মে দিবসে শুধুই ৮ ঘন্টা কাজের দাবি নয়, শ্রমিকশ্রেণির মুক্তি হোক প্রধান লক্ষ্য

0

মনজুরুল হক:

বর্ষ পরিক্রমায় আবারও খেটে খাওয়া মানুষের স্বপ্ন সার্থকতার দিন মহান মে দিবস এসেছে। তবে আর দশ-পাঁচটা দিবসের মতো আপামর বাঙালির জীবনে এ নিয়ে তেমন কোনো উচ্ছ্বাস নেই। ওইদিন সরকারি ছুটি থাকে বলে মধ্যবিত্ত বাঙালিরা বউ বাচ্চা নিয়ে একটু ঘুরতে টুরতে বেরোয়। পয়লা বৈশাখের মতো পান্তা ইলিশের জবজবানি নেই। ভ্যালেন্টাইন দিবসের মতো রংচঙা কাপড় চোপড় পরে একে অপরকে খামোখা ভালোবাসার ছেনালি দেখাবার সুযোগও নেই। তারপরও আজকাল ‘মে দিবসের শুভেচ্ছা’ দেওয়ার চল হয়েছে!

এ দিনটিতে কে কী করবেন সেটি বলার আগে মোটা দাগে দেখে নেয়া যাক বাংলাদেশে শ্রমিকদের মুক্তির জন্য যারা বছরের পর বছর রাজনীতি করছেন, জীবন ‘পানি’ করে দিচ্ছেন, ‘আত্মত্যাগ’ করতে করতে বুকের খাঁচা থেকে ‘আত্মা’টাই বেরিয়ে গেছে, তারা কীভাবে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি চাইছেন?
বিস্তারে না গিয়ে খুব সংক্ষেপে বলে দেয়া যায়-

বাংলাদেশে যারা শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির জন্য ‘লড়ছেন’ বলেন, তারা আসলে বছরের পর বছর শ্রমিক শ্রেণিকে বিপথগামী করে আসছেন। বিভ্রান্ত করছেন। শ্রমিকের লড়াকু চরিত্রকে প্রভুভক্ত কুকুরের মত করে দিচ্ছেন! এদেরকে কোনোকালেও নির্বাচনে জিততে দেয়া হবে না, শ্রমিকরেও আর ক্ষমতায় যাওয়া হবে না। এবং ক্ষমতায় যেতে না পারলে তার মুক্তিও নাই।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদের গোঁড়ার কথা:
শ্রমিক শ্রেণিকে সামন্তচিন্তার পুঁজিবাদের নিগড় থেকে মুক্তি পেতে হলে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে উগ্র বলপ্রয়োগ করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে হবে। এই দখলের পথ মাত্র দুটি। একটি জনগণতান্ত্রিক গেরিলা যুদ্ধ, আরেকটি সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থান। এর বাইরে যা তা সবই নির্ভেজাল ভণ্ডামি। অথচ এই বাম এবং কমিউনিস্ট নামধারী পার্টিগুলো বছরের পর বছরে সেই বিভ্রান্তিকর পথে শ্রমিকদের চালিত করছেন। শ্রমিকদের শেখাচ্ছেন ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারলেই সব মুক্তি-টুক্তি এসে যাবে। দেশে দুধের নহর বয়ে যাবে! ক্ষীরের পাহাড় গড়ে উঠবে!

এই হিপোক্র্যাটরা সরকারের চা-কফি গিলে, মাঝে মাঝে বিদেশ-টিদেশ ঘুরে, সেমিনারে লেকচার দিয়ে, পিকনিক টিকনিক করে, দু’একটা শ্রমিক র‌্যালী করে এরকম দিবস এলে মাথায় লাল পট্টি বেঁধে শ্রমিকের মুক্তির সস্তা নাটক করেন। এর সাথে আছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় এনজিও। তারা শ্রমিকদের মুক্তির পথ চিরতরে বন্ধ করার জন্য বিদেশি প্রভুদের ফান্ড এনে শ্রমিকের চাহিদার অর্ধাংশ নিশ্চিত করে তার বিপ্লবাকাঙ্খাকে কবর দিয়ে দিয়েছে। এদের নষ্টামো আর ধ্যাষ্টামোর কথা বলতে গেলে এই পরিসরে কুলোবে না। এইসব নষ্টামি করে এরা আবার পদক টদকও পেয়েছেন!

