প্রগতিশীলতা, না লেবাস?

0

গুলশান আরা:

বহতা জীবনের একটা স্বাভাবিক ছন্দ আছে … কখনো তা ওঠে, কখনো তা নামে আর কখনো তা নিস্তরঙ্গভাবে এগোয়। অধিকাংশ আকস্মিক ঘটনাই কিন্তু আকস্মিক নয়। কোথাও না কোথাও একটা প্রস্তুতি চলে তার … অজান্তে, অলক্ষ্যে, অগোচরে।

আর সেই প্রস্তুতির কারণেই ঘটনাটা হয়তো স্রেফ ভবিতব্য, কিন্তু ফল তার অবশ্যম্ভাবী। কালের পরিক্রমায় মানুষ প্রতিনিয়ত দেখে চলে জীবনের ভিন্ন ভিন্ন রূপ। জীবন চলার পথে এর প্রয়োজনীয়তা কতখানি তা শুধু স্রষ্টাই বলতে পারেন। কীভাবে তিনি তাঁর সৃষ্টিকে বিভাজিত করেছেন ধর্মীয় আবরণে, এর ব্যাখ্যা তাঁর চেয়ে ভাল বলেন এই সাধ্য কার?

ধর্মান্ধতা ও ধর্মহীনতা এই দুই পক্ষই কিন্তু সমান দোষে দোষী। তবে আমার কাছে মনে হয় সবচেয়ে ক্ষতিকারক হলো ওই পক্ষটা, যারা রথও দেখতে চায়, কলাও বেচতে চায় … মানে আমি মনে মনে সব মানি এমনকি ধর্মগ্রন্থে যা কিছু পরিষ্কারভাবে ভিত্তিহীন তাও মানি নিজের পরকালের সুরক্ষা চিন্তা করে, আবার যেখানে নিজের সুবিধাটা আদায়ের প্রয়োজন সেখানে লেবাস ধরি ‘আমি প্রগতিশীল’।

বড় অদ্ভুত জীব এরা। পৃথিবীর তাবৎ হানাহানির দায় অনায়াসেই এদের ওপর বর্তায়। কারণ সুবিধাবাদী হিসেবে মোটমুটি তারা পৃথিবীর সকল ক্ষেত্রে ভালো জায়গাতে থাকে, আর অনেকটা পরকাল ভোগের আশায় ইহকালকে কাছে টানতে পারে না, আবার না পারে দূরে সরাতে ইহকালের হাতছানি।

… বড়ই আজব এরা। এরা নিজেদেরকে আধুনিক ও নিরপেক্ষতার মাপকাঠিতে ফেলেন ঠিকই অথচ নিজ ঘরে প্রশ্রয় দিয়ে চলেন গোড়ামীকে। বাইরে, সামাজিকতায়, চিন্তায়, ধ্যান ধারণায় যতই প্রগতিশীলতার মুখোশ পরুক না কেন এরা আসলে প্রতিনিয়ত ধর্মকে ব্যবহার করে চলে। তাদের কোনটা লেবাস আর কোনটা সত্যি তা বোঝার ক্ষমতা বহু কম লোকের আছে। এদেরকে সমাজে দেখে এরা অন্য মেয়েকে আধুনিক হতে উৎসাহ দেয় অথচ নিজের বউকে হিজাবে ঢেকে রাখে। খুঁজে খুঁজে গোড়া ধার্মিক পরিবারে বিয়ে করবে, আর বেহেস্তে যাবার পথ সুগম হয়েছে ওই স্বপ্নে বিভোর থাকবে। আর এক পক্ষ তো স্ট্যাটাস টিকিয়ে রাখতে আধুনিক পরিবারে বিয়ে ঠিকই করবে কিন্তু বৌকে চলতে হবে তার মতে … খল একেকটা …।

উপমহাদেশীয় সমাজ ব্যবস্থায় আমাদের এই যুদ্ধটা কত যে প্রাণকে ক্ষত বিক্ষত করে, এ দুয়ের দ্বন্দ্বে প্রতিমুহূর্ত কত শত মানুষ নিজেকে হারায় তার খোঁজ কজনই বা রাখে?

