যে সম্পর্ক ভেদাভেদ জানে না…

0

সারা বুশরা দ্যুতি:

আমি তখন নার্সারিতে পড়া ছোট্ট মেয়ে, টিফিন টাইমে স্কুল মাঠে মনের আনন্দে দৌড়াদৌড়ি করছি। হঠাৎ দেখি আমার এক সহপাঠী পা দিয়ে সজোরে ঘষে ঘষে লাল পিঁপড়ে মারছে আর বলছে, এইগুলা সব হিন্দু পিঁপড়া, সবগুলোকে আজকে পিষে ফেলবো।

বিস্ময়ে হতবাক আমি প্রশ্ন করলাম, পিঁপড়ের আবার হিন্দু মুসলিম কী? আর সে তাদের মারছেই বা কেন? সে উত্তর দিয়েছিলো তার পাশের বাড়িতে একটি হিন্দু পরিবার থাকে। ওদের দুই মেয়ের সাথে প্রায়ই বিকেলবেলা সে খেলে। এই খেলার মধ্যে তারা কালো পিঁপড়েদের মুসলিম আর লাল পিঁপড়েদের হিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করে, এতে তাদের খেলতে সুবিধা হয়। গতকাল ওই মেয়ে দুটির মা ওকে বলেছেন ও যেন ওদের বাড়িতে আর কখনো না যায়, ও গেলে নাকি তাদের ঘর অপবিত্র হয়ে যায়, যেই গ্লাসে পানি খায় সেই গ্লাস আর স্পর্শ করার যোগ্য থাকে না ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব শুনে ওর ভীষণ রাগ আর কষ্ট হয়েছে, তাই সে সব লাল পিঁপড়ে মেরে ফেলতে চাইছে।

আমার শিশু হৃদয়ে ঘটনাটি গভীরভাবে দাগ কেটে গিয়েছিলো দেখে আজও পুরোটা মনে আছে। আরো মনে আছে আমাদের এক খালার বাড়ির কথা। খালু হুজুর ধরণের মানুষ ছিলেন। খালার কলেজ জীবনের সবচেয়ে ঘনিষ্ট বান্ধবী ছিলেন একজন হিন্দু নারী। বিয়ের পর সেই বান্ধবীর সাথে সমস্ত যোগাযোগ খালা তার স্বামীর আদেশে ছিন্ন করতে বাধ্য হোন। কোনো কাফেরের সাথে সম্পর্ক রেখে নিজের স্ত্রীকে নাপাক হতে কিছুতেই দিবেন না খালু।

জাত বা ধর্ম যে একজন মানুষ থেকে আরেকজন মানুষকে আলাদা করতে পারে সেটা সে সময়েও আমার মাথায় ঢুকেনি, আজও ঢুকে না। এই একটি ব্যাপার চিরকাল আমার বোধশক্তির বাইরে।

কেন সেটা ব্যাখ্যা দেয়ার আগে জীবনে ঘটে যাওয়া খুব মূল্যবান একটা অংশের গল্প বলি।

সালটা ছিল ২০০৫। ফেসবুক তখনও রাজত্ব শুরু করেনি। ফেসবুকের জায়গায় ছিল বিভিন্ন ইয়াহু গ্রুপ এবং নানা ধরনের ফোরাম। এরকম একটি ফোরামে তুলি দি’র সাথে পরিচয়। আমি তখন কয়েকটি ইয়াহু গ্রুপ এ টুকটাক লেখালেখি করি। খুবই কাঁচা হাতের লেখা। তবুও কী করে যেন আমার একটি লেখা একটি গ্রুপে ভীষণ সাড়া ফেলে দেয়। সেই গ্রুপ এর মডারেটর লেখাটি পড়ে আমাকে একটি লম্বা ইমেইল লেখেন, যার সারমর্ম ছিল এতো অল্প বয়সে মানুষের জীবনের জটিল দিকগুলো আমি লেখায় যেভাবে তুলে ধরেছি তাতে তিনি মুগ্ধ। তার সম্পর্কে আমার ইম্প্রেশন ছিল ভীষণ রাশভারী এক নারী, যে কিনা বাস্তব জীবনে টিচার হওয়ার সাথে সাথে ভার্চুয়াল জগতেও দারুণ রাগী এক মাস্টারনি। খটমটে ইংলিশে লেখালেখি করেন, গ্রুপে কেউ উল্টোপাল্টা কিছু লিখলে বা বললে তাকে এসে কড়া কিছু কথা শুনিয়ে যান। এরকম একজন আমার একটি লেখা পড়ে নিজে যেচে এসে আমার সঙ্গে আলাপ করবেন ব্যাপারটা ভীষণ ভালো লেগেছিল। আগ্রহ নিয়ে উত্তর লিখেছিলাম। এরপর ইয়াহু ম্যাসেঞ্জারে সরাসরি কথা বলে আলাপ হলো। তবে সেই আলাপ যে একটা সারা জীবনের বন্ধন তৈরি করবে তা তখন টের পাইনি।