এরপর থাকলো সরকারের ছত্রছায়ায় শ্রমিকের মুক্তি! সেটা হলো ‘সোনার পাথর বাটি’। সাপ আর ব্যঙকে এক খাঁচায় রেখে কপট শাসনের ভঙ্গিতে বলা হচ্ছে- ‘খবরদার ব্যঙটাকে খাবে না কিন্তু!’ এদের ছত্রছায়ায় দেশের সবচেয়ে বেশি আর সংগঠিত পরিবহন শ্রমিকরা আজ মাফিয়া চক্রের হাতে বন্দী! তারা নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। তার পরও দেশের ১৭ কোটি মানুষের প্রায় ৬০ ভাগ ভূমিহীন। এরা অনেকেই শ্রমিক। অনেকেই নেতাদের ফরমাশ খাটতে খাটতে লুম্পেন।

প্রতি বছরের মতো এবারও এই দিনটিতে সরকার প্রধান, মন্ত্রীবর্গ, রাষ্ট্র প্রধান, প্রধান বিরোধী দল, ছাও পোনা বিরোধী বা সহমতের দলগুলো বাণী দেবে। খুব সকালে পরিবহন শ্রমিকরা মাথায় লাল পট্টি বেঁধে বিনা ভাড়ার বাসে-ট্রাকে মিছিল করে হৈহুল্লোড় করবে। নেতা-নেত্রীরা এখানে ওখানে ভাষণ টাষন দেবেন। মিডিয়ায় দিন ভর আরোপিত শ্রমিক দরদি কাঁসুন্দি বেটে দর্শককে খাওয়ানো হবে। রাতে তাবড় তাবড় সব বিদ্ব্যৎজনেরা স্টুপিড বাক্সো গরম করে ফেলবেন। পত্রিকাঅলারা প্রথম পাতার কোণায় এক ইট ভাঙ্গা শ্রমিকের বা নারী শ্রমিকের ছবি ছেপে ক্যাপশন লিখবে…..‘আজ ঐতিহাসিক মে দিবস’! ‘আজও কি শ্রমিকের মুক্তি এসেছে?’ এবং রাত ফুরোলেই ওই মহান মে দিবসের যবনিকা টেনে দেয়া হবে।

কিন্তু যে শিশু শ্রমিকটি বাসা বাড়িতে অগুনতি ঘণ্টা ধরে গাধার খাটনি খেটে চলেছে, খুব ভোরে উঠে যার দিন শুরু, আবার রাতে সবার খাওয়া দাওয়া শেষ হলে যার ঘুমোনোর সময়, তার জন্য কোনো আট ঘণ্টার মহান মে দিবস নেই। সে জানেও না আট ঘণ্টা মানে কত ঘণ্টা? ট্যানারির নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে যাওয়া গন্ধময় পরিবেশে যে শ্রমিকরা কাজ করছে, তাদের সাথে যে শিশু শ্রমিকরা নোংরা ময়লা ঘেঁটে জীবনের সুকুমার শৈশবকে মাটি চাপা দিচ্ছে, বয়লারের পাশে গনগনে আগুনের পাশে দাঁড়ানো যে শ্রমিকটির মুখ সারাক্ষণই লাল হয়ে জ্বলছে, শহরের বাইরে মায়ের সাথে ইট ভাঙ্গছে যে কচি শিশুটি তার কাছেও মে দিবস কোন গুরুত্ব বহন করে না। সে জানে তার হাতে ধরা হাতুড়ি একটু বেসামাল হলেই আর এক হাতে পড়বে! চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাবে।