প্রথমেই বলে নেই আমার এ লেখা ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে ধর্মের বিরুদ্ধে নয়! এরপরেও ফতোয়া জারি হয়ে যাবে আমি জানি… অনেকে সঠিকভাবে বুঝে গ্রহণ করবে, অনেকে একদমই নিতে পারবে না আর ওই যে সুবিধাবাদি দলটা বলবে কি প্রয়োজন রোজার মাসে এইসব বলার। কিছুই আসে যায় না তাতে আমার।

দেশটা আগাচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই কিন্তু সামাজিক মূল্যবোধের দিক দিয়ে ভীষন রকমভাবে পিছুচ্ছে। যে দেশে দেশ বরেন্য এক কীর্তিমান পুরুষ মারা গেলে তার পারিবারিক ও একান্ত ব্যক্তিগত আবেদনগুলোকে যা কিনা আবার সে ধর্ম সিদ্ধভাবে করে গেছেন তা রাস্তায় নিয়ে এসে সামাজিকতার ধুয়ো তুলে নোংরা ভাবে কাটাছেঁড়া করি আমরা, এই অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র যন্ত্র অসহায় হয়ে ছেড়ে দেয় তা সমাজের হাতে সেই দেশ ঝকঝকে আরব্য নগরী হতে পারে শান্ত স্নিগ্ধ সুপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী রোম হবে না।

সুবীরদা (গায়ক সুবীর নন্দী) মারা গেলেন তাঁর মৃত্যু নিয়ে কী নোংরা কথা চললো এই সোশ্যাল মিডিয়ায়, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রযন্ত্র অসহায় হয়ে দেখেও না দেখার ভান করলো। ভণ্ডামির একটা সীমা পরিসীমা তো থাকা উচিত নাকি? তথ্য আইন তবে কেন আছে? শুধু নিজের মান বাঁচানোর জন্যে? সত্যিই বড় সেলুকাস, বড়ই বিচিত্র এই দেশ আর তাঁর মানুষ।

এই ধর্মজীবীগুলো ছেলে কোনো মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়ালে মুহূর্তে মেয়েটার পিছনে লেগে যায়, সব দোষ ওই মেয়েটার।
• আচ্ছা আঁটসাঁট পোশাক পড়েছে? একদম …দেখো এজন্যই তো ছেলেরা বখে …
• শাড়িটা কি খুব আবেদনময়ী ভাবে পড়েছে? ….. এজন্যই তো …আমার ছেলের কোনো দোষ নেই, ….
• চটাং চটাং ইংরেজি বলে?…হমম এভাবেই এরা ছেলেদের পটায়….আমার ঘরের লোকটার কোন দোষ নেই…
• ঘরের বাইরে কাজ করে? ….দেখো বলেছি না লোভী , এরা লোভী, আরে মেয়ে হয়েছো স্বামীর ইনকাম যা তাই নিয়ে চলবা….স্বামী চাইলে একটু আধটু কাজ করবা ব্যাস …

এমন আরো কত শত চিড়িয়ায় ভরা এই নষ্ট সমাজ। ধর্ম ব্যাপারিতে ভরে গেছে দেশ। উঁচু পদ নিচু পদ সব জায়গায় এরা সয়লাব। এক পরিচিত সেদিন লিখলো “বাঙালির জিন্স আর টপসের মাঝের দুই ইঞ্চি ফাঁকায় সম্মান যায়, কিন্তু শাড়ি আর ব্লাউজের মাঝের পাঁচ ইঞ্চি ফাঁকটা হলো সংস্কৃতি” ইচ্ছে হচ্ছিলো ধরে দুটো থাপ্পড় দিয়ে আসি। এরাই কিন্তু আবার সেই সব প্রগতিশীল ….সত্যিই সেলুকাস অনেক প্রগতিশীল আবার পছন্দও করেছে সেই কথাটা।

