মায়ের যত দোষ আর অভিজ্ঞতার অভাব!

0

মাহজাবীন ফেরদৌস মিথুন:

মাকে নিয়ে উদযাপন আমার বেশ ভালো লাগে। তাঁর জন্মদিন, তাঁর প্রথম চাকরিতে যোগদান দিবস, রিটায়ারমেন্ট দিবস, মা দিবস এমন দিনগুলোকে আলাদাভাবে সেলিব্রেট করলে আম্মু আমার খুব খুশি হয়।

আমি নিজেও এখন মা। আমিও অপেক্ষা করে আছি যে মেয়ে আমার বড় হয়ে আমাকে নিয়েও সেলিব্রেট করবে! সে যাই হোক। আজকে লিখছি অন্য একটা কারণে। মা’দেরকে এমনিতে এসব দিবসে খুব গ্লোরিফাই করা হলেও আদতে আমাদের সমাজে মায়েরা কতটুকুই বা কী পায়! বছরের অন্য দিনগুলো তারা কেমন থাকেন? আমরা কী তাদেরকে তাদের প্রাপ্যটা দিতে পারি সবসময়?

মায়েদের ব্যাপারে যে শুধু সন্তানই সব ভূমিকা পালন করবে তা কিন্তু না। একটা মায়ের মা হয়ে ওঠার জার্নিটা যে কেমন তা মা হওয়ার আগে আসলেই এতটা উপলব্ধি করিনি। একজন নারী বা পুরুষ হঠাৎ করেই মা অথবা বাবা হয়ে ওঠেনা। ধীরে ধীরে তারা মা-বাবা হন। তারা নানাভাবে তৈরী হন, হতে থাকেন, শেখেন এবং এই শেখা চলতেই থাকে।

কিন্তু এই সমাজটাতে সন্তান ভূমিষ্ট হবার আগে থেকেই যে মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে একজন নারীকে যেতে হয় তা অকল্পনীয়। সন্তান জন্ম নেবার পর সেই চাপ বাড়ে আরও কয়েকগুণ। এ জগত সংসারে মায়েদেরই সব দোষ। সন্তানের সকল অসংগতি, গাফিলতি, অসুস্থতা, বদ আচরণের জন্য দায়ী শুধু মায়েরাই। হয়তো সন্তানের জন্মের পর পেট খারাপ। দোষ মায়ের। কেন ভাজাপোড়া খেয়েছিলো মা গর্ভাবস্থায়? সন্তানের ডাউনসিনড্রোম। অমাবশ্যায় ঘোরাঘুরির প্রভাব।

সন্তানের ঠোঁট কাটা? চন্দ্র/ সূর্য গ্রহণে মায়ের খাদ্য গ্রহণের ফল। সন্তান জেদী? মায়ের ব্যবহার ভালো না তাই। সন্তানের ওপর খারাপ নজর নাকি মায়ের থেকেই সবচে বেশি লাগে! এরকম হাজার উদাহরণ আছে যেখানে শুধুমাত্র মা এবং মা-ই দায়ী!

আপনি জানেন কী যে মা হবার জন্য বায়োলজিক্যাল ব্যাপার স্যাপারের বাইরেও আরও কতরকম সামাজিক যোগ্যতা থাকতে হয়! জানেন না? তাহলে লেখাটি আপনার জন্যই! জেনে নিন ভালো মা হওয়ার অনেক অনেক উপায়। মা হতে হলে আপনাকে অবশ্যই প্রথমদিনই জ্বী সন্তান ভূমিষ্ট হবার প্রথম মিনিট থেকেই তাকে দুধ খাওয়াতে হবে এবং দুধ কিভাবে খাওয়াতে হয় তা জানতে হবে। তানাহলে দেখবেন আপনার সন্তানের শুভাকাঙ্ক্ষীরূপে অনেকেই আপনি কেন দুধ ধরাতে পারছেন না কিংবা বাচ্চা যে গর্ভাবস্থায় আপনারই উদাসীনতার কারণে এখন দুধ পাচ্ছে না তা বলতে হাজির হয়ে যাবে! তখন তখনই বাচ্চা না খেলে যে মরে যাবে না কিংবা এটা যে কিঞ্চিত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার তা স্বয়ং ডাক্তার বললেও তারা কিছুতেই মানবেন না।

বাচ্চাকে কীভাবে কোলে নিতে হয় তা জানতে হবে। যদিও সেই যথার্থভাবে কোলে নেওয়ার পদ্ধতিটা যে আসলে কী তা আপনি কিছুতেই নাও ধরতে পারেন। কেননা আপনি ছাড়া আর সব মুরুব্বিরাই বাচ্চা সহীহভাবে কোলে নেন।

নতুন বাচ্চাকে কিভাবে গোসল করাতে হয় তা আপনাকে প্রথম থেকেই অবশ্যই জানতে হবে। কোন ভুল করা চলবেনা। কারণ মুরুব্বীগণ নিজেরা পয়দা হওয়ার সময় থেকেই এগুলো জানেন। তাই তারা পারলে আপনি কোথাকার কে যে ভুল করবেন?

