ধর্ম শুধুই পুরুষতান্ত্রিকতা প্রয়োগের মোক্ষম হাতিয়ার!

0

লতিফা আকতার:

” ধর্ম ” – শুধুই পুরুষতান্ত্রিকতা বিস্তারে মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে না তো !!!

“Identification” এর সমস্যায় ভোগা মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষের কাছে ধর্ম এক বিশাল তত্ত্ব। যদিও ধর্ম মানুষের বাণী নয়। খোদ ঈশ্বরের বাণী। কিন্তু মানুষ তা আপন আদলে এদিক ওদিক করে নিয়েছে। সৃষ্টির সেরা জীব বলে কথা!! স্বমহিমায় কতো কী করেছে। আর এই আল্লাহ্ ‘র বাণী একটু এদিক ওদিক হলে এ আর এমন কি!!

সমাজের দুটো শ্রেণীর মানুষ নিজের চরিত্রের সনাক্তকরণ সমস্যায় ভোগে না। নিম্নবিত্ত আর একেবারেই উচ্চবিত্ত শ্রেণী। সমস্যা হয় মধ্যবিত্ত শ্রেণী এবং উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের জীবনে। পৃথিবীর সকল মূল্যবোধের আধার এই শ্রেণী। ধর্ম ,শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির ধারক বাহক হতে গিয়ে কিংবা ধারণের ভান করতে গিয়ে এক জগাখিচুড়ি অবস্থা। কখনও এদিক হেলে তো কখনো ওদিক হেলে। আর হেলাহেলি’র সবচাইতে ভুক্তভোগী কন্যা শিশু। যে পরবর্তীতে একজন মানুষ হয়ে উঠতে না পারলেও নারী হয়ে ওঠে। উঠতে বাধ্য হয়।

সাহিত্য, সংস্কৃতির বয়ান ব্যক্তি জীবনে খুব বেশি সমস্যা টেনে আনে না। বরং বেশ লাগে শুনতে। মানলে আর কথাই নাই। কিন্তু ধর্ম?? এই একটা তত্ত্ব যা মানুষ নিজে না মানলেও অন্যকে মানতে বাধ্য করতে সব সময়ই এগিয়ে। যে বাবা-মা নিজের তরুণ বয়সে খুব একটা এর কাছ ঘেঁষেনি- সেও সন্তানকে বাধ্য করে। তার ভুল শুধরে নেয় সন্তানকে ধর্ম পালনে বাধ্য করে। আর এই ভুল শুধরে নেওয়ার পরীক্ষা কন্যা শিশুটির উপর দিয়ে বেশি যায়। যার প্রক্রিয়ার মধ্য নারীকে আমৃত্যু যেতে হয়।

এর জন্য অবশ্য নারীই অনেকটা দায়ী। ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করা এবং তাঁর প্রচারে পুরুষ ই এগিয়ে। ধর্মের আলোকে নারীকে কী কী সুবিধা দেওয়া হয়েছে সে সম্পর্কে নারী খুব একটা অবগত নয়। তাই তাঁর ভিতরে ভয় কাজ করে। আর অজানাকে আমরা ভয় পাই। এটা সহজাত বিষয়। যেমন আমরা অন্ধকারকে ভয় পাই। যদিও ধর্ম আলোর বার্তা নিয়ে আসা বিষয় হলেও নারী তার অজ্ঞতার কারণে অন্ধকারেই জীবন কাটিয়ে গেলো। যায়।

এ সমাজে অধিকাংশ মানুষের বিয়ে ধর্মের আলোকেই হয়। ধর্ম না মানা মানুষটাও বিয়ে করার ক্ষেত্রে ধর্মকে খুব একটা এড়িয়ে যেতে পারে না। কিন্তু পরবর্তীতে সঙ্গীর অধিকার প্রদানে ধর্মের উপস্থিতি কম দেখা যায়। যদিও উচ্চবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের লোকজন -পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি অধিকার প্রদানে ধর্ম নিয়ে খুব একটা টানাটানি করে না। কিন্তু বিপর্যয় বাঁধে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে। আর সেই প্রয়োগে সবচাইতে বৈষম্যের শিকার হয় ঐ সব পরিবারের কন্যা শিশুটি। আর যা তাঁর জন্মক্ষণ হতে শুরু।

কন্যা এবং তাঁর জন্মদাত্রীকে এ সমাজ খুব একটা সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে না। যদিও পরিবারে প্রথম সন্তান কন্যা জন্ম নেওয়া ধর্মের দিক দিয়ে সু দৃষ্টিতে দেখা হয়। বেহেশত নামের স্থানটিতে ঢোকার যে চাবি তাও কিন্তু একজন নারীর কাছে রক্ষিত। ইহজগতে আগমন এবং মৃত্যু পরবর্তি সুখকর স্থান বেহেশত- নারীর মাধ্যমেই নিশ্চিত করা হয়েছ।

