‘আমি মায়ের মতো ত্যাগী নই’

0

শান্তা মারিয়া:

প্রতিবছর মা দিবস এলেই বেশ কিছু কথা বার্তা শোনা যায়, ফেসবুক ভেসে যায় মায়ের ছবি দিয়ে। শুধু মা দিবসে নয়, এমনিতেও মা সম্পর্কে আমরা অনেক সময় অনেক কথা বলি। মায়ের মহত্ত্ব, ত্যাগ, কষ্ট, যন্ত্রণা নিয়ে কথা বলি। আমি এবার এসব বহুল আলোচিত কথা বাদ দিয়ে নিজস্ব কিছু কথা বলতে চাই। হয়তো কথাগুলো আমাদের গতানুগতিক ধারণার সঙ্গে মিলবে না, হয়তো অনেকে রাগও হবেন, বিরক্তও হবেন।

প্রথমেই বলি, আমি নিজে একজন মা। কিন্তু এটা আমার জীবনের বেলায় প্রথম বা চরম কথা নয়। আমি প্রথমে একজন স্বতন্ত্র মানুষ, তারপর মা। আমার সন্তান যেদিন জন্ম নিল সেদিন থেকে আমার সব চাওয়া-পাওয়া, ক্যারিয়ার, উচ্চাশা, শেষ হয়ে যায়নি। আমি নিজের স্বাস্থ্যের কথা ভেবেছি, নিজের চাকরি, লেখালেখি, সৌন্দর্য, পোশাক, সাজসজ্জা, ব্যাংকের টাকা সবকিছু নিয়েই ভেবেছি। আমি আমার সন্তানের মধ্যেই কেবল প্রত্যাশার সকল পূর্ণতার সন্ধান করে বেড়াইনি। আমার জীবনের অপ্রাপ্তিগুলো সন্তানের মধ্যে পূরণ করার স্বপ্নও দেখিনি।

আমার সন্তান একজন আলাদা মানুষ। তার নিজস্ব জীবন, নিজস্ব মেধা, নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ থাকবে এটা আমার মনে হতো ওর জন্মের পর থেকেই। মোটকথা ও আমার মতো হবে না, ও হবে ওর নিজের মতোই। আমার একটিই সন্তান। কোন ভ্রুণহত্যা করিনি। দ্বিতীয়বার সন্তানধারণও করিনি। কারণ আমার কাছে মনে হয়েছিল সন্তানধারণ বেশ কষ্টকর, জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। একজনই যথেষ্ট। দুতিনটি সন্তানের প্রতিপালন বেশ ব্যয়বহুলও। আমার সন্তানের দেখাশুনো আমার মা ও বাবা করতেন। দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দিয়ে তাদের উপর আরও চাপ সৃষ্টি করতেও চাইনি।

আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন মায়ের মুখে প্রায়ই শুনতাম তিনি তার চাকরি, ক্যারিয়ার সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন আমাদের দুই ভাইবোনের জন্য। আমাদের জন্মের পর আমাদেরকে ঘিরেই ছিল তার জীবন। তিনি ছিলেন খুব মেধাবী মানুষ। অথচ সন্তান ও সংসারের জন্য নিজের বিকাশ ঘটাতে পারেননি।
এই কথাগুলো আমার মধ্যে একধরনের অপরাধবোধ সৃষ্টি করতো।

‘আমি কখনও আমার মায়ের মতো হতে চাইনি। আমি চাইনি সন্তানের জন্য সবকিছু ত্যাগ করে, আবার সেজন্য সন্তানকে পরোক্ষভাবে দায়ী করে একটা অতৃপ্তজীবন কাটাতে। বস্তুত পুরুষতান্ত্রিক সমাজ প্রতিটি মায়ের মনে এই ধারণা খুব শক্ত করে গেঁথে দিতে চায় যে, তুমি মা। তোমার জীবন এখন সন্তানকে নিয়ে। তোমার আর নিজস্ব ব্যক্তিত্ব বিকাশের, নিজস্ব জীবন যাপনের কোন প্রয়োজন নেই। এখানে নারীর মাতৃত্বকেই তার শ্রেষ্ঠ লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এই মানসিকতা থেকেই সন্তানহীন নারীর জীবনকে অপূর্ণ বা ব্যর্থ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস চলে। সন্তানধারণই নারী জীবনের সার্থকতা জাতীয় আদর্শ ফলাও করে প্রচার করা হয়। আমি কখনও এই আদর্শকে বিশ্বাস করিনি। মা অথবা বাবা নয়, মানুষের জীবনযাপন করতে চেয়েছি আমি।’’

আমার মনে হতো আমাদের জন্যই (হয়তো আমার জন্যই) মা অতি সাধারণ হিসেবে জীবন যাপন করতে বাধ্য হলেন। আমার মা আমাদের জন্য জীবনের সকল নিজস্ব চাহিদা ত্যাগ করেছিলেন। তার বিনিময়ে তিনি আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ চাইতেন। তিনি বাবার জীবন যেমন নিয়ন্ত্রণ করেছেন তেমনি আমার ও ভাইয়ের জীবনও নিয়ন্ত্রণ করতে চাইতেন। তিনি আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে এতই চিন্তিত থাকতেন যে, কখনও আমাকে বিদেশে পড়তে যেতে দিতে চাননি, আমাকে ঢাকার বাইরে ডাক্তারি পড়তে দেননি (সরকারি মেডিকেল কলেজে সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও)। তিনি পুরো পরিবারকে তার পক্ষতলে রাখতে চাইতেন।