বাচ্চার জন্মের পর তার নজর লাগে এবং সেই নজর থেকে শুধু কালো ফোটা বা টিপই পারে তাকে রক্ষা করতে। এক্ষেত্রে অতি পরহেজগার মানুষও বাচ্চার রক্ষাকর্তা হিসেবে সৃষ্টিকর্তারও আগে সেই টিপের মাযেযা বেশি বলে মনে করবেন। আপনি যদি তাঁদেরকে ভিন্ন দেশের কোটি কোটি শিশু যারা টিপ ছাড়াই দিব্বি বেঁচেবর্তে আছে সেই উদাহরণও দেন তাতেও লাভ হবেনা। সুতরাং আপনাকে নজর থেকে রক্ষার এই উপায় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে হবে।

আপনি কী এও জানেন যে বাচ্চা যে জন্মের প্রথম তিনমাস মোটামুটি ভালোই কান্নাকাটি করে তা যে জ্বীন ভূতের আছরের জন্যে! আপনি যদি জেনে থাকেন যে এই কান্না শিশুরা প্রথম তিন মাস কেঁদে থাকে ওদের পেটে গ্যাস যেটাকে বলা হয় কলিক পেইন সেটার জন্য তাহলে আপনি কিছুই জানেননা। এসবই হয় ভূতের জন্য।

উপরিল্লিখিত বিষয়গুলো শুধুমাত্র ছিটেফোঁটা! প্রেগনেন্সি এবং বাচ্চাপালন নিয়ে এমন শত শত মিথ, কুসংস্কার এবং সামাজিক এক্সপেকটেশনের চাপে পড়ে এদিকে নতুন মা গুলোর হয় নাজেহাল অবস্থা। সবার ক্ষেত্রেই এমন হয় তা নয়, কিন্তু আমাদের দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এ চিত্র সাধারণ। একজন নারী একদম প্রথম থেকেই ‘মা’ হয়ে যাননা। এটি একটি প্রসেস যার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে ধীরে ধীরে তিনি মা হয়ে ওঠেন। সন্তান জন্মদান একটি সময়সাপেক্ষ এবং কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এর মধ্য দিয়ে নারীর শরীর ও মনোজগতে অভাবনীয় পরিবর্তন আসে। আসে সামাজিক অবস্থানেও পরিবর্তন।

এই পরিবর্তনগুলোর সাথে খাপ খাওয়ানোর সুযোগ পাবার আগেই শুরু হয়ে যায় তার ‘মা’ হিসেবে করণীয় একশ একটা কাজ এবং যা তাকে অবশ্যই সুনিপুণভাবে করতে হবে সেই এক্সপেকটেশন। ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায় যে, বাচ্চা কাঁদলে মায়ের দোষ, বাচ্চা না খেলে মায়ের দোষ, বাচ্চা শুকনা হলে মায়ের দোষ, মোটা হলে মায়ের দোষ, স্কুলে যেতে না চাইলে মায়ের দোষ, বখে গেলে মায়ের দোষ ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি ! এভাবে চলতে চলতে একসময় মা গুলো হয়ে যায় একেকজন পাথর। সর্বংসহা। কারণ আর কত ফাইট করবে এসব অহেতুক অবমাননার বিরুদ্ধে? দিনশেষে তো এই কথা শোনানো কোকিলেরা বাচ্চা পেলে দিয়ে যায়না, সন্তানকে তো লালন করতে হয় ওই মা-কেই!

অবশ্যই সবার অভিজ্ঞতা এক না। কিন্তু তাই বলে এই ঘটনাগুলোও ঘটেনা তা না। মাদেরকে অহেতুক যন্ত্রণা না দিয়ে আসুন আমরা তাদের সাহায্য করি শুধু সাহায্য করার মানসিকতা থেকেই। নিজেদের মায়ের পাশাপাশি আমাদের আশপাশের মাগুলোকেও ভালো রাখি।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.