“কন্যা, তবে কন্যা নয়”

0

রোমানা আক্তার – শুদ্ধবালিকা:

পাত্রপক্ষের কাছে প্রথম দিকে রিফিউজ হয়ে মন খারাপ করে বসে থাকতো সাদিয়া। তখন ও অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। পাঁচ বোনের মাঝে ওর অবস্থান তৃতীয়। বড় দুই বোন বিবাহিত। বাকি ছোট দুজনের একজন অনার্স প্রথম বর্ষে, আরেকজন উচ্চমাধ্যমিক দিবে। খুব স্বাভাবিকভাবেই বাবা চিন্তিত কন্যাদের সুপাত্রস্থ করার জন্য। তবে ভদ্রলোক মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারেও সচেতন। তাই সাদিয়াকে বিয়ে দেয়ার ব্যাপারে তিনি অনার্স তৃতীয় বর্ষ থেকেই টুকটাক চেষ্টা করছেন। এর আগে মেয়ের বিয়ে নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাননি।

সাদিয়া প্রথম যখন কোন পাত্রপক্ষের সামনে যায় তখন ও নিতান্তই সাধারণ একটা মেয়ে। সাজসজ্জা, পোশাক এসবের ব্যাপারে মোটেই খেয়ালি নয়। ওর ড্রেসকোড ডিজাইন, কালার এসব দিক থেকে একটু সাদাসিধে ভাব প্রকাশ পায়। আধুনিকভাবে বলতে গেলে, মেয়ে স্মার্ট নয়। পছন্দ হলো না পাত্রপক্ষের। এভাবে কয়েকজন রিফিউজ করে ওকে।

বড় বোনের পরামর্শ একটু স্মার্ট হতে হবে। ড্রেস তো লোকে মাগনা দেয় না, একটু ফ্যাশনেবল, সাবলীল, রুচিসম্মত পোশাক খুঁজে কিনলেই তো পারে, সাথে কালারটার ব্যাপারেও মনোযোগী হতে হবে।
এসব ফ্যাশনের দিকে আবার সাদিয়ার ইমিডিয়েট ছোট যে বোন সে বেশ পটু। বাবার আয়কে মাথায় রেখেই ও লাইফস্টাইল মেইনটেইন করে, তবে এতে একটু খাটুনি বেশি হয়, কেননা সীমিত বাজেটে বেস্ট পোশাক বেছে নিতে ওকে অনেক দোকান ঘুরতে হয়। চট করে যা তা পোশাক পরার চাইতে সময় নিয়ে বেস্টটা খুঁজতেই ও পছন্দ করে।

সাদিয়াকে এ যাত্রায় স্মার্ট হতে সাহায্য করছে ওর ছোট বোন। পোশাকি সৌন্দর্যে তো এ যাত্রায় এগিয়েই গেলো সাদিয়া। কিন্তু চুলটার কী হবে? সারাক্ষণ তেল চিটচিটে করে খোঁপা করে রাখলে পোশাক যাই হোক টোটাল আউটলুক ঠিক স্মার্ট হচ্ছে না। ছোট বোনের রুলস ফলো করো, অর্থাৎ চুলে তেল দিয়ে ঘন্টা দুই এক রেখে শ্যাম্পু করে নাও, এরপর বাহারি সব হেয়ার বেন্ড দিয়ে চুলগুলো আপন সৌন্দর্যে ফুটিয়ে তুলতে হবে। কিন্তু সাদিয়ার কোমর সমান চুল দিয়ে খোঁপা আর বেণী ছাড়া কিইবা করা যায়? পাত্র পক্ষ তো বড় চুল চায়, কিন্তু সামনে, পিছে, ডানে বামে লেজ কাটা থাকলে আরেকটু সুন্দর লাগতো না? যাও এবার পার্লারে, পেছনে ডিপ ইউ আর সামনে লেয়ার। ব্যস, হয়ে গেলো চুলের ব্যবস্থা।