সত্যি কথা হলো, আমার মা একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান মানুষ ছিলেন। তিনি যদি আমাদেরকে একটু কম ভালোবেসে নিজেকে একটু বেশি ভালোবাসতেন, তাহলে আজ তিনি দেশের একজন বিখ্যাত ব্যক্তি হতেন। তার ত্যাগ স্বীকারকে ছোট বলে মনে করি না। কিন্তু আমি মনে করি, তিনি এতোটা ত্যাগ স্বীকার না করে যদি নিজেকে আরেকটু বেশি ভালোবাসতেন তাহলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তার মেধার মূল্যায়ন হতো। তিনি এদেশের বিখ্যাত বিজ্ঞানী বা শিক্ষক হতে পারতেন। আমাদের অতিরিক্ত ভালোবাসার কারণেই আজ তিনি সমাজের মূল্যায়ন পাননি। এই আত্মত্যাগের কোন প্রয়োজন ছিল না।

আমি কখনও আমার মায়ের মতো হতে চাইনি। আমি চাইনি সন্তানের জন্য সবকিছু ত্যাগ করে, আবার সেজন্য সন্তানকে পরোক্ষভাবে দায়ী করে একটা অতৃপ্তজীবন কাটাতে। বস্তুত পুরুষতান্ত্রিক সমাজ প্রতিটি মায়ের মনে এই ধারণা খুব শক্ত করে গেঁথে দিতে চায় যে, তুমি মা। তোমার জীবন এখন সন্তানকে নিয়ে। তোমার আর নিজস্ব ব্যক্তিত্ব বিকাশের, নিজস্ব জীবন যাপনের কোন প্রয়োজন নেই।

এখানে নারীর মাতৃত্বকেই তার শ্রেষ্ঠ লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এই মানসিকতা থেকেই সন্তানহীন নারীর জীবনকে অপূর্ণ বা ব্যর্থ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস চলে। সন্তানধারণই নারী জীবনের সার্থকতা জাতীয় আদর্শ ফলাও করে প্রচার করা হয়। আমি কখনও এই আদর্শকে বিশ্বাস করিনি।
মা অথবা বাবা নয়, মানুষের জীবনযাপন করতে চেয়েছি আমি।

আমার ছেলের বয়স এখন বিশ বছর। এই বিশ বছরে আমি কি আমার সন্তানের জন্য তাহলে কোনই ত্যাগ স্বীকার করিনি?

আমার অতি কষ্টে উপার্জিত অর্থের একটা বড় অংশ তার লেখাপড়া ও অন্যান্য চাহিদা মেটাতে ব্যয় করেছি, এখনও করে চলেছি। তার যত্ন, আরাম, অসুস্থতায় সেবা, বিনোদন, মানসিক বিকাশ এসব কিছুর জন্য অনেক সময় ব্যয় ও পরিশ্রম করে চলেছি। ছোটবেলায় অসংখ্য বই তাকে পড়ে শুনিয়েছি। কিন্তু এসবের পাশাপাশি আমি নিজের জীবনটাও উপভোগ করছি। আমি নিজের পছন্দমতো খাবার খাই, ছেলে সময় না পেলে বা যেতে না চাইলে আমি একাই বেড়াই, বই পড়ে, সিনেমা দেখে নিজের আনন্দে সময় ব্যয় করি। ছেলের জন্য যেমন অর্থব্যয় করি তেমনি নিজের জন্য্ও করি। সন্তানের পাশাপাশি আমার মা, বাবা, ভাই, স্পাউস, বন্ধু, সহকর্মীরাও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। আমার রাজনৈতিক, সামাজিক দায়িত্বপালনকেও জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করি।

আমার সন্তান আমার জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বটে কিন্তু সে-ই আমার সম্পূর্ণ জীবন নয়। আমার জীবন আমারই। তার ব্যক্তিগত বিষয়ে আমি যেমন ইন্টারফেয়ার করি না, তেমনি আমার ব্যক্তিগত বিষয়েও সে ইন্টারফেয়ার করে না। সে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষের অধিকারগুলোকে সম্মান করে। আমাকে মা হিসেবে, বন্ধু হিসেবে এবং ব্যক্তিমানুষ হিসেবে সম্মান করে।

ছেলে যখন নিজস্ব সংসার গঠন করবে তখন আমি তার সঙ্গে একসাথে থাকতে চাই না। সে নিজেই নিজের প্রেমিকা, বান্ধবী বা স্ত্রী খুঁজে নিক। আমি চাই সে তার স্ত্রীকে সময় দিক। আমি অবসর জীবনটা নিজের মতো করেই কাটাবো। সন্তান আমার সম্পত্তি নয়, সে আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু।
আমি একজন মা। কিন্তু আমার জীবনটা সন্তানকেন্দ্রিক নয়, আত্ম-কেন্দ্রিক।

আমি মা দিবসে মায়েদের বলতে চাই, সন্তানকে ভালোবাসুন তবে নিজেকেও ভালোবাসুন।

শেয়ার করুন:
  • 86
  •  
  •  
  •  
  •  
    86
    Shares

লেখাটি ৫৭৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.