মাতৃত্ব যখন আর প্রশ্নাতীত নয়-১

0

সুপ্রীতি ধর:

আমি জানি এই শিরোনাম দেখেই মানুষজন আমাকে গালিগালাজ শুরু করবে। কতবড় স্পর্ধা আমার যে মাতৃত্বের মতোন মহান একটি বিষয়কে অবমাননা করি! অমানবিক বলি! মাতৃত্বের বিরুদ্ধে কথা বলা তো ধর্ম অবমাননার শামিল!

এর আগে যখন আমি রিগ্রেটিং মাদারহুড নিয়ে লিখেছিলাম, তখনও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রে রে করে তেড়ে এসেছিল আমার বিরুদ্ধে। যেন আমি আমার লেখার মধ্য দিয়ে দেশের আপামর নারীকে মা না হওয়ার কুমন্ত্রণা দিয়ে ফেলেছি, এবং তারা সেই মুহূর্তেই দলে দলে সন্তানহীন জীবনযাপনের অঙ্গীকার করে ফেলবে!

মাতৃত্ব যে মহান, এ নিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলার মানুষের অভাব নেই। বিশেষ করে আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে নারীর জীবনে মাতৃত্বকে চাপিয়েই দেয়া হয়। সাহস করে একটিবার যদি সব মেয়েকে জিজ্ঞাসা করা হতো একটিমাত্র প্রশ্ন যে, সে যদি সুযোগ পেতো আরেকবার জীবনে, মা হতে চাইতো কীনা! আমার ধারণা, তারা সকলেই নেতিবাচক উত্তরই দিতো। কারণগুলো নিয়ে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে গবেষণা চলছে, কেন মাতৃত্ব এখন বোঝাস্বরূপ হয়ে উঠেছে? কেন মেয়েরা মা হতে চাইছে না? কেন মা হওয়ার পর একজন মা তার অবস্থানে সুখী থাকতে পারছে না?

মা হওয়ার মধ্য দিয়ে একজন নারী পূর্ণতা পায়, সার্থকতা পায়, এই পুরনো গৎবাঁধা বচন এখন অচল বিশ্বে। কিন্তু আমাদের ভূখণ্ডে এখনও নারীকে এই এক ইস্যুতেই শিকল পরিয়ে রাখা হচ্ছে যুগের পর যুগ ধরে।

শুধু দক্ষিণ এশিয়ার কথাই বা বলি কেন, এই ইউরোপে আসার পর থেকে যতবার যেখানেই আমি আলোচনা করতে গিয়ে রিগ্রেটিং মাদারহুড নিয়ে কথা বলেছি, দেখেছি, নারীদের মুখ কেমন ফ্যাকাশে হয়ে যায়। তারা এই বিষয়টাকে এখানেও ‘ট্যাবু’ হিসেবেই উল্লেখ করেছেন, যদিও নিজেদের জীবনে মাতৃত্বকে কমবেশি ‘বোঝাস্বরূপ’ অনুভব করছেন তারা।

এখানে ভাষাশিক্ষা ক্লাসে বিভিন্ন দেশের মেয়েরা আছে, কমবেশি সবারই সন্তান আছে। সেদিন কথায় কথায় ওদের বলেছিলাম, ‘চলো, আমরা কোথাও থেকে বেড়িয়ে আসি’। ওরা সাথে সাথেই বলে, ‘হ্যাঁ, যেতে চাই, কিন্তু বাচ্চাদের ছাড়া’। ওরা আমার কাছে স্বস্তি পায় অনেকখানি। তাই বলে, ‘যদি একটিবার সুযোগ পেতাম জীবনে, মা হতে চাইতাম না’।

মাতৃত্ব কি তাহলে অমানবিক?
না, সবসময় মাতৃত্ব অমানবিক নয়। মাতৃত্ব তখনই অমানবিক যখন একে নিয়ে সমাজ সংসার ব্ল্যাকমেইল করে, তুমি মা সুতরাং তুমি এটা করতে পারবেনা ওটা করতে পারবে না, সন্তান দেখাই তোমার প্রধান দায়িত্ব, বা তোমারই একমাত্র দায়িত্ব, মাকেই তো স্যাক্রিফাইস করতে হবে, এসব ডায়ালগ যখন বন্ধ হবে, তখন মাতৃত্ব আর অমানবিক হবে না।
সেদিন আমার মনোচিকিৎসকের সাথে কথা হচ্ছিল। তিনি নিজেও সিঙ্গেল মাদার। এখন ৭৭ বছর বয়স। তিনি আমাকে খুব উৎসাহিত করছেন অনেকদিন ধরে যেন আমি আমার নিজের কথাগুলো লিখতে শুরু করি, কীভাবে আমি সমাজ-সংসারের বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে আছি দুটি সন্তান নিয়ে! নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলছিলেন যে, তার অবস্থা ভিন্ন। তিনি রাষ্ট্রীয় সুবিধা পেয়েছেন মা হিসেবে, বিভিন্ন বেনিফিট আছে এর মাঝে। সামাজিক সুযোগ-সুবিধা আছে। স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হলেও স্বামী সন্তানদের দায়িত্ব সমানভাবে ভাগ করে নিয়েছেন। ফলে মাতৃত্ব এবং ক্যারিয়ার, কোনটাই তার বাদ সাধেনি জীবন চালিয়ে নিতে।