সায়েবদের বাজার বয়ে বয়ে বাড়ি পৌঁছে দেয়া শত শত কচি ছেলে মেয়েগুলো সেই কাকডাকা ভোরে উঠে বাজারে আসে। ওখানেই খায়, ওখানেই ঘুমায়। ডাইং ফ্যাক্টরিতে যারা কাজ করে, তাদের কারো হাতে গ্লাভস নেই। কস্টিক সোডা, ব্লঙ্কা ফল, এসিটিক এসিড, রেজিন, ব্লিচিং পাউডার আর এমন হরেক রকম জটিল রাসায়নিকে ভিজে তাদের হাতগুলো থ্যাকথেকে সাদা সাদা হয়ে আছে। সেই দগদগে ঘা কখনোই শুকোয় না। ঝাল মরিচে রান্না তরকারি দিয়ে ভাত খেতে গেলেই অন্তরাত্মা পর্যন্ত জ্বলে উঠে। চোখের পানি গাল বেয়ে ঠোঁটের কোণা দিয়ে মুখে চলে যায়। ওভাবেই দিন শুরু আর দিন শেষ!
দয়াগঞ্জ ব্রিজের দুপাশে দাঁড়ানো যে শিশুরা তাদেরও জীবন শুরু হয় খুব ভোরে। বোঝাই রিকশা ঠেলে ঠেলে ব্রিজ পার করা তাদের কাজ। এখানে আট ঘণ্টা নামক কোনো ব্যাপার নেই। সারা ঢাকা শহরে শকুনের মতো শ্যেন দৃষ্টি মেলে আরো হাজার হাজার শিশুর দিন শুরু হয়। তারা কাগজ কুড়োয়। এক হাতে পলিথিনের বস্তা আর এক হাতে ক্রমাগত কাগজ কুড়িয়ে চলে। ওদেরও শ্রম দিবস মানে বার থেকে ষোল ঘণ্টা।

এই মহানগরীতে ঠিক কত লাখ শ্রমিক এবং সেই সব শ্রমিকের কত লাখ অপ্রাপ্ত বয়সের শিশু শ্রমিক তার কোন খতিয়ান মহান রাষ্ট্রের কোন দপ্তরে নেই। ঠিক কত লাখ ‘কাজের মেয়ে’ এই মহানগরীতে শ্রম শোষণের শিকার, কত লাখ নারী-পুরুষ বাসা বাড়িতে যৌন হয়রানির শিকার, কত লাখ অপরিণত বয়সী মেয়ে বাড়ির কর্তা, দারোয়ান, গ্রামের আত্মীয়, ড্রাইভার আর এই টাইপ অফিসিয়াল ধর্ষকের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়, তারও কোন অথেনটিক স্ট্যাটাস সরকারের হাতে বা তথাকথিত মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কাছে নেই। এদের কেউ তার কর্ম জীবনে আট ঘণ্টা বলে যে একটা শব্দ আছে সেটাই জানেনি। বোঝেনি। তাদের জানতে বা বুঝতে দেয়া হয়নি।

শ্রম শোষণ বা শ্রম চুরির মতো একটি অত্যন্ত জরুরি বিষয় নিয়ে এই রাষ্ট্র, সরকার, বিরোধী দল, ছোট বড় হেন-ত্যান দল এবং বুদ্ধিবেপারিদের কোন চিন্তা নেই। এ নিয়ে সংবিধান সংশোধনও হবে না, সংসদে কোনো বিলও পাশ হবে না। অথচ সারা দেশে প্রায় সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় কোটি গতরখাটা শ্রমিকের সিংহভাগই শ্রম শোষণের শিকার। সেই অজ পাড়াগাঁ থেকে শুরু করে এই তিলোত্তমা মহানগরীতে বেশুমার সেই শ্রম শোষণ আর শ্রমচুরি চলছে। এদেশে যে কোটি কোটি ক্ষেতমজুর সারা দিনমান শ্রম দিয়ে চলে তারা অফিসিয়ালি শ্রমিক নয়! সরাসরি এই চুরির সাথে জড়িত এ দেশের প্রায় সকল বিত্তবান, মধ্যবিত্ত এবং ক্ষুদে বিত্তের মালিকগণ।

