মেয়ে জনমের কান্নাগুলো শেষ হোক, এবার শিখুক প্রতিরোধ!

0

নাদিরা সুলতানা নদী:

কন্যা শিশু, কিশোরী, তরুণী বা নারী এমনকি কিশোর ছেলেদের প্রতি যেভাবে যৌন সন্ত্রাস হচ্ছে আমার বাংলাদেশে, হাটে ঘাটে, স্কুলে, এমনকি মসজিদে, আজকাল তার প্রতিবাদের ভাষাও হারিয়ে ফেলেছি… আর কী বলা যায়, কাকে বলা যায়!

এইসব ভাবতে ভাবতে যাপিত জীবনের নানান চাপ নিয়ে নিঃশ্বাস নেয়ার জন্যে চোখ ফেরাই ‘গাছ ফুল লতা পাতাতেই দিনশেষে, গত কদিন ধরে! কিছু সময় আমি ইচ্ছে করেই কিচ্ছু দেখি না, পড়ি না। কারণ মাঝে মাঝেই নিঃশ্বাস নিতে পারি না, এমন সব খবরে।

তারপরও দম নিয়ে ফের আসি স্বাভাবিক জীবনে। একটু আধটু লিখি, প্রকাশ করি ক্ষোভ। কাছের অনেকের মতামত জানা হয়, চেনা হয় অনেককেই ভিতর থেকে নতুন করে! শেষমেষ কিছু না কিছু প্রতিক্রিয়াও জানিয়ে ফেলি, নিজেরে করি একটু নির্ভার বাংলাদেশ ভাবনা নিয়ে নিজের স্বপ্নগুলো বাঁচিয়ে রাখতে! আবার জেগে উঠে বলি, মেয়ে জনমের গুমরে থাকা কষ্টগুলো মুছতেই হবে, আর নেয়া যায় না।

কন্যা শিশু, কিশোরী, তরুণী বা মাঝ বয়সী অনেক নারীকেই বাংলাদেশে এক জনমে শুধুমাত্র শারীরিক অবয়বের জন্যে সারাটা জীবন যে কতভাবে কত জায়গায় কী ভীষণ তটস্থ হয়ে চলতে হয়। অনেক সাবধানতার পরও কতোভাবে যে অনাকাংখিত স্পর্শ বা হয়রানির শিকার হতে হয় তা নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মেয়েদের একটু বেশিই জানা আছে!

আমি নিজেও এদেরই একজন, আমারও আছে বেশ লম্বা একটা ধূসর কালো সময়। সেই কিশোরী আমি গ্রামে ছিলাম, উটকো চিঠি, পাড়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী পরিবারের ছেলের উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার হুমকি। পরিবার পাশে ছিল। সব কাটিয়ে উঠে শহরে স্কুলে পড়তে এসেছি, ময়মনসিংহ শহরের যে পাড়ায় থাকতাম সেখানেও টানা ২/৩ বছর পাড়ার সবচেয়ে বাজে ছেলেদের কত রকমভাবে যে হয়রানি সহ্য করতে হয়েছে। একাই সামলে নিয়েছি, কষ্ট পেয়েছি, আর ছেলেদের ঘৃণা করতে করতে স্কুলে কলেজ জীবন পাড়ি দিয়ে ফেলেছি!

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গল্প অনেক বর্ণাঢ্য। ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা বাসে ট্রেনে একটা সময় পর একাই যাওয়া আসা করতে হতো। কমলাপুর রেল স্টেশনে নেমেই কৌশলে মিশে যেতে হতো কোন না কোন পরিবারের সাথে। আমি একা নই এটা বোঝাতে রীতিমতো ভাবতে হতো! আহ কত রকম কৌশল, নিজের মতোন করেই বানিয়ে নিতে হয়েছে ছোট্ট একটা শরীর বাঁচাতে!

আজ লিখতে বসে নিজেরই চোখ ভিজে উঠছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত হয়েছি শুরু থেকেই। প্রায় সারাদিনই অনেকগুলো ছেলেমেয়ে, তবে বেশিরভাগ সময়ই ছেলেদের নিয়ে চলেছি, ফিরেছি, খেয়েছি, আর নিজের সব হারানো বিশ্বাসকে মজবুত করেছি একটু একটু করে। সন্ধ্যেবেলা পুরানা পল্টনে দলের অফিসে যেতাম মাঝে মাঝেই, কারো সাথে চলতে যেয়েই মনে হয়নি আমি শুধুই একটা ‘মেয়েমানুষ’!

তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সংগঠন, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রেসিডেন্ট আমি, সহকর্মী ছোট ভাইকে নিয়ে পল্টনের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি রিক্সার জন্যে একদিন, বেশ ভীড়। হঠাৎই মনে হলো অনাকাঙ্খিত কোন হাত আমাকে পেছন থেকে ছুঁয়ে দিয়ে দ্রুত পালিয়ে গেলো!

অনেকদিন পর আরও একবার আমি শুধুই একটা ‘মেয়েমানুষের শরীর হয়ে উঠি আরো একবার’! সেদিনের মতো মন খারাপ অনেকদিন হয়নি, হায় আমি যাদের নিয়ে চলি তারা তো বাংলাদেশ না তাহলে! আমি যে ছেলেগুলোকে চিনি জানি মিশি, তার বাইরের সব ছেলেই কি এমন বিকারগ্রস্ত!

