‘কনে দেখা’

0

দিনা ফেরদৌস:

বার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজেকে আয়নায় দেখছে পলি। নিজেকে দেখছে আর ভাবছে পৃথিবীতে তার চেয়ে সুন্দরী আর কেউ নেই। ইন্টারমিডিয়েট ফেল তো কী হয়েছে, সে ইংলিশ স্পিকিং ক্লাস করছে। সুন্দর সুন্দর মেসেজ দিতে পারে ইংরেজিতে, স্মার্ট দেখাতে গেলে একটু ইংরেজি জানলেই হয়। আজ ছোট চাচার বাসায় এক রেস্টুরেন্টওয়ালা আমেরিকান পাত্র আসবে তাকে দেখতে।

অতো পড়াশোনা দিয়ে কী হবে, ওই তো গিয়ে হাঁড়ি ঠেলা! ভাবতে ভাবতে তার ঘোর ভাঙে নীলার ডাকে, ফুফু তোমাকে ডাকছেন। পলি নীলার দিকে তাকিয়ে অবাক!
কীরে তোদের ঘরে না মেহমান আসার কথা?
এসেছেন তো, বললো নীলা।
ঘরে মেহমান আসবেন তুই ভালো জামা কাপড় পরে থাকবি না?
কী যে বলো আপু, পাত্র আমাকে দেখতে আসছে নাকি?
আরে তাতে কী! নীলা যার নয়নে যারে লাগে ভালো। তরে পছন্দ হতেও তো পারে, আর হলেই আমেরিকা। না, পলি আপু, আমাকে পছন্দ হওয়ার কোন সুযোগ নেই, যেইটা আমার জায়গা না, সেই জায়গা নিয়ে এক মুহূর্তও ভাবি না।

পলি ছোট চাচীর গরীব দূরসম্পর্কের এক ভাইয়ের মেয়ে। চাচীর বাসায় থেকে এখানের ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, আর চাচীর বাচ্চাদের পড়ায়। পলি মনে মনে বললো, আরে আমি তো জানিই তোর কোন যোগ্যতা নেই আমেরিকান পাত্রের বউ হওয়ার, লোভ দেখালাম, বজ্জাত মেয়ে কোথাকার, একটু লোভও নেই মনে, খামোখা সময় নষ্ট করলাম। চল নীলা।

ঘরে ঢুকেই চোখে পড়লো মধ্য বয়স্ক এক নারীকে, আর চল্লিশের কাছাকাছি এক ভদ্রলোক, যার মাথায় চুল কম, শ্যামলা চেহারা, বসার কারণে মনে হচ্ছে ভুঁড়ি যেন উঁকি মারে আকাশে। তার পাশেই এক হ্যান্ডসাম ছেলে বসে আছে, ফর্সা চেহারা, টল ফিগার, মাথা ভর্তি চুল ফ্যাশন করে ছাঁটা, বয়স আনুমানিক সাতাশ/আটাশ হবে।

এই তাহলে পাত্র! আমেরিকান ছেলে সুন্দর তো হবেই। ছোট চাচী পলিকে ডেকে বললেন, এদিকে আয় পলি। ‘আমার ভাসুরের মেয়ে’ পলি ওই নারীকে দেখিয়ে বললেন। পলি তাকে সালাম দিয়ে চাচীর পাশে বসতে যাচ্ছিল, কিন্তু ওই নারী তাকে ডেকে বললেন, আমার পাশে বসো।

পলি বসতে বসতে খেয়াল হলো আজ ছোট চাচী অনেক বেশি সাজগোজ করেছেন, আর কথাও বলছেন ননস্টপ, যেনো উনাকেই পাত্রী দেখা হচ্ছে। ছোট চাচীর বয়স চল্লিশ হলেও দেখে বুঝার উপায় নেই, সব সময় এমন ন্যাকা একটা ভাব ধরে থাকেন যেনো পলির মতো তিনি কোন চব্বিশ বছরের ছুকরি। ওই নারী ছোট চাচীর প্রশংসা করছেন, ‘তোমার ঘর বেশ সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা’।
চাচী খুশিতে গদ গদ, একটু লাজুক ভঙ্গিতে বললেন, ঘর গুছানো, রান্না করা আমার হবি।
নারীটি তখন বললেন, এই রকম মেয়েই তো আমরা চাই। কোন প্রশ্ন থাকলে পলিকে করতে পারেন।
হঠাৎ দেখা গেলো টেবিলে রাখা নাগেট সেই হ্যান্ডসামের হাতে দিয়ে ছোট চাচী বলছেন, উনারা কথা বলছেন বলেন, তুমি ছেলে মানুষ, খাবার সামনে রেখে এইভাবে বসে থাকতে হয় নাকি? নাও বাবা, বলে বেশ যত্ন করে ছেলের হাতে তুলে দিচ্ছেন। ছেলে খাবার হাতে নিয়ে হেসে হেসে বলছে, এই রকমই মেয়ে চাই যে আমাদের সবার খেয়াল রাখবে আন্টির মতো।
চাচীর আবার সেই লাজুক হাসি।
ওই নারীকে বলছেন, আপনার আম্মা আসার কথা ছিল না? তিনি বললেন, আর বলবেন না, হঠাৎ করে আম্মার শরীর খারাপ করে ফেললো, তাই আমাকে দিয়ে পাঠালেন।
পলি কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছে না, পাত্রের সঙ্গে তো ওর মা’ই আসার কথা ছিল। সে যাক, পাত্র পলির ভীষণ পছন্দ হয়েছে। হঠাৎ সেই টাকলু ভদ্রলোক বলে বসলেন, পলি আপনার তো বয়স অনেক কম, একবার ইন্টার খারাপ করেছেন তো কী হয়েছে, যদিও অনেক গ্যাপ হয়ে গেছে, তবুও বলবো, আবার পড়ালেখাটা শুরু করেন। পড়ালেখার সার্টিফিকেট থাকলে সব জায়গায় কাজে লাগে। শুধু ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ জানলেই হয় না। আমেরিকায় যারা রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করে, তারা সবাই ভালো ইংলিশ জানে, পার্থক্যটা হচ্ছে মগজ না থাকলে আর কিছু করার ইচ্ছে না থাকলে, শুধু ল্যাংগুয়েজে কাজ হয় না।