যে মেয়েটি বাসায় কাজ করার বদলে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে কাজ করে, সে মনে করে এখানে বারো ঘণ্টা কাজ করলেও সকাল-বিকাল মালকিনের লাথিগুঁতো নেই। কিন্তু লাথিগুঁতো যাদের নিত্যসঙ্গী তারা পার পাবে কী করে? গার্মেন্টেও ওদের ছোট ছোট শরীরের ওপর বড় বড় শরীর রাত বিরেতে উঠে পড়ে। ‘না’ করতে পারে না। ‘না’ বললে চাকরি থাকবে না। ওই অপারেটরদের ভেতর থেকেই কোনো কোনো মেয়েকে যারা দেখতে একটু ভালো তাদের ডাক পড়ে মালিকের খাস চেম্বারে। ওইসব মালিকরা বেশ তৃপ্তি সহকারেই বলেন- ‘বাজারের অসুখ বিসুখঅলাদের চেয়ে এরাই ভালো!’

ওই যে সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় কোটি গতরখাটা শ্রমিকের প্রায় এক তৃতীয়াংশই শিশু শ্রমিক। বিশ্বের আর কোথাও বিভিন্ন বিপজ্জনক সেক্টরে এতো শিশু শ্রমিককে দিয়ে কাজ করানো হয় না। এখানে হয়, কারণ এখানকার শিল্পপতি থেকে শুরু করে হালের মডার্ণ আইটি স্পেশালিস্ট, টেকনোলজিস্ট, সিভিল ব্যুরোক্র্যাট, মিলিটারি ব্যুরোক্র্যাট, বিদেশে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত নিয়োমর্ডানিস্ট, একেবারে হালের তরুণ প্রজন্ম সবাই সেই পিতৃপুরুষের এস্তেমালের সামন্তবাদে আক্রান্ত। ভীষণভাবে আক্রান্ত। সামন্ত প্রভুদের জুতো মোজা খুলে দেয়ার জন্য, অজুর পানি দেয়ার জন্য, মাথায় ছাতা ধরার জন্য, ভেতর বাড়ি থেকে পানটা সুপারিটা এনে দেয়ার জন্য একটা ‘পিচ্চির’ দরকার হয়। অথচ পুঁজিবাদে সক্ষম এবং স্কিল্ড শ্রমিক একটা এ্যাসেট। পুঁজিবাদ সেই এ্যাসেটকে বাঁচিয়ে রাখে, তাকে দিয়ে আগামী দিনেও যেন কারখানার চাকা চালু রাখা যায়। সে কারণে পুঁজিবাদের চরম উৎকর্ষেও স্কিল্ড শ্রমিকের চাহিদা ফুরোয় না।

কিন্তু সামন্তপ্রভুরা জানেন, ওদের না বাঁচলেও চলবে, কারণ কালই আবার ঝাঁকে ঝাঁকে পয়দা হতে থাকবে। সামন্তপ্রভুর কাছে শ্রমের বিনিময় মূল্য স্রেফ পেটেভাতে! পেট পুরে ভাত দেয়া হয়, এটাই সামন্তবাদের মহান বদান্যতা! আর বছর বছর জিডিপি নিয়ে রেমিট্যান্স নিয়ে ভেরেন্ডাভাজা আমলা-চামচাদের চিৎকার চেচামেচির পরও, লাখ লাখ শ্রমিক বিদেশে কাজ করে কড়কড়ে কারেন্সি নোট কামাই করে আনলেও, আইটি দিয়ে ডিজিটাল সিস্টেমে দেশ ভরিয়ে দেয়ার কেতাবি ঘোষণার পরও এদেশে যথাযথ পুঁজিবাদী সংস্কৃতি গড়ে উঠলো না। অনুদান দেয়া আমেরিকা মাঝে মাঝে শিশু শ্রম নিয়ে, কল কারখানায় বিশেষ করে গার্মেন্ট কারখানায় শ্রমিকদের সিবিএ বা বার্গেনিং অথোরিটি করার হুমকি টুমকি দিলে এদেশী চামচারা এক গাল হেসে দিয়ে বলেন- ‘স্যার ও দেখতে ছোট, কিন্তু লইতে পারে’! সাদা সায়েবরা এই জঘণ্য কুৎসিত ইঙ্গিত বোঝেন না। তারা ভাবেন গ্রোথ কম! তারা টিক মার্ক দিয়ে দেন। শিশুরা শ্রমিক ‘শ্রম বঞ্চিত’ হয় না! অর্থাৎ শিশুদেরও কাজের সুযোগ দেয়া হলো! এই আধা সামন্তবাদী- আধা পুঁজিবাদী জগাখিঁচুড়ি পাশবিক বণিক সমাজে তাই মে দিবস এবং সেই সেই দিবসের প্রতিপাদ্য এটুকুই যে দিনটি শ্রমিকদের দিন!

