মা ও একটি বুদবুদ

0

শাহাব আহমেদ:

আজ মা দিবস, কিন্তু মায়ের চেহারাটি আমি এখন আর মনে করতে পারি না। আমি শৈশবের অনেক কথা মনে করতে পারি, আমি যুদ্ধের কথা মনে করতে পারি, কিন্তু আমার মায়ের কথা মনে পড়ে না। গ্রোসারি বা সুপার মার্কেটের রিসিটগুলো যেমন কিছুদিন পড়ে ঝাপসা হয়ে যায়, লেখাগুলো আর পড়া যায় না বরং একটি মলিন সাদা কাগজ ছাড়া তাকে আর কিছু বলে চেনা যায় না, আমার মায়ের স্মৃতি তেমনি।

আমার মা ছিলেন একজন খুব সাধারণ মানুষ। আমাদের একান্নবর্তী বিশাল পরিবারের একজন অবৈতনিক পেট চুক্তির কর্মচারি। আমার পিতা ছিলেন ক্ষণজন্মা এক কর্মী পুরুষ। সেই যুগে এই ধরনের পুরুষদের সমাজের প্রতি কমিটমেন্টের তালিকা যত বাড়ে, তাদের স্ত্রীদের তত বেশি নীরবে নিভৃতে কাজ করেই জীবন কাটে। ঠাকুর বাড়ীর মৃণালিনী দেবীর মতই ছিলেন আমার মা, এক গাদা সন্তান -সন্ততি আত্মীয় -স্বজন মান-সম্মান যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটাই অগুরুত্বপূর্ণ সেই সবকিছুর সোল্ ম্যানেজার।

ছবিটি সীমান্ত রায়ের আঁকা, ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

আমার মাকে “গো-মাতা”ও বলা যায়, কারণ গরু যেমন কথা বলে না, মাও তাই। হয়তো যখন কথা বলার সময় ছিল, তখন কথা বলতে চেয়েছেন, কিন্তু তার দোর্দণ্ড প্রতাপশালী স্বামী বা দেবরগণ বিষয়টি সময়মতো মিটমাট করে দিয়েছেন। তাই তার সন্তানদের পিঠে যখন বৃষ্টির মতো বেত পড়ে তখন তিনি রান্না ঘরে নীরবে অশ্রু ফেলেন। তিনি অবুঝ নন, বুঝতে পারেন যে লাঠি ছাড়া গরু হাল টানে না, বেত ছাড়া সন্তানও মানুষ হয় না। বর্তমান কালের অনেক নারীর মতো আমার মা ঘরের ফার্নিচার ছিলেন না, ছিলেন অন্য কিছু।

মা লেখাপড়া জানতেন না। কাক ভোরে উঠে লাকড়ির ধোঁয়ায় চোখ ফুলিয়ে সবার জন্য নাস্তা বানাতেন। সবার খাওয়া শেষ হলে যখন তার খাবার সময় আসতো, তখন দেখা যেত কিছু নেই। দাদি বলতেন, “ঠিক আছে বৌ, দুপুরে একটু বেশি করে খেয়ে নিও।”

থালা বাসন হাঁড়ি পাতিল ধুয়ে, আবার রান্না ঘরে ঢুকতেন দুপুরের খাবার তৈরি করতে, তারপরে তৈরি করতেন রাতের খাবার। তখন ফ্রিজ বলে কোন জিনিসের কথা তারা জানতেন না। সোনা দিয়ে ভরার এক মুখ ছিল না, ছিল অসংখ্য মুখ যাদের ভরার পর্যাপ্ত ছাইও ছিলো না। কাপড় ধুতেন পুকুর ঘাটে। হ্যাঁ, জলে নেমে শান্তি পেতেন, কারণ জল ধুয়ে নিয়ে যেত সবকিছু। সব দু:খ, ক্লান্তি। তার কোন অভিযোগ ছিল না। তাকে আমি জায়নামাজেও কাঁদতে দেখিনি। তার কোন চাওয়া ছিল না। বিড়াল কুকুরের আশা প্রত্যাশা থাকতে পারে, কিছু মানুষ খুব অল্পতেই বুঝতে পারে যে তারা বিড়াল কুকুর নয়।

সম্ভবত নিজেই উর্বরা ও ফলবন্ত, অসংখ্য বীজের ধারক ছিলেন বলেই তার হাতে সোনা ফলতো। তার হাত দিয়ে যে বীজটি মাটির গর্ভের স্নেহময়তা পেত, তাই বেডরিয়ে আসতো সীমাহীন শক্তি ও ফলের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। মা তাই গাছ ভালোবাসতেন। মা আমার বর্ষার পুঁই লতায় মোটা মোটা তীব্র সবুজ পুঁই পাতার মত ছিলেন, ছিলেন তরতাজা শিমের মত সুন্দর, সতেজ ও পবিত্র। নিজেকে তিনি ঐ লতা পাতা প্রজাতির বলে চিনতে পেরেছিলেন কিনা জানি না।