দিদি কলকাতার মানুষ। সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। বাবা খুব নামকরা প্রফেসর ছিলেন। দিদি নিজেও দারুন স্কলার। পি এইচ ডি শেষ করেছেন। তার সারাজীবনের সব রেজাল্টই দুর্ধর্ষ রকমের ভালো। আমি নিজে যেহেতু অলস ও ফাঁকিবাজ তাই এধরনের সিরিয়াস ও পড়ুয়া মানুষদের থেকে সবসময় একটু দূরে দূরে থাকি। তুলি দি’ই একমাত্র ব্যতিক্রম যিনি স্নেহের এমন শক্ত বাঁধনে আমাকে বাঁধলেন যে আমি বাধ্য মেয়ের মতো তার কাছে ধরা দিলাম। আমার কোনো বড় বোন ছিলো না। তিনি সেই জায়গা নিয়ে নিলেন। আমি তার কাছে আবদার করি, আহ্ললাদ করি আর তিনি হাসি মুখে সব মেনে নেন, কীভাবে কীভাবে যেন সব ইচ্ছে পূরণ করে দেন।

কথা বলতে বলতে হেড ফোন নষ্ট হয়ে গেলো, আমাকে যেন কষ্ট করে দোকানে গিয়ে কিনতে না হয় তাই উনি ওনার পরিচিত এক বাংলাদেশী আঙ্কেলকে দিয়ে নতুন হেডফোনে কিনে পাঠিয়ে দিলেন। আমার সাত পৃষ্ঠার একটা লেখা ট্রান্সলেট করতে হবে, উনি পুরোটা নিজের হাতে লিখে আমাকে স্ক্যান করে পাঠালেন। পুনেতে থাকা এক বান্ধবীর বিয়ের গিফট পাঠাবো, ঢাকা থেকে ডিরেক্ট পাঠালে হারিয়ে যাওয়ার ভয় আছে। আবার তুলিদি উদ্ধার করতে এগিয়ে আসলেন, নিজে দায়িত্ব নিয়ে আমার গিফট পাঠিয়ে দিলেন। আর আশ্চর্য এটাই যে, আমার কখনোই মনে হয়নি তাকে বলি, দি, তুমি আমার জন্য এতো কিছু কেন করো? আমার সবসময় মনে হয়েছে এটা আমার অধিকার। দিদি বোনের জন্য করবে না তো কে করবে?

মাঝে মাঝে আমাদের মান অভিমানও হয়, একদম ছেলেমানুষের মতো ঝগড়া করি আমরা। তিনি একগাদা বকা দিয়ে সাইন অফ করেন। আমিও ঠাস ঠাস করে রাগ ঝাড়ি। পরদিন আবার নরম্যাল যেন কিছুই হয়নি। ঠিক এক ঘরে দুটি বোন থাকলে যা হয়, আমরা দুজন যে দুটো আলাদা দেশে থাকি একটি বারের জন্যও সেটা মনে হয় না।

যেহেতু ফেসবুক পূর্ববর্তী সময় সেটা, তাই ইমেইল এর চর্চা ব্যাপক আকারে ছিল। দি আমার মা’কে নিয়মিত মেইল করে তার সাথেও একটা হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করলেন। এদিকে আমিও ততদিনে তুলি দি’র মা, বড় বোন, পরিবারের বাকি সবার সাথে পরিচিত হয়ে গেছি। সবার সাথে ফোনে কথা হয়, প্রায়ই মজার মজার গল্পসল্প করি আমরা। একটা মুহূর্তের জন্যও কারো মাথায় আসে না আমাদের ধর্ম আলাদা। আমি ওনাদের দুই বোনকে দি আর দিদিভাই ডাকি। আর ওরা আমাদের সাথে কথা শেষ করার সময় খোদা হাফেজ বলে শেষ করেন।