এ যাত্রায় সাদিয়া আগের থেকে বেশ স্মার্ট। মোটামুটি নিশ্চিত যে, পাত্রপক্ষ এবার আর রিফিউজ করবে না। কোন এক শুক্রবারে এলো পাত্রপক্ষ। পছন্দও হলো। ছেলের সাথে কথা বলার সময় ও হেসেছিলো, তাতে একটু শব্দ হয়েছিল। ছেলের মা বললেন, বউদের হাসিতে শব্দ হতে নেই। এ বিয়ে ক্যান্সেল। অথচ ভদ্রমহিলা নিজেই তার ধন সম্পত্তির গর্বে খুশি মনে এতো জোরে কথা বলছেন আর হা হা করে হেসে উঠছেন যে, ড্রয়িং রুম থেকে সবচেয়ে ভেতরের যেই রুমটা সেখানে বসেও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে সব।

পাত্রপক্ষ যা করে তাইতো ঠিক। দ্বিতীয় যাত্রায় সাদিয়ার উপর কড়া নির্দেশনা, এই পক্ষের সামনে যাতে মুচকি হাসে। কিন্তু মুচকি হেসে ঘটে গেলো বিপত্তি। যারা মুচকি হাসে তাদের মনে নাকি অনেক শয়তানি, এরা মিচকা শয়তান। বাড়ির বউকে হতে হবে প্রাণোচ্ছল। হাসবে, ঘুরবে, গল্প করবে, সবদিক সামলে নিবে। লোকে যাতে বুঝতে না পারে বউয়ের মন খারাপ অথবা বউ মানুষ দেখতে পারে না। বুঝো অবস্থা!

সাদিয়া আবার হতাশ। এদিকে একেবারে ছোট যে বোন সে হঠাৎ করে বলে বসলো, আপু, তোর চেহারাটাই না কেমন বোকা বোকা। এজন্যই তোকে কেউ পছন্দ করছে না। এখন এই বোকা বোকা চেহারা কীভাবে চালাক চতুর বানাবে সাদিয়া?

বারংবার রিফিউজ হওয়াটা আজকাল পরিবারের চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আর সাদিয়ার ডিপ্রেশনের। এই করতে করতে মাস্টার্সে পা দিয়েছে সে৷ ইমিডিয়েট ছোটজনের বিয়ের তাড়া, প্রেম করেছে চুপিচুপি। সবদিক মেনে বড় বোনের আগেই বিয়ে হলো ছোট বোনের।

এবার আর সাদিয়া মুখ লুকায় কোথায়? সবাই মিলে ওর দিকে এমনভাবে তাকায় যে ষাটোর্ধ্ব একজন মহিলা সাদিয়া। বিবাহিত ছোট বোনটা সাদিয়াকে খুব ভালোবাসে। ভালোবাসা থেকেই পরামর্শ দিলো, “তুই ছাত্রী ভালো, জবের জন্য ট্রাই কর। বিয়েটা অপশনাল ভাবে নে, জবটা মেজর৷ দেখবি তোর ভবিষ্যৎ ভালো হবে।” সাদিয়াও ভেবে দেখলো পরামর্শ মন্দ নয়।

দীর্ঘ চেষ্টায় মাস্টার্স শেষ হবার এক বছর পর সাদিয়ার খুব ভালো চাকরি হলো। বিয়ে হয়নি তখনও। কিন্তু যা হলো, চাকরি পাওয়ার পর ওর বিয়ে নিয়ে লোকে তেমন কথা বলতো না, ওর এতো টাকা খাবে কে? আত্মীয়স্বজন ওকে বিপদের বন্ধু বানাতে তৎপর হলো। কাজিনরা নানাবিধ আবদার নিয়ে আসে সাদিয়ার কাছে, ভাগ্নাভাগ্নি আসে, আরও কতো কী! সাদিয়া কেবল হাসে। অথচ এই মানুষগুলোই কয়েকদিন আগেও ওকে দুটো কথা শুনিয়ে দিত যারা আজ বলছে বিয়েই সব নাকি?