মা একবার স্বপ্ন দেখলেন, তাকে একটা মস্ত বড় পাগলা কুকুর ধাওয়া করছে। আমাদের গ্রামের ঝাড়-ফুঁক জানতেন যে “বঙা দাদা” তিনি ঝাড় ফুঁক করে মহা হুলুস্থুল বাঁধিয়ে আমাদের বাড়ির পূর্ব- দক্ষিণ কোণায় যে গাব গাছটি ছিল তাতে মস্ত বড় দুটি গজাল পুঁতে দিলেন হাতুড়ি পিটিয়ে। আমি পাশেই ছিলাম, সেই হাতুড়ির আওয়াজ আজও মনে পড়ে। যেমন মনে পড়ে পূর্বের আকাশে এক রাতে দেখা গনগনে আগুনের লেলিহান মুক্তিবাহিনীর হাতে থানা পুড়িয়ে দেবার পর, কিন্তু আমার মাকে মনে পড়ে না।

সপ্তাহ খানেক পরেই যুদ্ধ লাগলো, আর মাসখানেক পরে বাবা গুলিবিদ্ধ হলেন। জীবন যেমন আমার বৃক্ষবৎ মায়ের শরীরে অজস্র গজাল গেঁথে গেঁথে কষ্ট দিয়েছে, অলুক্ষুনে গাছ বলে তেমনি করে মাতৃবৎ এই গাব গাছটিকে কিইনা কষ্ট দেয়া হয়েছে জ্যান্ত শরীরে গজাল পুঁতে পুঁতে!

গুরুতর আহত আমার বাবাকে বাঁচিয়ে রাখলেন ঢাকা মেডিকেলের যেই মহান ডাক্তার, তিনি অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গী হলেন বিজয়ের দুদিন মাত্র আগে। বাবার বিজয় দেখার কথা ছিল না, কিন্তু বাবা দেখলেন। যার দেখা সম্ভব ছিল তিনি বাবার মতো আরও হাজার মানুষের জীবন বাঁচিয়ে নিজে চলে গেলেন বধ্যভূমিতে।

যুদ্ধ আমাদের একান্নবর্তী পরিবারকে চূড়ান্তভাবে ভেঙে দিল। যে পদ্মা আমাদের চার চারটি বাড়ি গিলে খেয়েও তার তীর ছাড়া করতে পারেনি, যুদ্ধ তা করলো কত সহজেই। আমরা গ্রাম ছেড়ে নারায়ণগঞ্জে চলে এলাম।

সবাই যখন খেলতো আমি বই পড়তাম,
সবাই যখন সিনেমা দেখতো আমি বই পড়তাম।
সবাই যখন কিছু করতো আমি বই পড়তাম,
সবাই যখন কিছু করতো না আমি তখনও বই পড়তাম।

একজন সীমাহীন অকর্মণ্য গ্রন্থকীট যার অশিক্ষিত মা ভাবতো যে লেখাপড়া করে তার ছেলে এক বিরাট “আরকাটি” হবে। মা এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন, তাই যখন সেই বিরাট পরিবার ভেঙে ছোট হয়ে গেছে, যখন তার অর্ধেক সন্ততি ঘরের বাইরে চলে গেছে, যখন তার সময়ের স্বচ্ছলতা এসেছে, যখন তার প্রবল প্রতাপশালী প্রভু-স্বামী পঙ্গু ও বৃদ্ধ, যখন সব প্রতিশ্রুতি এবং স্বপ্নগুলো বুলেট বিদ্ধ করে টুঙিপাড়ায় মাটি চাপা দেয়া হয়েছে এবং বিষবৃক্ষের বপন চলছে বাংলাদেশের আনাচে কানাচে, তখনও আমার মা সাবধানে উঁকি দেয়া স্বাধীনতার মতো আমার কাছে আসতে ভয় পেতো আমার পড়াশুনায় ডিসটার্ব হবে বলে।
অথবা যদি কখনই এসে দাঁড়াতো আমার চেয়ারে পিছনে এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে, বলতো, “বাবা দুধডা খাইয়া ল গরম গরম।” আমি দুধটা পান করতাম, মা চলে যেত। মাকে আমি সেই সময় জড়িয়ে ধরে একটু ভালোবাসা জানাতে পারতাম বা মাও পারতেন, কিন্তু আমার মনে পড়ে না, কিচ্ছু মনে পড়ে না।

আমার স্মৃতি বিশ্বাসঘাতক, পিশাচের চেয়েও পিশাচ, আমার জাতির স্মৃতির আয়না, যা না দেশপ্রেমিক না বিশ্বাসঘাতক কাউকেই মনে রাখে না। আমি এই জীবনে কত কত প্রাণীর দেখা পেয়েছি, কিন্তু কোনদিন কোন ভ্যামপায়ারের দেখা পাইনি, পেলে শুধু একবার দেখে নিতাম আমার মুখের আদল কতটুকু তার মুখের আদল থেকে ভিন্ন!