আমি কেঁদেছি হলের শাওয়ার ছেড়ে অঝোরে, অলক্ষ্যে, ক্ষোভে ফুঁসেছি, আর শেষমেশ সব সময়ই জেনেছি বাইরের বেশির ভাগ পুরুষ এমন অসুস্থ।

চাকরি জীবনেও রাস্তায় চলতে গিয়ে পেয়েছি কত শত বিকৃত পুরুষের আকার!

একটা ছেলে বিকৃত মানসিকতা নিয়ে বড় হয়, তার পিছনে থাকে, পারিবারিক শিক্ষা, সমাজ, ধর্ম এবং আমাদের অনেকের দৃষ্টিভঙ্গি, যার মাঝে আছে নারীও। বিশেষ করে বাংলাদেশে, ‘মেয়েমানুষের চলাফেরা’ কী হওয়া উচিত, এটা যে সবার ভাবনার বিষয় না, এই নিয়ে যে একটা আলাদা ভাবনার জগৎ থাকতেই হবে বিশেষ করে পুরুষদের, এটা যে ঠিক না, সভ্য না ব্যাপারটা, সেটাই মনে হয় না আমার জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারবো!

খুব দুঃখজনক ঘটনা ঘটে গেলো এইতো ক বছর আগে বনানীতে। এই বিষয়েও আমরা একমত নই, মেয়েরা ধর্ষিত হয়েছে কী হয়নি তারও আগে, রাত কত হয়েছিল, কেন গিয়েছিলো এই প্রশ্ন কিশোর যুবা তরুণ নারী নির্বিশেষে আমার বাংলাদেশে আজও আছে এবং থাকবে বলেই মনে হচ্ছে আরো অনেক দশক!

ভাবছি নির্যাতক নিপীড়কদের থামাতে আমরা কী করবো, কী করছি! যারা পড়ছেন তারাও আজ আরো একবার ভাববেন কি কী কী করতে পারি আমরা, যে যার জায়গা থেকে! আমরা কি আর সুস্থ সুন্দর স্বাভাবিক নারীবান্ধব পরিবেশই পাবো না নিরাপদে চলার জন্যে কোথাও বাংলাদেশের?

স্কুল, কলেজ, ইউনি, মাঠ, ঘাট, বাস, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, কোনটা নিরাপদ জায়গা আজ?

আজ শেষ করি নিজের একটা প্রবাসী অনুভূতি দিয়ে। যখন তখন চোখ ভিজে যাওয়ার রোগ আমার আছে, প্রবাসী জীবন বেছে নেয়ার পর এটা আরো বেড়েছে। বাংলাদেশ ছেড়ে আসার পর পর একদিন কাছের একটা পরিবারের সাথে রাতের খাওয়া দাওয়া আড্ডা দিয়ে গাড়ি করে ফিরছি, এখানকার প্রায় শেষ রাত, ৩/৪ টা বোধ হয়। রাস্তা ফাঁকা, তারপরও ট্রাফিকে লাল লাইটে থেমে নিয়ম মেনেই ফিরছি। এখানে মাঝরাতে রাস্তার যেকোনো সংস্কার কাজ সেরে ফেলা হয়। কোন এক ট্রাফিকে আমাদের গাড়ি থেমেছে, হঠাৎই আমাদের পাশে এসে থামে একটা ট্যাক্সি, অপরূপ এক তরুণী গান শুনে মাথা দুলাতে দুলাতে ড্ৰাইভ করছে, আমি হাসি বিনিময় করি। রাস্তার অন্যপাশে তাকিয়ে দেখি কাজ করছে রোড্স্ মেইন্টেইনেন্স এ যে কজন তার মাঝেও দুইজন তরুণী, কী যে ঝকঝকে তকতকে হাসিখুশি!

বাংলাদেশ থেকে আসা অনেক পোড় খাওয়া মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা মেয়ে আমি, এসেছিও নুতন। মেয়ে হলেই কত জায়গায় কতভাবে জীবন গুটিয়ে নিতে হয়, দেখেছি আমি! সেই আমি এটা ঠিক, বিদেশ জীবনে আসতে চাইনি, আমার নিয়তি আমাকে টেনে এনেছে। কিন্তু সত্যি বলছি সেই রাতে আমি চোখ ভিজিয়েছিলাম সভ্য একটা পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে আমিও মুক্ত বাতাস নিতে পারছি ক্ষণিক হলেও সে আনন্দে!

আমার সোনার বাংলায় কেন হবে না… কেন তবে সব আবেগ নিয়ে গাই, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’… গাইতেই তো চাই, চোখে নিয়ে আনন্দাশ্রু! কিন্তু এতো এতো অন্ধকার কেন আজও মেয়ে জীবনকে নিয়ে এই বাংলায় আজও?

মেয়েজনমকে নিরাপদ না রাখতে পারলে তো একটা দেশকে সভ্যতার মানদণ্ডেই আনা যায় না। কেন বাংলাদেশে এমন বিচিত্র নির্মম সব ঘটনা সামনে আসছে বারবার…আর একটাও শুনতে চাই না, না কিছুতেই না!

কলামিস্ট/সংস্কৃতি কর্মী
উপস্থাপক, রেডিও বাংলা
সহযোগী সম্পাদক, প্রশান্তিকা।
মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া

শেয়ার করুন:
  • 209
  •  
  •  
  •  
  •  
    209
    Shares

লেখাটি ৪৭৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.