খুব কষ্ট হয় যখন সে দেখে কোন ছোট্ট বাচ্চা কাঁদছে বা ব্যথা পায়। প্রকৃতি মহুয়াকে দু’হাত উজাড় করে ভালোবাসা দিয়েছে। অদৃশ্য মহাজন ঈশ্বর মহুয়ার মনে স্বপ্ন বীজ বুনে দিয়েছেন। যখন থেকে সে নিজের একটা পৃথিবীর স্বপ্ন দেখা শুরু করলো তখন থেকেই তার মনোজগতের পৃথিবীতে সে একা নয়, তার সাথে রয়েছে দেবশিশুরা। তবে তারা মায়ের পছন্দের নাতি নয়, তার পছন্দের নাতনিরা।

দিন ক্ষণ দেখে শুভ লগ্নে মহুয়াকে পাত্রস্থ করা হলো। মহুয়ার স্বপ্নের আবাসে সে এখন একা নয়, তারা দুজন, মহুয়া আর মানব। মানবকে পেয়ে মহুয়ার স্বপ্নবীজ কুঁড়ি মেলতে শুরু করলো। সারাদিন দুজনের কলকাকলীতে কখন তারা তাদের বিবাহিত জীবনের চার বছর কাটিয়ে দিলো টেরই পেলো না। অনেকদিন পর মেয়ে মায়ের কাছে গেলে মা তাকে অনেক প্রশ্ন করলেন। মহুয়া সব প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে রাগ করে মা’এর সামনে থেকে চলে গেলো। নিজ ঘরের অন্ধকারে মহুয়া দাঁড়ালো মহুয়ার সামনে। অনেক প্রশ্নের উত্তর পেলো না সে। তবে সে তার দেবশিশুদের কথা ভোলেনি। এই চার বছরে তার দেবশিশুরা তার এতো কাছে এসেছে, এতো কাছে যে চাইলেই তাদের সে আনতে পারবে।

মানবের কাছে ফিরেই মহুয়া মানবকে তার স্বপ্নের কথা বলতে লাগলো। বলতে লাগলো তার দেবশিশুদের কথা। দুজন মিলে ঝগড়া করলো মেয়ে শিশু আর ছেলে শিশুর জন্য। মহাজন ঈশ্বর তাদের ভাগ্যে কী লিখে রেখেছেন তা তারা তখনও জানে না। দুজনে মিলে গেলো ডাক্তারের কাছে। এখানে ওখানে সেখানে। আবারও দিন গড়াতে লাগলো মাসে, মাস বছরে। কেটে গেলো আরও চার বছর। তখনও মহুয়া মানব সংসারে দুজন, দুই থেকে চার, চার থেকে ছয় হয়নি। আত্মীয় স্বজনের পরামর্শে এদিক ওদিক, এটা ওটা, এখানে সেখানে যেতে যেতে কেটে গেলো আরও আট বছর।

ষোল বছরের বিবাহিত জীবন কাটিয়ে মহুয়া নিজেকে আর নিজের মাঝে খুঁজে পায় না। সে বুঝতে পারে তাকে সবাই এড়িয়ে চলে। সে যখনই কোন দেবশিশুর কাছে যায়, সেই দেব শিশুর বাবা মা তখন তাদের সন্তানকে মহুয়ার কাছে যেতে দেয় না, বা তারা এমন কিছু বলে তাতে মহুয়া নিজেই সরে আসে। মহুয়া, ঋতুবতী মহুয়া কোন কারণ ছাড়াই দেবশিশুদের “মা” হতে না পারার কারণে একা হতে থাকে। এখন আর মানব মহুয়ার কলতান শোনা যায় না। এখন সেখানে শুধুই দীর্ঘশ্বাস।

কেটে যায় আরও আট বছর। মহুয়ার চুলের রং ধূসর হতে হতে সাদা হয়। চোখে মুখে বলিরেখা, শীর্ণ হয় হাত, দৃষ্টি হয় ঝাপসা। তবুও তার স্বপ্নে সে এখনও ঋতুবতী। সে স্বপ্ন দেখে দেবশিশুর। সেই স্বপ্নে মানব আর মহুয়া সবুজ ঘাসে দেবশিশুদের নিয়ে খেলে করে।

ফেইসবুকের পাতায় পাতায় মা দিবস আর বাবা দিবসে সন্তানরা যখন তাদের বাবা মা’কে ভালোবাসা জানায়, তখন তারা জনারণ্য থেকে লুকিয়ে যায়, বেদনার বালুচরে তখন শুধু নোনা জলের আহাজারি। কেউ দেখে না সেই সমুদ্রের প্লাবন, কেউ বুঝে না সমুদ্রাভ্যন্তরে ঝড়ের আঘাত।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১,৪৭৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.