চাচী পলি সম্পর্কে আগেই সব বলছেন যে, সে খুব সুন্দর ইংরেজিতে কথা বলতে পারে, ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার সময় ওর জলবসন্ত হয়ে যায়, তাই প্রিপারেশন থাকলেও পরীক্ষা দেয়া সম্ভব হয়নি, এরপর থেকে পলির মন ভেঙে যায় পড়াশোনায়।
পলিকে তারা প্রশ্ন করার চান্সই পাননি। পলি হ্যান্ডসামের দিকে তাকাচ্ছে, হ্যান্ডসাম বেশ মিষ্টি করে হাসছে, কিন্তু কোন প্রশ্ন করছে না। পলি বুঝতে পারছে না এই বকর বকর টাকলুকে আনার কী দরকার ছিল, বেশি কথা বলে।

টাকলু আবার বলা শুরু করেছে, বিদেশের রুজি খুব কষ্টের বোন, এই দেখো আমরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজকার করি, ফ্যাশন করার টাইম নাই, বরং টাইমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা চলি। আর এই দেখো এরা দেশে কতো আরামে আছে, মামুর হোটেলে খায় আর ইচ্ছামতো গায়ে বাতাস লাগিয়ে বেড়ায়। দেশ বহু আরামের জায়গা বোন, তা কেউ বিদেশে না গেলে টের পায় না। তার চেয়ে দেশে যার ঘরে বিদেশি আছে, সেই ঘরের লোক বেশি বিদেশি। হ্যান্ডসাম তার হাতের দামী ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো, মামু এখন উঠো, নানুকে নিয়ে বিকেলে ডাক্তারে যেতে হবে। ওই নারী পলির দিকে তাকিয়ে বললেন, দেখা হয়ে ভাল লাগল, ভালো থেকো ক্যামন। পলি সালাম করে হ্যান্ডসামের দিকে তাকিয়ে একটু বাঁকা হাসি দিয়ে চলে গেলো।

প্রচণ্ড বিরক্ত লাগছে পলির ছোট চাচীর আচরণে, উনার কথা বলার ভাব দেখে মনে হচ্ছিল পাত্র উনাকে দেখতে আসছে। পলি ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে কানের দুল খুলছে, অমনি ছোট চাচী এসে ঘরে ঢুকলেন। পলি মজার ব্যাপার কী হয়েছে জানিস? হাসতে হাসতে মনে হলো ছোট চাচী অজ্ঞান হয়ে যাবেন। পাত্র যাবার সময় বলে গেলো, পাত্রীর বয়স আমার থেকে অনেক কম, ও একটা বাচ্চা মেয়ে, আপনার বয়সী কেউ হলে আমার সঙ্গে মানাতো, আমাকে বুঝতে পারতো।
দেখেছিস, তোর ছোট চাচা তো আমাকে বুঝলো না, এখনও কত দেশি – বিদেশি ছেলে আমার পিছনে লাইন ধরে আছে।

পলি বললো, ছেলেটা সুবিধার না ছোট চাচী, তোমাকে এইটুকু ছেলে এই কথা বললো? ছোট চাচী বললেন, কী বলিস পলি, কতোটুকু ছেলে?
পাত্র তো বললো তার বিয়াল্লিশ চলে। আমেরিকা গিয়েছিল লটারিতে লেগে। আমেরিকা গিয়ে রোজগার করে দেশে দালান বাড়ি করতে করতে বয়স হয়ে গেছে। তার মধ্যে বিধবা বোন এক ছেলে নিয়ে থাকেন ওর মার সাথে। ভাগ্নেকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়িয়েছে। মাস খানেক আগে ওর ভাগ্নে তারই ইউনিভার্সিটির এক ক্লাসমেটকে বিয়ে করে নিয়ে ঘরে তুলেছে। ঘরে এই নিয়ে সমস্যা হচ্ছিল দেখে মামুকে ফোন করে আনিয়েছে।
তারা এখন চাচ্ছেন মামুর বিয়ে হয়ে গেলে, সবাইকে জানিয়ে দুই বিয়ের অনুষ্ঠান একসঙ্গে শেষ করবেন।

পলির মেজাজ ধীরে ধীরে আরও খারাপ হচ্ছে। ছোট চাচীকে বললো, আমার কঠিন মাথা ধরেছে ছোট চাচী, তুমি এখন যাও…!

শেয়ার করুন:
  • 66
  •  
  •  
  •  
  •  
    66
    Shares

লেখাটি ২,৭৯৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.