তারপরও আমরা ‘ধর্ষণ’ নিয়ে লিখি …

0

সালমা লুনা:

শাহীনুর আক্তার তানিয়াকে নিয়ে কিছু লিখি নাই। শুধু খবরগুলো পড়ছিলাম। অবশেষে কাল জানা গেলো
কিশোরগঞ্জে চলন্ত বাসে নার্স শাহীনুর আক্তার তানিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ময়নাতদন্তের দায়িত্বে থাকা সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান।

ময়নাতদন্তে ধর্ষণ ও হত্যার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।

পুলিশ বলছে, ‘মেয়েটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এটা নিশ্চিত। ধর্ষণের পর তার মাথার পেছনে প্রচণ্ডভাবে ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। মাথার খুলির পেছনের অংশ দুই ভাগ হয়ে গেছে। মাথার ভেতর প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। এমন আঘাতের পর সঙ্গে সঙ্গে মারা যাওয়ার কথা। যদি সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু নিশ্চিত না হয় তবে সর্বোচ্চ ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিট বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আছে।’

এই ত্রিশ চল্লিশ মিনিট যদি বেঁচে থেকে থাকে তখন তানিয়া কী করেছিলো? সে ছিলো নার্স। সেবিকা। কতো মানুষের সেবা করেছে হয়তো। সে কী ভাবছিলো তার কী দোষ ছিলো? নাকি ভাবছিলো এইসব মানুষদের জন্যই তো সে সেবার পেশা বেছে নিয়েছিলো।
ভেবেছিলো মানুষের সেবা করবে।
তবে এরা কারা? এরা কি মানুষ না?

তানিয়া বাড়ি যাচ্ছিলো। ভাই তুলে দিয়েছে বাসে। সাথে একটা টিভিও কিনে দিয়েছে। বাবা মা-মরা নিজের পায়ে দাঁড়ানো প্রতিষ্ঠিত মেয়েটির সাথে প্রথম ইফতার করবে ভেবেছিলো। তাই বিকেলে অফিস শেষে বাড়ি ফেরার বাসে চড়ে বসা।
আর বাড়ি পৌছায় নি তানিয়া।
প্রথম তারাবী চলছিলো মসজিদে মসজিদে তখন। আর বাসে চলছিলো তানিয়ার উপর পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণিত অপরাধ। মানবতা বিরোধী অপরাধ – ধর্ষণ!

টিভিতে তাদের পাঁচজনকে দেখাচ্ছিলো। আমি খুব খুঁটিয়েই দেখলাম, তাদের কারো চেহারায় ভয়ভীতির তেমন ছাপ নেই। বেশ নিস্পৃহ তারা। এদিক ওদিক চায়, টুকটাক কথাও বুঝি বলে!
খুব স্বাভাবিক।

স্বাভাবিক তো থাকবেই।
কারণ ওরা জানে এই রাষ্ট্র তাদের মতোই, ধর্ষক। অথবা নিস্পৃহ জনগণের মতো, ধর্ষণ বান্ধব। ওরা খুব ভালো করেই জানে ধর্ষণের জন্য এই রাষ্ট্রটি বেশ সরেস। এর জন্য এখানে তেমন কোন শাস্তি নেই। স্বীকার করলেও সাত তাড়াতাড়ি ন্যুনতম শাস্তি যা আছে তাও হয় না। পনেরো ষোল বছরে মোটামুটি একটা রায় হয়। তারপর আরো পাঁচ ছয় বছর লাগতেই পারে।

তাছাড়া এখানে ধর্ষক একলা ধর্ষণ করে জামিন পেয়ে বন্ধুবান্ধব নিয়ে গণধর্ষণ করে এমন নজিরও আছে বেশ।
হয়তো তাদের কেউ বুঝিয়েছে, ‘আরে ব্যাডা স্বীকার কইরালা। স্বীকার করলেও যা, না করলেও তা। শাস্তি তো তরার হইতোই না।’ তাই তারা পাঁচজন, সেই পঞ্চধর্ষক বেশ মৌতাতে আছেন টিভি ক্যামেরা স্থির ক্যামেরার সামনে।
তাদের আটদিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। খুব খুশির খবর। তবে আমাদের জন্য মোটেই না।
কারণ আমরা জানি এই তো কেবল শুরু খেলার। দীর্ঘমেয়াদী এক খেলা।
এদের রিমান্ড চলতে চলতেই আরো কেউ শিকার হবে হায়েনাদের। হতেই থাকবে ..হতেই থাকবে।

এইসব দেখে শুধু আমরা ভেতরে ভেতরে পুড়ে যাই, কুঁকড়ে গুটিয়ে যাই। গুটিয়ে একটা কেন্নোর মতো পড়ে থাকি।
তাহলে লিখছি কেন?
এও এক কাহিনী।
কুঁজোর চিৎ হয়ে শোবার মতো এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে কেন্নোর জীবন নিয়েও মানুষের মতো লিখতে থাকি।

ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখার মতোই একখানা স্বপ্ন দেখি, জনগণ সব একজোট হয়ে রাষ্ট্রকে এমন চাপ দিয়েছে যে খুব দ্রুত সব ধর্ষণের বিচার হয়ে যাচ্ছে। ধর্ষকরা ফাঁসির দড়িতে ঝুলছে একের পর এক। বাকি ধর্ষকরা যারা ঘাপটি মেরে ছিলো তারা রাতারাতি ‘মানুষ’ হয়ে উঠছে।
কমে গেছে ধর্ষণ।
নাই হয়ে গেছে একেবারে।

সালমা লুনা

দেশটা আমাদের কন্যাদের, বোনদের, মায়েদের জন্য সত্যিকারের সোনার বাংলা হয়ে উঠছে যার স্বপ্ন কোন রাজনীতিবিদ দেখেননি। এদেশের সহস্রকোটি মানুষ দেখেছিলো। কোন তৈলবাজ নেতার মুখের বুলি নয়, এ ছিলো লাখো মুক্তিযোদ্ধা আর লাখো বীরাঙ্গনা নারীর একমাত্র চাওয়া। আমাদের মতো অজস্র মানুষ যারা এখনো এই দেশটাকে ভালোবেসে এখনো কোথাও চলে যাইনি বা যাইনা তাদের বাংলাদেশ।

আমি কেন ধর্ষণ নিয়ে লিখি?

সন্তানদের সামনে বড় লজ্জা হয়, তাই লিখি।

আয়নায় দাঁড়ালে নিজের চোখে চোখ পড়লে লজ্জা হয় তাই লিখি।

নিজের নারী জন্মের দায় শোধ করতে লিখি।

কন্যার মা বলে লিখি।

নারীর অপমান আর কষ্ট আমারই কষ্ট আর অপমান বলে লিখি।

আপনার ভালো না লাগলে আমাকে ত্যাগ করুন। আমি লিখবোই ।

না। লজ্জা করে না আমার। বরং লজ্জা হওয়া উচিত আপনার। আপনি ধর্ষণের এই মহাউৎসবে চুপ থেকে ইন্ধন যুগিয়ে চলেছেন বলে। চুপ থেকে এই অন্যায়টিকে মেনে নিচ্ছেন বলে।

শেয়ার করুন:
  • 104
  •  
  •  
  •  
  •  
    104
    Shares

লেখাটি ৩৫০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.