ইতিহাসের মে দিবস:
অগাস্ট স্পীজসহ ১৮ জন শ্রমিকের আত্মাহূতির বিনিময়ে আট ঘণ্টা কাজের অধিকার পাওয়ার পর পেরিয়ে গেছে একশ পনের বছর। সেই ১৮৮৬ সালের পয়লা মে শিকাগোর হে মার্কেটের শ্রমিকদের জীবনের মূল্যে যে আট ঘণ্টা শ্রমের দাবি তা আজও বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বাস্তবায়ন হয়নি। এই একশ পনের বছর পৃথিবী তার কক্ষপথে নিয়ম করে ঘুরেছে। দেশে দেশে শ্রমিক শ্রেণীর সরকার কায়েম হয়ে আবার পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তর ঘটেছে। গোলার্ধের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত এখনো ন্যুনতম শ্রমের মজুরির দাবি উপেক্ষিত। এখনো শ্রমিককে তার সেই আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলন করতে হয়। এখনো শ্রমিককে আট ঘণ্টার বদলে দশ ঘণ্টা এমনকি বার ঘণ্টা কাজ করিয়ে সেই আট ঘণ্টার হিসেবেই মজুরি দেয়া হয়। এতোকিছুর পরও বছরের এই একটি দিন, পহেলা মে, এই দিনটি যেন শ্রমিকদের বিজয়ের দিন! এই একটি দিনেই যেন সারা বিশ্বের শ্রমিক তার মুক্তির দিন মনে করে ক্ষণিকের উল্লাস করে।

বাংলাদেশে সরকারি আধা সরকারি কলকারখানাগুলোতে যেখানে শিফট চালু আছে, সেখানে কোথাও কোথাও দিনে আট ঘণ্টা কাজের নিয়ম পালিত হলেও সারা দেশে লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে দশ-বার ঘণ্টা, কোথাও কোথাও ষোল ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো হয়। অফিসিয়ালি বলা হয়, অতিরিক্ত শ্রম ঘণ্টার জন্য ওভারটাইম দেয়া হয়। কিন্তু যে সব সেক্টরে শ্রমিকদের বার্গেনিং এজেন্ট বা সিবিএ আছে সেই সব সেক্টর ছাড়া আর কোথাও ওভারটাইমের টাকা যথাযথভাবে আদায় করা যায় না। বাংলাদেশে গার্মেন্ট চালু হওয়ার আগে দুএকটা বড় বড় কল কারখানায় যে শিল্প শ্রমিকরা কাজ করত তাদেরই ধরে নেয়া হতো দেশের সবচেয়ে সংগঠিত শিল্পীয় শ্রমিক। গার্মেন্ট চালু হওয়ার পর এখন এটাই সবচেয়ে শ্রমঘন সেক্টর। গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোতে প্রায় ত্রিশ লাখ শ্রমিক কাজ করে। এবং বিস্ময়করভাবে এই সেক্টরে শ্রমিকদের দাবি আদায়ের জন্য কোনো সিবিএ বা বার্গেনিং এজন্ট নেই।

