হিন্দুরা নাকি আজকাল জাতপাত আর মানে না!

0

সুষুপ্ত পাঠক:

ভারতের মহারাষ্ট্রের আহমেদনগরে রুক্সিণী রণসিংহ নামের ১৯ বছরের একটি মেয়ে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো মঙ্গেশ নামের (হিন্দুদের ভাষায়) ‘ছোট জাতের’ ছেলেকে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে মহান সনাতন ধর্মের জাতপাতের অনুভূতি! রুক্সিণীর বাবা, মামা, কাকারা সম্মলিতভাবে মহান সনতান ধর্মের জাতিভেদ প্রথাকে রক্ষা করতে এরপর রুক্সিণী ও তার স্বামী মঙ্গেশকে বাড়িতে ডেকে এনে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করে!

না, এটা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এই ছোট জাত উঁচু জাত হিন্দুদের রক্তে মিশে আছে। সবাই এভাবে অনার কিলিং করে না। তবে ছোট জাতের ঘৃণা শিক্ষিত অশিক্ষিত সব হিন্দুদের মনের গভীরে বসবাস করে। যেসব হিন্দু ছেলেমেয়ে নিজের জাত বা কাস্টের বাইরে গিয়ে বিয়ে করে, তাদের পড়তে হয় পারিবারিকভাবে নিষেধাজ্ঞায়। তাদের প্রতিবেশী ও বন্ধুরা এইসব বিয়েকে ভালো চোখে দেখে না। তারা মনে করে এসব বিয়ের ফলাফল কখনো সুখের হয় না। সংসারে অশান্তি, সন্তান নিয়ে সমস্যাসহ নানা রকম বিপদ ঘটে ভিন্ন কাস্টের বিয়েতে। এরকম কুসংস্কার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো শিক্ষিত হিন্দুও অবলীলায় বলতে লজ্জাবোধ করে না।

হিন্দুদের হিন্দু হলেও চলবে না- তাদের নিজ জাতের হিন্দু হতে হবে। যারা এইরকম নিজ ধর্মের মধ্যেই সাম্প্রদায়িকতা বজায় রাখে তারা অন্য ধর্মের মানুষদের যে কি চোখে দেখে সেটা বলাই বাহুল্য!

আজো হিন্দুদের বিয়ের তারিখ নির্ধারিত থাকে। এ মাসে মোটে দুটি তারিখ আছে বিয়ে করার! এর বাইরে অন্যসব দিনগুলি অশুভ শনির দৃষ্টি আছে…।
ভাবা যায় গোটা একটা সম্প্রদায় এই বিজ্ঞানের যুগে এসেও এরকম হাস্যকর কুসংস্কারে মেতে আছে। কোন সংস্কারের ইচ্ছা নেই। হিন্দু ঘরের যেসব ছেলেরা নিজেদের ধর্মমুক্ত বলেন, যারা সব সময় বলেন, ‘আজকাল হিন্দুরা এসব মানে না’- তারা নিজেরা কি দিনক্ষণ পাজিপঞ্জিকা ছাড়া বিয়ের ডেট করতে পেরেছেন? নিজেদের পরিবারে ভিন্ন কাস্টের মেয়েকে আনতে পেরেছেন?

আমি বলছি না যে আজকাল ভিন্ন কাস্টের ছেলেমেয়েদের পারিবারিকভাবে বিয়ে হচ্ছে না। কিন্তু হিন্দুদের মধ্যে যে আজো ভয়ংকরভাবে জাতের ঘৃণা রয়ে গেছে, তা কে অস্বীকার করবে?

আমি চিন্তা করতে পারছি না রুক্সিণী আর মঙ্গেশের কথা। রুক্সিণী তো কোন মুসলমান ছেলেকে বিয়ে করেনি। সে একটা হিন্দু ছেলেকেই বিয়ে করেছিলো। তাতেও পাষণ্ড বাবা তার ধর্মের প্রতিশোধ নিয়েছে মেয়ের উপর।

হিন্দু মেয়ে একটা ছেলেকে মনখুলে ভালোও বাসতে পারে না। প্রথমে তাকে দেখতে হবে সেই ছেলেটি তাদের জাতের কিনা। খালি হিন্দু হলে হবে না, তাকে হতে হবে তাদের স্বজাতের! এরকম একটা চক্রের ঘেরাটোপে বন্দি হিন্দু নারী হয়ত কখনো কখনো আজীবনের জন্য মুক্তি চায়। মুসলমান ছেলেদের বিয়ে করে তাদের ধর্ম পরিবর্তন কি হিন্দুদের পারিবারিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তির উপায়? যদিও এরকম মুসলিম পরিবারে গিয়েও সেই হিন্দু নারীটির কোন মুক্তি ঘটে না। সে গল্প আজ আর এখানে নয়…।

ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনে ও বাংলার সুলতানী আমলে ব্রাহ্মণদের জাত মেরে মুসলিম বানানোর একটা পরিকল্পনা থাকত রাজ দরবারের। এসব রাজ দরবারে স্থানীয় ব্রাহ্মণদের স্থান মিলত নানান বড় বড় পদে। ব্রাহ্মণদের হিন্দুত্ব রক্ষার নানা রকম শুচিবাইকে পুঁজি করে সুলতান স্বয়ং কৌশলে তাকে গরুর মাংসের ঘ্রাণ শুকিয়ে বা খাইয়ে রটিয়ে দিতো সে ঘটনা। মুহূর্তের মধ্যে এই ঘটনা ব্রাহ্মণসহ হিন্দু সমাজে ‘জাতমারা’ গেছে এই উল্লাসে ফেটে পড়তো।

উল্লাসের কারণ এবার গো-মাংস ঘ্রাণ শুকা ব্রাহ্মণকে একঘরে করা হবে। তার ছেলেমেয়ের সঙ্গে বিয়ে, হাটেবাজারে লেনদেন সব বন্ধ। এমনকি ধোপা নাপিত তার বাড়িতে কেউ যাবে না …।

অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? ইতিহাস থেকে প্রমাণ দেই।

খুলনার খান জাহান আলী যিনি ষাট গম্বুজ মসজিদের সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে আছেন, সেই তিনি তার দরবারে কাজ করা গোবিন্দলাল রায়কে রান্না করা গরুর মাংসের ঘ্রাণ শুকিয়ে তার কথিত ‘জাত মেরে’ জব্দ করেছিলেন। এরপর তার জাতিভাইরা তাকে একঘরে করে। তার বাড়িতে কেউ জল স্পর্শও করবে না। তার ছেলেমেয়েকে কেউ বিয়েও করবে না। ধোপ নাপিত সব বন্ধ…! হিন্দুদের এই নিদারুণ অত্যাচারে শেষতক নিজেকে বাঁচাতে গোবিন্দলাল রায় ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করে। খান জাহান আলী তার নতুন নাম দেন ‘আবু তাহের’। এই আবু তাহেরকে খান জাহান আলীকে প্রমোশন দিয়ে অন্যত্র পাঠিয়ে দেন।
আবু তাহের তার মনের ভেতরে রাখা হিন্দুদের প্রতি ক্ষোভ মেটান জাইগির পাওয়া গ্রামে গিয়ে বসার পর। হিন্দু নিপীড়নকারী হিসেবে এই নওমুসলিম তখন হিন্দুদের মধ্যে ত্রাস হয়ে উঠেন। অপরদিকে তার অতি ইসলামমুখী হওয়ায় খান জাহান আলী তাকে ‘পীর অলী’ উপাধি দেন, যা কালক্রমে অপভ্রংশ হয়ে ‘পীরালী’ হয়ে উঠে।

ইতিহাসে ব্রাহ্মণদের জাতিচ্যুত হয়ে একঘরে হয়ে উঠাকে এখান থেকেই ‘পীরালী বামুন’ বলা শুরু। এই ‘পীরালী বামুন’ তারাই যাদের কোন এক পুরুষ হিন্দুদের কারণে একঘরে হয়ে ধর্ম ত্যাগ করে মুসলিম হয়েছিলো। এই কারণে তাদেরকেও অন্যরা একঘরে করেছিলো। রবীন্দ্রনাথদের বিখ্যাত ঠাকুর পরিবার সেরকমই একটা পীরালী বামুন (দেখুন: সেরা মুসলিম মনীষীদের জীবনকথা-১, নাসির হেলাল, সুহৃদ প্রকাশন,/ রবীন্দ্রনাথ ও ঠাকুর বাড়ীর ইতিকথা, সৈয়দা মকসুদা হালিম/ যশোহর খুলনার ইতিহাস. ১ম খন্ড ৩৩৩ পৃষ্ঠা, শ্রী সতীশ চন্দ্র মিত্র, /সুন্দরবনের ইতিহাস, ২য় খন্ড, ১১৮ পৃষ্ঠা-এ.এফ.এম. আবদুল জলীল)।

নাহ্, হিন্দুরা গত তিন-চারশ বছর ধরে এতোটুকু বদলায়নি তাদের জাতপাতের বিশ্বাস থেকে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৬৪৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.