এই কথাটি আমিও সবসময় বলার চেষ্টা করি যে, একটি মেয়ে যখন মা হয়, তখন সভ্যসমাজে ওই মেয়েটি কেবল জন্মই দেয় শিশুটিকে, কিন্তু এরপরের যাবতীয় দায়িত্ব নেয় রাষ্ট্র। সেই শিশুটির দেখভাল থেকে শুরু করে সদ্যপ্রসূতি মায়ের যাবতীয় দায়িত্বও রাষ্ট্রের। তাছাড়া মানবিক এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্রগুলোতে সামাজিক সহায়তাও আছে প্রচুর। তারপরও এসব দেশে তরুণদের মধ্যে মা হওয়ার উৎসাহে ভাটা পড়ছে। এর পিছনে অবশ্য মেয়েদের ক্যারিয়ার ভাবনা আছে, সংসার বিমুখতা আছে। সে অন্য প্রসঙ্গ।

আগেই বলেছি, পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে নানারকম গবেষণা চলছে এই মাতৃত্ব, প্যারেন্টিং এবং এমনিক রিগ্রেটিং মাদারহুড নিয়ে। বলা হচ্ছে মাদারহুড নিয়ে যে মিথ সমাজে প্রচলিত আছে সেটিকে এখন বাস্তবতা থেকে আলাদা করার সময় এসেছে।

অনেকেই বলেছেন, ‘একজন মা হিসেবে বাবা-মা এবং সন্তানের মধ্যে যে শক্তিশালী বন্ধন রয়েছে, তা উপলব্ধি করতে পারি। আমি আমার সন্তানকে ভালবাসি, এবং আমি সত্যিকার অর্থেই তাদের জন্য অনেককিছু করতে চাই। সমাজও ভাবে যে, সকল নারীরই একইরকম অনুভূতি তাদের সন্তানের প্রতি, একইরকম অনুভব সীমাহীন, নি:স্বার্থ ভালবাসা। সমাজের ধারণা, এরকমটিই বুঝি বায়োলজিক্যালি প্রোগ্রাম হয়ে আছে সব নারী। কিন্তু সত্য অনেক জটিল’।

মেয়েদের পক্ষে, বিশেষ করে আমাদের উপমহাদেশে একজন মেয়ের পক্ষে ‘মা’ হওয়ার দাবি থেকে সরে দাঁড়ানো সহজ নয়। এর সাথে সংস্কৃতি, ধর্ম, সামাজিকতা অনেকগুলো বিষয় জড়িত। ক্যাথলিকদের ভার্জিন মেরী থেকে শুরু করে সনাতন ধর্মের মাতৃদেবী, এর সবকিছুতেই মাতৃত্বের জয়জয়কার। একে প্রাকৃতিক দাবি হিসেবেই দেখা হয়ে থাকে। নারীত্ব মানেই যেন মা। সন্তানহীনা নারী সমাজে অপাঙক্তেয়, এমন ধারণাই আজতক বদ্ধমূল আমাদের সমাজে। কোনো মেয়ে মা হতে চায় না, এটা সমাজ শুনতেই অভ্যস্ত নয়।

আবার দেখুন না, আমরা আমাদের জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে নিজেদের মাকে ঘৃণা করি, এড়িয়ে চলি। এমন হতে পারে যে, সত্যিই আমাদের মায়েরা বোকা, নয়তো মা হিসেবে তাদের অতি খবরদারি, অথবা কোনকিছুই করতে পারে না, মানে তাদের অক্ষমতা আমাদের মনে তাদের প্রতি একধরনের ঘৃণার সঞ্চার করে। কিন্তু এর মানে এও নয় যে, আমরা এই সম্পর্ককে একেবারে ডিলিট করে দিতে চাই জীবন থেকে।

এই প্রসঙ্গে গবেষকরা বলেছেন, ধরুন, আমাদের বিদ্যমান ভাষা থেকে যদি ‘মা’ বা ‘মাতৃত্ব’ শব্দটি তুলে দেয়া হয়, তাহলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? মেয়েদের মা হওয়া বন্ধ হয়ে যাবে? বা কোনো নারীর মাতৃত্ব নিয়ে রিগ্রেট করা থেমে যাবে? বছর খানেক আগে ব্রিটেন এবং ফ্রান্সে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল যে ‘মা’ শব্দটি অন্য কোনো শব্দ দিয়ে রিপ্লেস করা হবে কীনা! নাকি মা-সন্তানের সম্পর্ককে অন্য কোনো শব্দ দিয়ে বর্ণনা করা হবে? মা শব্দটি নিয়ে যখনই এমন প্রশ্ন উঠেছে, তখন এটাও বলা হয়েছে যে এই শব্দটি না থাকলে অধিকাংশ মানুষই খারাপ বোধ করবে। কিন্তু মা-ই যদি আর না থাকে, তবে শব্দ তো কোন ছার্!

মা-সন্তানের সম্পর্ক কোনো সুইচে চাপ দিয়ে নির্ণয় করা যায় না। এটা ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে তারতম্য হয়। মা যেমন মহান হতে পারে, তেমনি স্বার্থপরও হতে পারে, সন্তানও তাই। ফলাফল হিসেবে মা হওয়ার হার কমছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। যদিও আমাদের দেশে জনসংখ্যার উপচে পড়া হার অন্যরকম তথ্য দেয়। আবার সেখানেও মাতৃত্ব কতোটা কাঙ্খিত বা কতো চাপিয়ে দেয়া, তা নিয়েও বিস্তর গবেষণা প্রয়োজন। উন্নত বিশ্বের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ১৯৭০ সালে জন্ম নেয়া নারীদের মধ্যে শতকরা মাত্র ১৭ ভাগ মা হয়েছে, যেখানে ১৯৪৩ সালে এই সংখ্যা ছিল শতকরা ১২ ভাগ।

(চলবে)

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২৯৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.