এটা অনেকটা নিয়মের মতোই হয়ে গেছে যে, শ্রমিকরা তাদের বেতন ভাতা, বোনাস, ওভারটাইমের দাবিতে কর্মবিরতি করবে, কারখানা গেটের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করবে। এক সময় পোশাক শ্রমিকদের জন্য হিংস্রভাবে গড়ে তোলা বিশেষ পুলিশ আসবে, র‌্যাব-বিজিবি আসবে, বিশেষ বাহিনী আসবে। এবং নির্বিচারে শ্রমিকদের উপর নির্মম নির্যাতন চালাবে। ঘটনাস্থলেই কিছু শ্রমিক মারা যাবে। হাসপাতালে এবং পথে ঘাটে আরো কিছু মারা যাবে। কিছু শ্রমিককে মালিকের পোষা গুণ্ডারা পিটিয়ে হত্যা করবে। কিছু শ্রমিকের লাশ ওই বিশেষ বাহিনী গুম করে দেবে। চূড়ান্ত বিচারে দেখা যাবে দশ-পনের হাজার নাম না জানা শ্রমিকের বিরুদ্ধে অমুক থানায় হত্যা, অগ্নিসংযোগ এবং লুটতরাজের মামলা দেয়া হবে। ওই মামলায় এর পরে যাকে তাকে ধরে আসামি বানিয়ে দেয়া হবে। আর এই শ্রমিক নিধনের নির্লজ্জ খেলাটা প্রকাশ্যে এদেশের বিশেষ বাহিনী মালিক পক্ষের সহায়তায় সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে খেলবে। এবং এটা প্রায় রোজকার নিয়ম।

এর পরও যদি শ্রমিকরা তাদের দাবি টাবি নিয়ে আরও একটু সোচ্চার হতে চায়, তাহলে তাদেরকে কারখানার ভেতরে রেখে বাইরে থেকে দরোজা জানালা বন্ধ করে মেইন গেটে তালা দিয়ে চাবি নিয়ে পালিয়ে যাবে সিকিউরিটি গার্ড নামক পোষা চামচারা। তারপর খুব ঠাণ্ডা মাথায় কারখানায় আগুন ধরিয়ে দেয়া হবে। জ্যান্ত পুড়ে মরবে ডজন ডজন হতভাগা শ্রমিক। ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা দিনশেষে প্রতিবেদন দেবে-‘সর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে’! সরকার এবং মালিক পক্ষ তিন বা চার সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি করবে। সেই কমিটি দিন সাতেক বা দিন দশেক পরে একটা তদন্ত রিপোর্ট জমা দেবে। যা কোনো দিনও আলোর মুখ দেখবে না। মোদ্দা কথা হচ্ছে এই সেক্টরে যে হতভাগা শ্রমিকরা কাজ করে তারা নির্ভেজাল দাস।

এই সেক্টরের বাইরে সারা দেশ নয়, শুধু মাত্র ঢাকা শহরেই প্রায় চার থেকে সাড়ে চার লাখ শিশু শ্রমিককে দিয়ে অমানবিক কাজ করানো হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস তাদের অমানবিকতার বিরুদ্ধে কোনো বার্তা বয়ে আনে না। ঢাকাতে সব চেয়ে বেশি শিশু শ্রমিক কাজ করে বাসা বাড়িতে আর হোটেল রেস্তোরাগুলোতে। বাসা বাড়িতে যারা কাজ করে তাদের কোন শ্রম ঘণ্টা নেই। ভোর থেকে শুরু করে রাত বারটা একটায় ঘুমানোর আগ পর্যন্ত তাদের শ্রম ঘণ্টা। খাওয়া-পরা সমেত বেতন এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। খাওয়া পরা বাদে বেতন দেড় হাজার থেকে দুই হাজার।
হোটেল রেঁস্তোরাগুলোয় যে শিশু শ্রমিকরা কাজ করে তাদের বেতন আরো কম। খুব ভোর থেকে শুরু করে হোটেল রেঁস্তোরা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত এদের কাজ করতে হয়। নোংরা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, গুমোট গরমে সেদ্দ হয়ে সারা রাত ঘুমোতে না পারা এই সব শ্রমিকরা জানেও না শ্রম দিবস কী, বা মে দিবস কী?
শুধু যে এদের শ্রম শোষণ করা হয়, তা নয়। এদের সাথে আরো জঘণ্য কর্মকাণ্ড করা হয়। সিনিয়র শ্রমিক বা হেড বেয়ারা যারা আছে তারা এই সব শিশু শ্রমিকদের উপর শারীরিক নির্যাতন চালায়। এবং প্রায় সবাইকেই কোনো না কোনো সময় বলাৎকারের শিকার হতে হয়।