প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ এলেই নিরীহ পোকামাকড়গুলো এতো আক্রান্ত হয়। বেচারা পেঁচার জন্য বেশ মায়াই হয় তখন। বাঘ মামাতো বেদম আক্রমণের শিকার হয় কোনো এক কালে তিনি নাকি দেবী দুর্গার বাহন ছিলেন তাই। এমনকি তাকে এই মুসলিম দেশের ‘জাতীয় পশু’ বলাটাও নাকি শিরক। এক খালাম্মা বয়ান দিলেন সেদিন হাঁসের মাংস খাওয়া ঠিক না কারন মাওলানা সাঈদী বলেছেন দেবী স্বরস্বতীর বাহন ছিল হাঁস। বলাই বাহুল্য খালাম্মার পরিবারে একজন অতীব উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা আছেন কিন্তু সব চলে খালাম্মার কথায়। আমারও কপাল মুখ বুজে শুনে চললাম। অত্যন্ত দুঃখের মাঝেও হাসি পেলো যখন তিনি বললেন শহীদ আফ্রিদি (পাকিস্তানের ক্রিকেট তারকা) সাহেবও বলেছেন মেয়েদের হ্যান্ডশাওয়ারও ব্যবহার করা উচিত না, কারণ ওই হ্যান্ডশাওয়ার অনেকের লজ্জাস্থান দেখে, তাই তিনি তার মেয়ে ও বউদের আলাদা আলাদা বদনা ব্যবহার করতে বলেন। আমি ভাবছিলাম যে লোকটা ঘর ঠিক করতে পারলো না সে দেশ কীভাবে ঠিক করবে?

এটা একটা ধর্মীয় ভাবে মূর্খ অতীব শিক্ষিত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। ছোট বেলায় খুব সম্ভব ক্লাস সিক্স এ পড়ি মামা নানার পেনশনের টাকা পেলেন, বাড়ির মসজিদ পাকা করবেন মনস্থির করলেন আমি বলে বসলাম নানী আর ছোট তিন মামার লেখাপড়ার জন্য টাকাটা রেখে দিতে। তখনি বুঝেগিয়েছিলাম সংসার সামলিয়ে অল্প টাকায় অন্য মামাদের জন্য ছোটো তিন ভাইকে ওভাবে টানা সম্ভব না, যেই বকা শুনেছিলাম, কানে ধরে ছিলাম….হোক মসজিদ, হোক মন্দির, হোক মাদ্রাসা তাতে আমার কি ?

সংকীর্ণ জাতীয়তাবোধ যেমন হিংস্রতা আর সহিংসতার জন্ম দেয়, জীবনের প্রয়োজনে ধর্ম না হয়ে ধর্মের প্রয়োজনে জীবনের শিক্ষা শিক্ষিত সমাজ দেয় না উগ্রবাদী সমাজ দেয়। সেই সমাজের রাষ্ট্র যন্ত্র কখনো অসাম্প্রদায়িক হতে পারে না।

যে বাচ্চাকে মসজিদে পাঠাই তাঁকে কি মানবিক হতে শিখিয়েছি? তাকে কি শিখিয়েছি জীবন চলার পথে অন্যের অনুভূতিকেও গুরুত্ব দিতে, শুধু নিজেরটাকে নয়! মিথ্যে দোষ না চাপিয়ে বুক ফুলিয়ে সাহস নিয়ে সত্যকে স্বীকার করতে? শিখিয়েছি কি পারিপার্শ্বিকতার ভয়ে অন্যের জীবনকে বিধ্বস্ত না করতে, জীবনে ঘটে যাওয়া সত্যকে মাথা পেতে মেনে নিতে? সেকি জানে ঘাত প্রতিঘাত নিয়েই জীবন আর এখান থেকে পালতে হয়না মেনে নিয়ে চলতে হয়! সাথে নিয়ে এগোতে হয়! অবশ্য এটা শেখানোর জন্য যে শিক্ষার প্রয়োজন তা না আছে কোন ধর্মীয় বইতে, না আছে এই সমাজের কোনো পুঁথিগত বিদ্যায়।

আমরা শুধু ওই পর্যন্ত প্রগতিশীল যেখানে হিন্দু হলেও রবীন্দ্রনাথকে সম্মান করি, অথচ যে কাদম্বরীর জন্যে ঠাকুরপো রবীন্দ্রনাথ হলো তাঁকে স্বীকার করে নিতে বড় ভয়…।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১৯২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.