তাদের ভালবাসার আমন্ত্রণে কলকাতায় মা’কে নিয়ে তাদের বাড়িতে গিয়েছি, থেকেছি। তারাও সপরিবারে ঢাকা এসে আমাদের বাড়িতে থেকেছেন। দুটো পরিবার এতো সুন্দরভাবে সময় কাটাতে পারে, একে অপরকে আপন করে নিতে পারে শুধুমাত্র বন্ধুত্বের টানে, তা নিজের জীবনে না ঘটলে বিশ্বাস করতে পারতাম না।

তাদের বাড়িতে যখন থেকেছি, তখন তারা আমাদের নামাজ পড়ার সুবিধের জন্য নতুন পাটি কিনে রেখেছেন, নামাজের রুম থেকে সমস্ত ছবি সরিয়ে ফেলেছেন। পরবর্তীতে তারা যখন আমাদের এখানে এসেছেন আমরা তাদের সবার আগে ঢাকেশ্বরী মন্দির এ দর্শন করাতে নিয়ে গেছি, রেস্টুরেন্ট এ গিয়ে কড়া ভাবে জানিয়ে দিয়েছি গরু সংক্রান্ত কোনো কিছু যেন এই টেবিল এর আশেপাশেও না আনা হয়। ঢাকা এসে তাদের যেমন মনে হয়েছে নিজের শহরেই আছেন, কলকাতা গিয়েও ঠিক তেমনি আমার মনে হয়েছে এ যেন আমার আপন আধার।

আমার বিয়ের সময় আন্টির (তুলিদি ‘র মা) শরীর খুব খারাপ ছিল। তাই ওরা বিয়েতে আসতে পারেন নি….কিন্তু কী কাণ্ড! দুপুরে পার্লার এ যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হচ্ছি, দেখি বিরাট এক পার্সেল এসে হাজির। আগ্রহ নিয়ে খুললাম। ভেতরে শুভেচ্ছা কার্ড, গিফট, ফুল ইত্যাদিসহ অনেক রকমের চকলেট।
সাথে দি’ র একটা চিঠি। সেখানে লেখা, ‘মাই ডিয়ার লক্ষীসোনা, চাঁদের কণা, আমাদের এখানে বিয়ের ঠিক আগে আগে পাত্রীকে আদর করে বসিয়ে আইবুড়ো ভাত খাওয়াতে হয়। তোকে তো নিজের হাতে খাওয়াতে পারছি না তাই এই চকলেটগুলো পাঠালাম। তুই অবশ্যই এগুলো সবগুলো একটু একটু করে মুখে দিবি, তবেই ঘর থেকে বের হবি….মনে করবি তোর দিদি খাইয়ে দিচ্ছে।’

হ্যাঁ, চিঠির কথাগুলো আজও মুখস্ত আছে। কারণ আমি সারাজীবনই শুধু স্নেহের ভাষা বুঝি। তাই সেটুকু নিয়েই থাকতে চাই, আর সেটাই মনে রাখতে চাই। যখন দেখি পৃথিবীর মানুষ দেশ, জাত, ধর্ম নিয়ে নিজেদের মধ্যে নোংরামো করে তখন ইচ্ছে করে জনে জনে গিয়ে বুঝিয়ে বলি, এইসব করা অর্থহীন। এগুলো কোনোদিন কারো কোনো কল্যাণ করবে না।

ভালবাসা আর সহনশীলতা হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি। এ’দুটো দিয়ে সব জয় করা যায়। তবে কেন মিছেমিছি সবকিছুকে এতো জটিল করে তোলা? ইচ্ছে করলেই তো মানুষ একে অপরকে শ্রদ্ধা করে শান্তিতে থাকতে পারে। কেন তবে শান্তি ছেড়ে অশান্তির পথে চলা?

Sara Bushra Dooty
Bedford, United Kingdom

শেয়ার করুন:
  • 107
  •  
  •  
  •  
  •  
    107
    Shares

লেখাটি ২,১৬৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.