একানব্বই সালে ক্রেমলিনের চার দেয়াল ভেদ করে পুঁজিবাদী দানব বেরিয়ে এসে সমগ্র পৃথিবীকে আবার নতুন করে গ্রাস করে ফেলার পরও এ দিন মস্কোর রেড স্ক্যয়ারে অশীতিপর বৃদ্ধ বৃদ্ধারা লাল পতাকা নিয়ে হাজির হবেন। অপসারিত লেনিনের মূর্তির পাদদেশে ক্ষণিক তাকিয়ে থাকবেন। ১৯১৭ সালের পর এই রেড স্ক্যয়ারে মে দিবসে কী কী ঘটতো সে সব ধূসর হয়ে যাওয়া স্মৃতি মন্থন করবেন। তার পরও তারা সারা দিন ওই রেড স্ক্যয়ারে পড়ে থাকবেন।

প্যারিসের ল্যূভার স্ক্যয়ারে, স্পেনের রাজ প্রাসাদের বাইরে, বনের ফ্রিডম স্ক্যয়ারে, তিরানার হোক্সা এভেন্যুতে, চীনের তিয়েনআনমেন স্ক্যয়ারে, ভিয়েতনামের হো চি মিন স্ক্যয়ারে, হাভানার চে স্ক্যয়ারে হাজার হাজার শ্রমিক এদিনও সমবেত হবেন। হয়তো নতুন করে শ্রমিকের মুক্তির শপথ নেবেন।

ইউরোপের দেশে দেশে গত এক দশক ধরে নতুন করে যে বিক্ষোভ দানা বেঁধে পাথরের মতো শক্ত হতে শুরু করেছে। সেই পাথরের দৃঢ়তা নিয়ে তারা আরো একটু এগুতে চাইলে হয়তো পুলিশ গুলি ছুঁড়বে। হয়তো এই মে দিবসেই সারা বিশ্বে পুলিশের গুলিতে আরো শত শত শ্রমিকের মৃত্যু ঘটবে!
তার পরও, এত সব হতাশার খণ্ডচিত্রের পরও সারা বিশ্বের শ্রমিক এ দিন তাদের মতো করে পৃথিবীকে আরও একবার যাচাই করে দেখে নিতে চাইবে। নতুন একজন অগাস্ট স্পীজ তাদের সামনে এসে না দাঁড়ালেও তারা এই আশায় আবারও বুকের গহীনে বজ্রনিনাদ শুনবে। এক সময় মনের গহীনে ক্ষীণ হলেও সেই আশার সঞ্চার ঘটিয়ে ঘরে ফিরবে- একদিন এই পৃথিবীটা আমাদের জন্য বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। একদিন আমরাই এই পৃথিবী থেকে মানুষে মানুষে শোষণ বঞ্চনা দূর করে বৈরী দয়ামায়াহীন পৃথিবীটাকে সব মানুষের জন্য বাসযোগ্য করে তুলবো। কেননা একমাত্র শ্রমিকরাই পারে একটি সোনালী আগামীর জন্ম দিতে। এবং তারা তা দেবেনও। আজ বা কাল, বাংলাদেশের ক্লিব কথিত বাম রাজনীতিকদের নাগপাশ ছিড়েঁই।

১লা মে, ২০১৯

শেয়ার করুন:
  • 105
  •  
  •  
  •  
  •  
    105
    Shares

লেখাটি ৭৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.