মায়ের পৃথিবী ছিল খুব ছোট, বিক্রমপুর, নারায়ণগঞ্জ আর ঢাকার বারডেম। না আমার মা সমুদ্র দেখেননি, পাহাড় দেখেননি, নীলগিরি কি পাহাড়, না মেঘ, না পাখি, মা তা কোনদিন জেনে উঠতে পারেননি। আমি পৃথিবী ঘুরে বেড়াই, কত নগর-গ্রাম-অরণ্য-নদী -পাহাড় -সমুদ্র -মহাসমুদ্র দেখি, কত মানুষের সাথে কথা বলি, আমার রোগীদের মায়েরা আমাকে কতো ভালোবাসে, কৃতজ্ঞতা জানায়, তাদের সন্তানদের সুস্থ করে তোলার জন্য, সুচিকিৎসা দেয়ার জন্য। অথচ আমার মা?
আমার মা এক নীল নৈর্বেক্তিকতা।

আমি চলে যাবার পড়েও মা সাত বছর জীবিত ছিলেন। তখন আমাদের বাড়িতে ফোন ছিল না। আর আমার রাশিয়া থেকে দেশে ফোন করার পয়সা ছিল না। দেশে আসার পয়সাও ছিল না। চিঠি লিখতাম, বাবা ভাই বোনেরা উত্তর দিত, মা লিখতে জানতেন না, পড়তে জানতেন না। সুতরাং তার সাথে আমার কোন যোগাযোগ ছিল না। তিনি ছিলেন জীবিত থেকেও মৃত। এখন না জীবিত, না মৃত, শুধু স্মৃতি ও একতাল অনুভূতি।

শাহাব আহমেদ

মা তার এক সন্তান যখন পাকিস্তানে আটকা পড়ে, তখন কেঁদে কেঁদে চোখ ভাসাতেন। তারপর আমি হই তার দ্বিতীয় সন্তান, যার পথ চেয়ে কেঁদে কেঁদে কাটিয়ে দেবেন বাকি জীবন।

মাকে আমি শেষ দেখেছিলাম ১৯৮৮ সালে দেশে গিয়েছিলাম যখন। আগস্টের ২৯ তারিখে। আমি চলে গেলাম, মা কাঁদলেন, আর সেই অশ্রু পরিণত হলো এক অভূতপূর্ব বন্যায়, সারা দেশ ও বাড়ি ডুবে গেল একবুক বন্যার জলে। আমার মা আমার মাতৃভূমির অবিকল প্রতিবিম্ব।

না আর দেখিনি। কোন মানুষের এমনভাবে বেঁচে থাকা কোনদিন কাম্য নয় যখন সে সিন্দাবাদের বুড়োর চেয়েও দু:সহ হয়ে ওঠে তার পরিপার্শ্বিক জগতের কাছে এবং তার সবচেয়ে আপন জনের কাছেও তার মৃত্যু কামনা হয়ে ওঠে সবচেয়ে শুভ কামনা।

৯০ এর ৩০ শে জানুয়ারি একবছর প্যারালাইজড থেকে চলে গেছেন। আমি তখন ডাক্তারি পড়া শেষ করে ইংল্যান্ডের একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করি ওয়েটার হিসেবে। ছোট গাছ একদিন বড় হয়ে যায়, বড় গাছ হয়ে যায় বৃদ্ধ। জীবন বুদবুদ বার্স্ট হয়ে যায়। গোলাপি রং হয়ে যায় নীল, জীবন-বিষের রং মেখে।

কী হয় এতো বই পড়ে, বিদ্যা অর্জন করে যদি তা দূরে সরিয়ে রাখে মায়ের থেকে? যদি তা মাকে কিছুই না দেয়? কী সেই মানুষের দাম যে জীবনের সিদ্ধান্ত নেবার সময় মায়ের মুখটি মনে রাখতে পারে না?

কী সেই মানুষ যে সারা জীবন পৃথিবীর পথে পথে হাঁটে এবং কোনটা মায়ের মুখ, আর কোনটা মাতৃভূমির মুখ তা মালুম করতে পারে না?

শেয়ার করুন:
  • 73
  •  
  •  
  •  
  •  
    73
    Shares

লেখাটি ২৯৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.