সকল ফ্যাশন ভুলে সাদিয়া তার আগের জীবনে ফিরে গেলো। সাদামাটা ফ্যাশনহীন জীবন। এর মাঝে বাবা হয়ে গেলেন অসুস্থ। চিকিৎসা খরচ চালাতে অন্যান্য বোনেরা অপারগ। স্বামীর ঘরে থেকে আপন বাবা মায়ের জন্য কিছু করাটা সংসার ভাঙ্গার পূর্বাভাস দেয়। বর অনেক ক্ষেত্রে মেনে নিলেও মেনে নেয় না শ্বশুরবাড়ির অন্যান্যরা। মেয়েদের জন্ম কেবল বাবা মায়ের থেকে নেয়ার জন্য, এদের দেয়া বারণ।

একটা ছেলে বাবা মাকে অবহেলা করলে হয় কুলাঙ্গার ছেলে, আর একটা মেয়ে বাবা মাকে অবহেলা করে হয় আদর্শ বউ। আর মেয়ে পরিচয়? মেয়ের বাবা মায়েরা মেয়েদের থেকে একটাই চাওয়া রাখে, “স্বামী, সংসার নিয়ে সুখে থাকো।” যেহেতু বাবা মা মেয়ের থেকে কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা রাখে না তাই এক্ষেত্রে মেয়েটা বাবা মায়ের জন্য কিছু না করলেও মেয়ে পরিচয় হারায় না।

আর ছেলের বাবা মায়েরা? “বউ গেলে যাক, তুই আমাদের ছেলে।” অথবা “বউকে পেয়ে বাপ মাকে ভুলেছিস, ত্যাজ্য করলাম তোকে।” কথাগুলো অনায়াসেই বলে দিতে পারেন, এমনকি বাবা মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করে বউকে ভালোবাসলেও অনেক ছেলের বাবা মা বউকে ভালোবাসাটা মেনে নিতে না পেরে অনেক শক্ত কথা বলে দেন নিজ সন্তানকে।

ভাগ্যিস সাদিয়ার বিয়ে হয়নি। তাই বাবার পাশে দাঁড়াতে পারছে। অন্যান্য বোনেরা মাসে এক দুবার দেখতে এসে কন্যা দায়িত্ব পালন করে যায়। প্রায় সাত মাস পর বাবা গেলেন চলে। ছোট বোনটিকে বিয়ে দেয়ার দায়িত্ব নিলো সাদিয়া৷ হয়েও গেলো বিয়ে। মাকে নিয়ে সাদিয়া থাকছে বিশাল একটি ফ্লাটে। বোনদের শ্বশুরবাড়ির জন্য নানান উপলক্ষে উপহার পাঠানো, তাদের দাওয়াত করা ইত্যাদি সকল দায়িত্ব এখন সাদিয়া পালন করে।

সাদিয়ার কাঁধে এতো দায়িত্ব ছিলো বলেই কি সময়মতো ওর বিয়েটা হচ্ছিলো না? পুত্র সন্তানহীন বাবা মায়ের ভোগান্তি সৃষ্টিকর্তাও নিশ্চই জানেন। তাই হয়তো তিনি পাঁচ বোন আর বাবা মাকে ঘেরা মোট সাত সদস্যের পরিবারে কন্যা রূপে পুত্র করে পাঠিয়েছেন সাদিয়াকে।

তবে কি বিয়ে ভাগ্য নেই সাদিয়ার কপালে?

আছে।

তিন ভাইবোনকে সমাজে নাথিং থেকে সামথিং করে গড়ে তোলা এক বড় ভাই আছেন, যিনি তারই হাত ধরে বেড়ে উঠা ভাইবোনদের চাইতে একটু নিচু অবস্থানে থাকার জন্য সেই ভাইবোনদের কাছে মাঝে মাঝেই কটাক্ষের শিকার হোন। যাদের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজে বিয়ে করার কথা ভেবেই উঠতে পারেননি আজ তাদেরই নিন্দায়, তাদেরই প্ররোচনায় এবং একাকিত্বের নিষ্ঠুরতায় ঊনচল্লিশ বছর বয়সে এসে সিদ্ধান্ত নেন, বিয়ে করবেন। সাদিয়ার সাথে তার বিয়ে হয়ে যায়।

সেই সাদামাটা সাদিয়া এখন বয়সেও এগিয়ে, শারীরিক গড়ন মোটেই ছিপছিপে নয়, বরং মুটিয়ে। বিবাহের বাজারে একটি মেয়ের যা যা মেজর তার কিছুই আজ নেই সাদিয়ার ভেতরে। সে প্রচলিত শর্তে বিয়েতে একেবারেই যোগ্য নয়। সেই সাদিয়ার বিয়ে হলো অপর সংসার থেকে আগত এক দায়িত্বশীল বড় ছেলের সাথে। শুরু হলো সাদিয়ার সংসার যাত্রা।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৬৬১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.