ইসলামের মহান নবী- তাঁরও বেঁচে থাকা একমাত্র সন্তান- কন্যা। কন্যা শিশুর জন্মের শুরুটা যাঁর সুখবর বয়ে আনে না, তার নিজের বাকি জীবনও তাঁর সুখকর হয় না। কন্যার সকল কর্মকে ধর্ম নামের অনুবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারা দেখা হয়। কিন্তু সেই অনুবীক্ষণ যন্ত্র তাঁর সহোদর ভাইয়ের ক্ষেত্রে নষ্ট থাকে। অথচ ধর্মে পাপ পূণ্যের ক্ষেত্রে নারী পুরুষকে আলাদা করা হয়নি। পর্দা উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। আর এই পর্দার নামে নারী শিক্ষা, কর্মে পিছিয়ে পড়ে। আর অধিকারের প্রশ্নে, সম্পত্তি প্রদানে কন্যাকে পরিবারের কারোর চোখেই পড়ে না। এখানে ধর্ম অন্ধ। যেমনটা অন্ধ পর্দা পালনে।

পর্দা ভঙ্গের ক্ষেত্রে নারীকে যেভাবে পাপী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, পুরুষকে সেভাবে নয়। পাপ কার্যে ফতোয়ার মাধ্যমে নারী যতো শাস্তির সম্মুখীন হয়েছে, পুরুষ ততোখানি হয়নি। কিন্তু পরকীয়ার মাধ্যমে লিপ্ত পাপ কার্যের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে। সেখানে নারী পুরুষের জন্য আলাদা নয়। কিন্তু প্রয়োগের ফ্যাসাদে শুধু নারীকে পড়তে হয়।

এই অন্ধত্ব চরম আকার ধারণ করে শ্বশুরবাড়িতে। ভরণ পোষণের দলিলে স্বাক্ষর করে আনা হয় পুত্রবধূকে। যে কিনা মধ্যবিত্ত পরিবারে অধিকাংশ সময়ই বিনা মজুরির একজন কর্মী। পরিবারের সকল সদস্যের সেবা করতে বাধ্য করা হয়। অথচ ইসলামের কোথাও পুত্রবধুকে শ্বশুরবাড়িতে উদয়াস্ত পরিশ্রম করার কথা বলা হয়নি। এমনকি সন্তানের লালন পালনে ক্ষেত্রবিশেষে স্বামীর কাছে মজুরি দাবি করতে পারে। এবং স্বামী তা দিতে বাধ্য। কিন্তু ধর্ম প্রচারে এ ধরনের বয়ান শোনা যায় না। মুসলিম রীতি অনুযায়ী বিয়ের সাথে সাথে একজন নারী স্বামীর সম্পত্তির দুই আনা প্রাপ্তির অধিকার নিয়ে গৃহে প্রবেশ করে। অথচ শ্বশুরবাড়িতে তাঁকে পর হিসেবে দেখা হয়। অথচ এই পরের উপার্জিত অর্থ আবার আপনার সবচাইতে আপন। কিন্তু ধর্ম অনুযায়ী একজন নারী তাঁর উপার্জিত অর্থের শতভাগ মালিক। চাইলে খরচে আপনার মতামত নিতে সে বাধ্য নয়।

বাবার বাড়ি, শ্বশুরবাড়িতে অধিকার বঞ্চিত হওয়ার জন্য পুরুষতান্ত্রিকতার পাশাপাশি নারী নিজেও দায়ী। ধর্ম সম্পর্কে তাঁর অজ্ঞতা। যাই হোক রমজান সংযমের মাস। এই সংযম শুধুই খাদ্যের উপর নয়। আপনার সকল রিপুর উপরও প্রযোজ্য। পুত্রবধূর বাবার টাকায় ইফতার খাওয়ার আশায় সংযম রাখুন। ঈদ পরবর্তীতে বিবাহ কার্য সম্পাদনের সময় যৌতুক গ্রহণে সংযমী হোন। স্ত্রীর উপর হাত ওঠানোর আগে শ’বার চিন্তা করুন। বোনের/ কন্যার প্রাপ্য সম্পত্তি হতে বঞ্চিত করার আগে চিন্তা করুন। আর আপনার বাড়িতে আসা মেয়েটি আপনার গৃহে বধূ। দাসী নয়।

ধর্ম মানুষের জন্য। এটা শুধু আপনাদের মানে পুরুষদের হাত শক্তিশালী করার জন্য নয়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৪০৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.